জ্ঞানচক্ষু : সংক্ষিপ্ত আলোচনা


জ্ঞানচক্ষু গল্পের মূলভাব বিশ্লেষণ:

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি কেবল একটি কিশোরের লেখক হয়ে ওঠার কাহিনী নয়, বরং এটি মানুষের আত্মমর্যাদা এবং বড়দের জগতের ভণ্ডামির এক নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। গল্পের মূল বিষয়বস্তু আবর্তিত হয়েছে কিশোর তপনের সৃজনশীল স্বপ্ন এবং তার পরবর্তী রূঢ় বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। তপনের ধারণা ছিল লেখকরা বুঝি ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো অলৌকিক জীব, কিন্তু তার নতুন মেসোমশাইকে দেখে সেই মোহভঙ্গ ঘটে। সে বুঝতে পারে লেখকরাও সাধারণ মানুষের মতোই দাড়ি কামান, খাবার খান এবং খবরের কাগজ নিয়ে তর্ক করেন। এই সাধারণত্বই তপনকে অনুপ্রাণিত করে নিজে একটি গল্প লিখতে। সে প্রথাগত রূপকথা বা রোমাঞ্চের পথে না গিয়ে নিজের স্কুলের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি মৌলিক গল্প রচনা করে। এই মৌলিকতা একজন প্রকৃত শিল্পীর প্রাথমিক পরিচয় বহন করে, যা মেসোমশাইকেও মুগ্ধ করেছিল।

​তবে গল্পের মোড় ঘোরে যখন মেসোমশাই গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এখানে মেসোমশাইয়ের চরিত্রের এক জটিল দিক উন্মোচিত হয়। তিনি তপনের কাঁচা লেখাকে উৎসাহিত করার ছলে সেটিকে পুরোপুরি নিজের ভাষায় পুনর্লিখন বা ‘কারেকশন’ করেন। এটি কেবল ভাষার সংস্কার ছিল না, ছিল একটি কিশোরের মৌলিক অনুভূতিকে মেদবহুল অলংকারে ঢেকে দেওয়া। মেসোমশাইয়ের এই আচরণ মধ্যবিত্ত সমাজের সেই আধিপত্যবাদী মানসিকতার প্রতীক, যেখানে বড়রা ছোটদের কৃতিত্বকে নিজেদের দয়ার দান হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। এমনকি তপনের পরিবারেও তার প্রতিভার চেয়ে মেসোমশাইয়ের ‘মহত্ব’ বড় হয়ে ওঠে, যা তপনের কোমল মনে এক ধরণের হীনম্মন্যতা ও পরনির্ভরশীলতার ছাপ ফেলে দেয়।

​গল্পের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে যখন ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পটি তপন সবার সামনে পাঠ করতে যায়। সে অবাক হয়ে আবিষ্কার করে যে, প্রকাশিত গল্পের ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি এবং অনুভব—কোনোটিই তার নিজের নয়। নিজের নামের নিচে অন্যের সৃষ্টি পাঠ করা তার কাছে ছিল চরম অপমানের। যে সাফল্যের আশায় সে দিন গুনছিল, তা এক লহমায় গভীর বিষাদে পরিণত হয়। এই মুহূর্তে তপনের প্রকৃত ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচিত হয়। সে বুঝতে পারে, অন্যের দয়ায় পাওয়া সাফল্যের চেয়ে নিজের কাঁচা হাতের ব্যর্থতাও অনেক বেশি সম্মানজনক। তার এই আত্মোপলব্ধি তাকে পরিণত করে তোলে এবং সে সংকল্প করে যে, ভবিষ্যতে সে যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয়, তবে নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে; তা ছাপা হোক বা না হোক। অন্যের লেখা নিজের নামে পড়ার যে গ্লানি, তা থেকে মুক্তি পাওয়াই হয় তার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।

​সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে আশাপূর্ণা দেবী অত্যন্ত নিপুণভাবে শিল্পের সততা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাবোধের প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন। মেসোমশাইয়ের সংশোধন আসলে ছিল তপনের শৈল্পিক সত্তার অবমাননা। পরিবারের সদস্যদের বিদ্রূপ এবং মেসোমশাইয়ের অতি-উৎসাহের আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল একটি শিশুর অকৃত্রিম সৃষ্টিশীলতা। কিন্তু গল্পের শেষে তপনের যে নীরব কান্না এবং দৃঢ় সংকল্প, তা এক নতুন মানবের জন্ম দেয়। সে উপলব্ধি করে যে, নিজের সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে খুঁজে না পাওয়া একজন লেখকের কাছে বড় কোনো ট্র্যাজেডি হতে পারে না। এভাবেই একটি ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখিকা জীবনের এক শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরেছেন—সাফল্য অন্যের দান হতে পারে না, তা অর্জন করতে হয় নিজের যোগ্যতায় এবং সততায়।


নামকরণের সার্থকতা:

আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পটি কেবল একটি কিশোরের লেখক হয়ে ওঠার কাহিনী নয়, বরং এটি মানুষের আত্মমর্যাদা এবং বড়দের জগতের ভণ্ডামির এক নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। গল্পের মূল বিষয়বস্তু আবর্তিত হয়েছে কিশোর তপনের সৃজনশীল স্বপ্ন এবং তার পরবর্তী রূঢ় বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। তপনের ধারণা ছিল লেখকরা বুঝি ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো অলৌকিক জীব, কিন্তু তার নতুন মেসোমশাইকে দেখে সেই মোহভঙ্গ ঘটে। সে বুঝতে পারে লেখকরাও সাধারণ মানুষের মতোই দাড়ি কামান, খাবার খান এবং খবরের কাগজ নিয়ে তর্ক করেন। এই সাধারণত্বই তপনকে অনুপ্রাণিত করে নিজে একটি গল্প লিখতে। সে প্রথাগত রূপকথা বা রোমাঞ্চের পথে না গিয়ে নিজের স্কুলের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি মৌলিক গল্প রচনা করে। এই মৌলিকতা একজন প্রকৃত শিল্পীর প্রাথমিক পরিচয় বহন করে, যা মেসোমশাইকেও মুগ্ধ করেছিল।

​তবে গল্পের মোড় ঘোরে যখন মেসোমশাই গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এখানে মেসোমশাইয়ের চরিত্রের এক জটিল দিক উন্মোচিত হয়। তিনি তপনের কাঁচা লেখাকে উৎসাহিত করার ছলে সেটিকে পুরোপুরি নিজের ভাষায় পুনর্লিখন বা ‘কারেকশন’ করেন। এটি কেবল ভাষার সংস্কার ছিল না, ছিল একটি কিশোরের মৌলিক অনুভূতিকে মেদবহুল অলংকারে ঢেকে দেওয়া। মেসোমশাইয়ের এই আচরণ মধ্যবিত্ত সমাজের সেই আধিপত্যবাদী মানসিকতার প্রতীক, যেখানে বড়রা ছোটদের কৃতিত্বকে নিজেদের দয়ার দান হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। এমনকি তপনের পরিবারেও তার প্রতিভার চেয়ে মেসোমশাইয়ের ‘মহত্ব’ বড় হয়ে ওঠে, যা তপনের কোমল মনে এক ধরণের হীনম্মন্যতা ও পরনির্ভরশীলতার ছাপ ফেলে দেয়।

​গল্পের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে যখন ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পটি তপন সবার সামনে পাঠ করতে যায়। সে অবাক হয়ে আবিষ্কার করে যে, প্রকাশিত গল্পের ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি এবং অনুভব—কোনোটিই তার নিজের নয়। নিজের নামের নিচে অন্যের সৃষ্টি পাঠ করা তার কাছে ছিল চরম অপমানের। যে সাফল্যের আশায় সে দিন গুনছিল, তা এক লহমায় গভীর বিষাদে পরিণত হয়। এই মুহূর্তে তপনের প্রকৃত ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচিত হয়। সে বুঝতে পারে, অন্যের দয়ায় পাওয়া সাফল্যের চেয়ে নিজের কাঁচা হাতের ব্যর্থতাও অনেক বেশি সম্মানজনক। তার এই আত্মোপলব্ধি তাকে পরিণত করে তোলে এবং সে সংকল্প করে যে, ভবিষ্যতে সে যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয়, তবে নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে; তা ছাপা হোক বা না হোক। অন্যের লেখা নিজের নামে পড়ার যে গ্লানি, তা থেকে মুক্তি পাওয়াই হয় তার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।

​সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে আশাপূর্ণা দেবী অত্যন্ত নিপুণভাবে শিল্পের সততা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাবোধের প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন। মেসোমশাইয়ের সংশোধন আসলে ছিল তপনের শৈল্পিক সত্তার অবমাননা। পরিবারের সদস্যদের বিদ্রূপ এবং মেসোমশাইয়ের অতি-উৎসাহের আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল একটি শিশুর অকৃত্রিম সৃষ্টিশীলতা। কিন্তু গল্পের শেষে তপনের যে নীরব কান্না এবং দৃঢ় সংকল্প, তা এক নতুন মানবের জন্ম দেয়। সে উপলব্ধি করে যে, নিজের সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে খুঁজে না পাওয়া একজন লেখকের কাছে বড় কোনো ট্র্যাজেডি হতে পারে না। এভাবেই একটি ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখিকা জীবনের এক শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরেছেন—সাফল্য অন্যের দান হতে পারে না, তা অর্জন করতে হয় নিজের যোগ্যতায় এবং সততায়।


গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন:

 ​১. “তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল!”—তপন কে? তার চোখ মার্বেল হয়ে গিয়েছিল কেন?

২. “নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।”—তপনের আগে লেখক সম্পর্কে কী ধারণা ছিল? মেসোকে দেখার পর তার ধারণার কী পরিবর্তন ঘটেছিল?

৩. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্প অবলম্বনে তপনের মেসোমশাইয়ের চরিত্রটি আলোচনা করো।

৪. “লেখক মানে কোনো আকাশ থেকে পড়া জীব নয়”—এই উপলব্ধি তপনের মনে কেন এবং কীভাবে হয়েছিল?

৫. “রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই”—উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করো।

৬. “তপন তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে”—বক্তা কে? তিনি কেন এমন কথা বলেছিলেন? এর পরিণাম কী হয়েছিল?

৭. “তপন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকায়”—তপনের বিহ্বলতার কারণ কী ছিল? মেসোমশাই তার গল্প সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছিলেন?

৮. “বিকেলে চায়ের টেবিলে ওঠে কথাটা”—কোন কথাটি চায়ের টেবিলে উঠেছিল? সেই কথা শুনে বাড়ির বিভিন্ন সদস্যের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

৯. “সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়”—শোরগোলের কারণ কী ছিল? এই শোরগোলে তপনের মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল?

১০. “পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে?”—তপনের কাছে কোন ঘটনাটি ‘অলৌকিক’ মনে হয়েছিল এবং কেন?

​১১. “বুকের রক্ত ছলকে ওঠে তপনের”—তপনের এমন অনুভূতির কারণ কী? তার এই অনুভূতি শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল কি?

১২. সূচিপত্রে কী লেখা ছিল? এই লেখা দেখে তপনের মনে কী কী ভাবনার উদয় হয়েছিল?

১৩. “মেসো অবশ্য মৃদু মৃদু হাসেন”—মেসোর মৃদু হাসির আড়ালে কোন মনোভাব লুকিয়ে ছিল? তিনি তপনের গল্পের কৃতিত্ব নিতে কী বলেছিলেন?

১৪. “গল্প ছাপা হলে যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না তপন”—তপনের কেন এমন মনে হয়েছিল?

১৫. “তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে”—কোন সব কথার কথা এখানে বলা হয়েছে? তপনের এই হারিয়ে যাওয়ার কারণ কী?

১৬. “আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন”—তপনের কেন এমন মনে হয়েছিল? সেই দুঃখের মুহূর্তের বর্ণনা দাও।

১৭. “এর প্রত্যেকটি লাইন তো নতুন আনকোরা, তপনের অপরিচিত”—তপন এমন কেন ভেবেছিল? এর মাধ্যমে বড়দের জগতের কোন দিকটি ফুটে উঠেছে?

১৮. “তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে”—তপনের পাঠ বন্ধ করার কারণ কী? তার এই মৌনতার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

১৯. “তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!”—তপনের কাছে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অপমানজনক মনে হয়েছিল এবং কেন?

২০. “যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয় তো তপন নিজে গিয়ে দেবে”—তপনের এই সংকল্পের মাধ্যমে তার চরিত্রের কোন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়?

​২১. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে ছোটমাসির চরিত্রটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

২২. “এ দেশের কিছু হবে না”—উক্তিটি কার? কেন তিনি এমন নৈরাশ্য প্রকাশ করেছেন?

২৩. “তপন যে সেই দিকে যায়নি... ওর হবে”—তপনের গল্পের বিষয়বস্তু কী ছিল? বক্তা কেন মনে করেছিলেন ‘ওর হবে’?

২৪. “সে কী পড়ছে। তবু ধন্যি ধন্যি পড়ে যায়”—তপন কী পড়ছিল? এই ‘ধন্যি ধন্যি’র আড়ালে যে বিদ্রূপ আছে তা ব্যাখ্যা করো।

২৫. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে মধ্যবিত্ত পরিবারের মানসিকতা কীভাবে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

২৬. গল্পের শেষে তপনের যে আত্মোপলব্ধি হয়, তাকে কি প্রকৃত ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচন বলা যায়? যুক্তি দাও।

২৭. “শুধু এইটাই জানা ছিল না, সেটা এমনই সহজ মানুষেই লিখতে পারে”—তপনের এই উপলব্ধির গুরুত্ব বিচার করো।

২৮. তপনের লেখক হওয়ার স্বপ্ন এবং তার পরিণতি কীভাবে গল্পের মূল সুর তৈরি করেছে?

২৯. “তপনের মাথায় ঢোকে না—সে কী পড়ছে”—তপন নিজের লেখা গল্প পড়তে গিয়ে কেন হোঁচট খেয়েছিল? এর দায় কার?

৩০. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

জ্ঞানচক্ষু: আশাপূর্ণা দেবী

জ্ঞানচক্ষু
আশাপূর্ণা দেবী

কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল!

নতুন মেসোমশাই, মানে যাঁর সঙ্গে এই কদিন আগে তপনের ছোটোমাসির বিয়ে হয়ে গেল দেদার ঘটাপটা করে, সেই তিনি নাকি বই লেখেন। সে সব বই নাকি ছাপাও হয়। অনেক বই ছাপা হয়েছে মেসোর।
তার মানে-তপনের নতুন মেসোমশাই একজন লেখক। সত্যিকার লেখক।

জলজ্যান্ত একজন লেখককে এত কাছ থেকে কখনো দেখেনি তপন, দেখা যায়, তাই জানতো না। লেখকরা যে তপনের বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুর মতো মানুষ, এবিষয়ে সন্দেহ ছিল তপনের।

কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।

আশ্চর্য, কোথাও কিছু উলটোপালটা নেই, অন্য রকম নেই, একেবারে নিছক মানুষ! সেই ওঁদের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খেতে বসেই 'আরে ব্যস, এত কখনো খাওয়া যায়?' বলে অর্ধেক তুলিয়ে দেন, চানের সময় চান করেন এবং ঘুমের সময় ঘুমোন।

তাছাড়া-

ঠিক ছোটো মামাদের মতোই খবরের কাগজের সব কথা নিয়ে প্রবলভাবে গল্প করেন, তর্ক করেন, আর শেষ পর্যন্ত 'এ দেশের কিছু হবে না' বলে সিনেমা দেখতে চলে যান, কী বেড়াতে বেরোন সেজেগুজে।

মামার বাড়িতে এই বিয়ে উপলক্ষ্যেই এসেছে তপন, আর ছুটি আছে বলেই রয়ে গেছে। ওদিকে মেসোরও না কী গরমের ছুটি চলছে। তাই মেসো শ্বশুরবাড়িতে এসে রয়েছেন কদিন।

তাই অহরহই জলজ্যান্ত একজন লেখককে দেখবার সুযোগ হবেই তপনের। আর সেই সুযোগেই দেখতে পাচ্ছে তপন, 'লেখক' মানে কোনো আকাশ থেকে পড়া জীব নয়, তপনদের মতোই মানুষ।

তবে তপনেরই বা লেখক হতে বাধা কী?

মেসোমশাই কলেজের প্রফেসার, এখন ছুটি চলছে তাই সেই সুযোগে শ্বশুরবাড়িতেই রয়ে গেছেন কদিন। আর সেই সুযোগেই দিব্যি একখানি দিবানিদ্রা দিচ্ছিলেন। ছোটোমাসি সেই দিকে ধাবিত হয়।

তপন অবশ্য 'না আ-আ-' করে প্রবল আপত্তি তোলে, কিন্তু কে শোনে তার কথা?

ততক্ষণে তো গল্প ছোটোমেসোর হাতে চলেই গেছে। হইচই করে দিয়ে দিয়েছে ছোটোমাসি তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে।

তপন অবশ্য মাসির এই হইচইতে মনে মনে পুলকিত হয়।

মুখে আঁ আঁ করলেও হয়।

কারণ লেখার প্রকৃত মূল্য বুঝলে নতুন মেসোই বুঝবে। রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই।

একটু পরেই ছোটোমেসো ডেকে পাঠান তপনকে এবং বোধকরি নতুন বিয়ের শ্বশুরবাড়ির ছেলেকে খুশি করতেই বলে ওঠেন, 'তপন, তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে। একটু 'কারেকশান' করে ইয়ে করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।'

তপন প্রথমটা ভাবে ঠাট্টা, কিন্তু যখন দেখে মেসোর মুখে করুণার ছাপ, তখন আহ্লাদে কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়।

'তা হলে বাপু তুমি ওর গল্পটা ছাপিয়ে দিও-মাসি বলে, 'মেসোর উপযুক্ত কাজ হবে সেটা।'

মেসো তেমনি করুণার মূর্তিতে বলেন, 'তা দেওয়া যায়। আমি বললে 'সন্ধ্যাতারার' সম্পাদক 'না' করতে পারবে না। ঠিক আছে; তপন, তোমার গল্প আমি ছাপিয়ে দেবো।'

বিকেলে চায়ের টেবিলে ওঠে কথাটা।

আর সবাই তপনের গল্প শুনে হাসে। কিন্তু মেসো বলেন, 'না না আমি বলছি-তপনের হাত আছে। চোখও আছে। নচেৎ এই বয়সের ছেলেমেয়েরা গল্প লিখতে গেলেই তো-হয় রাজারানির গল্প লেখে, নয় তো-খুন জখম অ্যাকসিডেন্ট, অথবা না খেতে পেয়ে মরে যাওয়া, এইসব মালমশলা নিয়ে বসে। তপন যে সেই দিকে যায়নি, শুধু ওর ভরতি হওয়ার দিনের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির বিষয় নিয়ে লিখেছে, এটা খুব ভালো। ওর হবে।'

তপন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকায়।

তারপর ছুটি ফুরোলে মেসো গল্পটি নিয়ে চলে গেলেন। তপন কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গোনে।

এই কথাটাই ভাবছে তপন রাত-দিন। ছেলেবেলা থেকেই তো রাশি রাশি গল্প শুনেছে তপন আর এখন বস্তা বস্তা পড়ছে, কাজেই গল্প জিনিসটা যে কী সেটা জানতে তো বাকি নেই?

শুধু এইটাই জানা ছিল না, সেটা এমনই সহজ মানুষেই লিখতে পারে। নতুন মেসোকে দেখে জানল সেটা।

তবে আর পায় কে তপনকে?

দুপুরবেলা, সবাই যখন নিথর নিথর, তখন তপন আস্তে একটি খাতা (হোম টাস্কের খাতা আর কী! বিয়ে বাড়িতেও যেটি মা না আনিয়ে ছাড়েননি।) আর কলমটি নিয়ে তিনতলার সিঁড়িতে উঠে গেল, আর তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, একাসনে বসে লিখেও ফেলল আস্ত একটা গল্প।

লেখার পর যখন পড়ল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তপনের, মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল।

একী ব্যাপার!

এ যে সত্যিই হুবহু গল্পের মতোই লাগছে। তার মানে সত্যিই একটা গল্প লিখে ফেলেছে তপন। তার মানে তপনকে এখন 'লেখক' বলা চলে।

হঠাৎ ভয়ানক একটা উত্তেজনা অনুভব করে তপন, আর দুদ্দাড়িয়ে নীচে নেমে এসে-ছোটোমাসিকেই বলে বসে, 'ছোটোমাসি, একটা গল্প লিখেছি।'

ছোটোমাসিই ওর চিরকালের বন্ধু, বয়সে বছর আষ্টেকের বড়ো হলেও সমবয়সি, কাজেই মামার বাড়ি এলে সব কিছুই ছোটোমাসির কাছে। তাই এই ভয়ানক আনন্দের খবরটা ছোটোমাসিকে সর্বাগ্রে দিয়ে বসে।

তবে বিয়ে হয়ে ছোটোমাসি যেন একটু মুরুব্বি মুরুব্বি হয়ে গেছে, তাই গল্পটা সবটা না পড়েই একটু চোখ বুলিয়েই বেশ পিঠ চাপড়ানো সুরে বলে, 'ওমা এ তো বেশ লিখেছিস রে? কোনোখান থেকে টুকলিফাই করিসনি তো?

'আঃ ছোটোমাসি, ভালো হবে না বলছি।'

'আরে বাবা খেপছিস কেন? জিজ্ঞেস করছি বই তো নয়! রোস তোর মেসোমশাইকে দেখাই-।'

কিন্তু গেলেন তো-গেলেনই যে।

কোথায় গল্পের সেই আঁটসাঁট ছাপার অক্ষরে গাঁথা চেহারাটি? যার জন্যে হাঁ করে আছে তপন? মামার বাড়ি থেকে বাড়িতে চলে এসেও।

এদিকে বাড়িতে তপনের নাম হয়ে গেছে, কবি, সাহিত্যিক, কথাশিল্পী। আর উঠতে বসতে ঠাট্টা করছে 'তোর হবে। হাঁ বাবা তোর হবে।'

তবু এইসব ঠাট্টা-তামাশার মধ্যেই তপন আরো দু'তিনটে গল্প লিখে ফেলেছে। ছুটি ফুরিয়ে এসেছে, হোম টাস্ক হয়ে ওঠেনি, তবু লিখছে। লুকিয়ে লিখছে। যেন নেশায় পেয়েছে।

তারপর ছুটি ফুরোল, রীতিমতো পড়া শুরু হয়েছে। প্রথম গল্পটি সম্পর্কে একেবারে আশা ছাড়া হয়ে গেছে, বিষণ্ণ মন নিয়ে বসে আছে এমন সময় ঘটল সেই ঘটনা।

ছোটোমাসি আর মেসো একদিন বেড়াতে এল, হাতে এক সংখ্যা 'সন্ধ্যাতারা'।

কেন? হেতু? 'সন্ধ্যাতারা' নিয়ে কেন?

বুকের রক্ত ছলকে ওঠে তপনের।

তবে কী? সত্যিই তাই? সত্যিই তপনের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনটি এল আজ?

কিন্তু তাই কী সম্ভব? সত্যিকার ছাপার অক্ষরে তপন কুমার রায়ের লেখা গল্প, হাজার-হাজার ছেলের

হাতে হাতে ঘুরবে?

পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে?

তা ঘটেছে, সত্যিই ঘটেছে।

সূচিপত্রেও নাম রয়েছে।

'প্রথম দিন' (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়।

সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়, তপনের লেখা গল্প পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ওর লেখক মেসো ছাপিয়ে দিয়েছে! পত্রিকাটি সকলের হাতে হাতে ঘোরে, সকলেই একবার করে চোখ বোলায় আর বলে, 'বারে, চমৎকার লিখেছে তো।'

মেসো অবশ্য মৃদু মৃদু হাসেন, বলেন, 'একট-আধটু 'কারেকশান' করতে হয়েছে অবশ্য। নেহাত কাঁচা তো?'

মাসি বলে, 'তা হোক, নতুন নতুন অমন হয়-'

ক্রমশ ও কথাটাও ছড়িয়ে পড়ে।

ওই কারেকশানের কথা।

বাবা বলেন, 'তাই। তা নইলে ফট করে একটা লিখল, আর ছাপা হলো,-'

মেজোকাকু বলেন, 'তা ওরকম একটি লেখক মেসো থাকা মন্দ নয়। আমাদের থাকলে আমরাও চেষ্টা করে দেখতাম।'

ছোটোমাসি আত্মপ্রসাদের প্রসন্নতা নিয়ে বসে বসে ডিম ভাজা আর চা খায়, মেসো শুধু কফি।

আজ আর অন্য কথা নেই, শুধু তপনের গল্পের কথা, আর তপনের নতুন মেসোর মহত্ত্বের কথা। উনি নিজে গিয়ে না দিলে কি আর 'সন্ধ্যাতারা'-র সম্পাদক তপনের গল্প কড়ে আঙুল দিয়ে ছুঁতো?

তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে। গল্প ছাপা হলে যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না।

অনেকক্ষণ পরে মা বলেন, 'কই তুই নিজের মুখে একবার পড় তো তপন শুনি! বাবা, তোর পেটে পেটে এত!'

এতক্ষণে বইটা নিজের হাতে পায় তপন।

মা বলেন, 'কই পড়? লজ্জা কী? পড়, সবাই শুনি।'

তপন লজ্জা ভেঙে পড়তে যায়।

কেশে গলা পরিষ্কার করে।

কিন্তু এ কী!

এসব কী পড়ছে তপন?

এ কার লেখা?

এর প্রত্যেকটি লাইন তো নতুন আনকোরা, তপনের অপরিচিত।

এর মধ্যে তপন কোথা?

তার মানে মেসো তপনের গল্পটিকে আগাগোড়াই কারেকশান করেছেন। অর্থাৎ নতুন করে লিখেছেন, নিজের পাকা হাতে কলমে। তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে। তারপর ধমক খায়, 'কীরে তোর যে দেখি পায়া ভারী হয়ে গেল। সবাই শুনতে চাইছে তবু পড়ছিস না? না কি অতি আহ্লাদে বাক্য হরে গেল?'

তপন গড়গড়িয়ে পড়ে যায়। তপনের মাথায় ঢোকে না-সে কী পড়ছে। তবু 'ধন্যি ধন্যি' পড়ে যায়। আর একবার রব ওঠে তপনের লেখক মেসো তপনের গল্পটি ছাপিয়ে দিয়েছে।

তপন বইটা ফেলে রেখে চলে যায়, তপন ছাতে উঠে গিয়ে শার্টের তলাটা তুলে চোখ মোছে। তপনের মনে হয় আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন। কেন? তা জানে না তপন।

শুধু এই দুঃখের মুহূর্তে গভীরভাবে সংকল্প করে তপন, যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয় তো, তপন নিজে

গিয়ে দেবে। নিজের কাঁচা লেখা। ছাপা হয় হোক, না হয় না হোক।

তপনকে যেন আর কখনো শুনতে না হয় 'অমুক তপনের লেখা ছাপিয়ে দিয়েছে।'

আর তপনকে যেন নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়তে না হয়।

তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!


Read More...