পড়ুনঃ মূলগল্প
সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
নির্বাচনী MCQ
It is a digitalized platform for gathering skills and knowledge
In our dailylife it is helpful anytime , anywhare by the simple touch
Reader can use various books instead of 1 or 2 books at a time
Major interest will grow of the perticular subject on topics
Very useful for a large number of reader's at a same time.
Reader can easily connect to the ebangla school
বাংলা সাহিত্যের একাধিক বিষয় কে একত্রীকরণ
সাহিত্য সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের ধারনা তৈরি করা এবং উৎসাহিত করা
অডিও, ভিডিও - র মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য আধুনিকীকরণ
স্কুলের পাঠক্রমে থাকা একাধিক বই সহজেই প্রাপ্তি
অভীক্ষা পদ্ধতি দ্বারা পাঠকের মূল্যায়ন নির্ধারণ করা
মূলত সৃষ্টিশীল ও সময় উপযোগী ডিজিটাল শিখন পদ্ধতি গড়ে তোলা
ebanglaschools একটি ডিজিটাল পদক্ষেপ। ebanglaschools আপামর সকল বাঙালির। এটি মূলত বাংলা মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম যেমন কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, মোবাইল, স্মার্ট-ফোন ইত্যাদিকে ইতিবাচক এবং গঠনমূলক ভাবে ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করবে তেমনই তাদের পরীক্ষার জন্য তাদেরকে প্রস্তুত করে তুলবে। সকলের কাছে বাংলা সাহিত্যকে অডিও-ভিডিও-ছবির মাধ্যমে প্রেরণ করে উৎসাহী করে তোলাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। ebanglaschools প্রাথমিক ভাবে WBBSE , WBBHSE ও সাহিত্যের(core)- র ছাত্র ছাত্রীদের জন্য কাজ করছে। আশা রাখি আগামী দিনে CBSE ও ICSE- র ছাত্র ছাত্রীদের জন্য কাজ করতে পারব। সকলের সহযোগিতা , উৎসাহ এবং পরামর্শ কামনা করছি ।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ বিদ্যালয়ে পাঠরত ছাত্রছাত্রীদের পঠন পাঠনের জন্য “Menu” option এ “School Text” বিভাগটি এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য “Exam” বিভাগটিতে চোখ রাখুন।
পড়ুনঃ মূলগল্প
সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
নির্বাচনী MCQ
পড়ুনঃ মূলগল্প
সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
নির্বাচনী MCQ
পড়ুনঃ মূলগল্প
সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
নির্বাচনী MCQ
উঃ আশাপূর্ণা দেবীর
‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিশোর তপনের চোখ বিস্ময়ে মার্বেল বা গোল গোল
হয়ে গিয়েছিল।
তপন আগে জানত না যে লেখকরা সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ হতে পারেন। তার
ধারণা ছিল লেখকরা হয়তো ভিনগ্রহের কোনো জীব বা অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা। কিন্তু তার
নতুন মেসোমশাইকে দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। মেসোমশাই একজন লেখক, তাঁর বই ছাপা হয়,
অথচ তিনি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খাবার বেশি হলে
তুলে রাখতে বলেন, স্নান করেন এবং ঘুমোন। এমনকি তিনি ছোটোমামা বা মেজোকাকুদের মতো
খবরের কাগজ নিয়ে তর্ক করেন এবং অবসর সময়ে সিনেমা দেখতে বা বেড়াতে যান। এই
সাধারণত্বই তপনকে অবাক করেছিল।
এর মাধ্যমে তপনের প্রথম ‘জ্ঞানচক্ষু’
উন্মোচনের কথা বলা হয়েছে। তপন উপলব্ধি করতে পারে যে, লেখক হতে গেলে অতিপ্রাকৃত
হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার মেসোমশাই যদি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে লেখক হতে পারেন, তবে
তপনের লেখক হতে কোনো বাধা নেই। এই নতুন ধারণাটি তার চিরাচরিত সংস্কারকে ভেঙে দেয়
এবং তার মধ্যে সৃজনশীলতার এক নতুন জগত খুলে দেয়। সে বুঝতে পারে, তার চারপাশের
সাধারণ জগৎ ও মানুষের অভিজ্ঞতা থেকেই সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব।
উঃ বিয়ের ছুটিতে মামার
বাড়িতে থাকাকালীন তপন একাসনে বসে আস্ত একটি গল্প লিখে ফেলেছিল। সেই গল্পটি সে তার
প্রিয় ছোটোমাসিকে দেখালে মাসি সেটি নতুন মেসোমশাইয়ের হাতে তুলে দেয়। তপন মুখে
আপত্তি জানালেও মনে মনে চেয়েছিল যে তার মেসোমশাই যেন গল্পটি পড়েন। কারণ মেসোমশাই
একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং কলেজের অধ্যাপক। তপন মনে করেছিল, সাধারণ মানুষ গল্পের
মর্ম না বুঝলেও একজন প্রকৃত লেখক ঠিকই তার লেখার মান বুঝতে পারবেন। এই বিশ্বাসের
ওপর ভিত্তি করেই আলোচ্য উক্তিটির অবতারণা করা হয়েছে।
এখানে ‘রত্ন’ বলতে কিশোর তপনের কাঁচা
হাতের লেখা কিন্তু মৌলিক একটি গল্পকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘জহুরি’ বলতে তার নতুন মেসোমশাইকে
বোঝানো হয়েছে। জহুরি যেমন হিরে বা রত্ন চিনতে ভুল করে না, তপনও আশা করেছিল যে তার
লেখক মেসোমশাই তার গল্পের আসল মূল্যটি খুঁজে পাবেন। তপনের চোখে মেসোমশাই ছিলেন
সাহিত্যের বিচারক, যিনি তার প্রতিভার প্রকৃত মর্যাদা দিতে সক্ষম। এই ধারণা থেকেই
মেসোকে জহুরির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
উঃ তপনের আহ্লাদে কাঁদো কাঁদো হওয়ার মূল কারণ ছিল তার
দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের স্বীকৃতি পাওয়া। তার লেখা প্রথম গল্পটি যখন একজন
‘সত্যিকার লেখক’ অর্থাৎ মেসোমশাইয়ের হাতে পৌঁছায় এবং তিনি সেটি পড়ে প্রশংসা করেন,
তখন তপনের আনন্দ আর ধরে না। একজন নবীন প্রতিভার কাছে যখন তার আদর্শস্থানীয় কোনো
ব্যক্তির কাছ থেকে স্বীকৃতির আশ্বাস আসে, তখন তার আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সেই মুহূর্তের গর্ব ও কৃতজ্ঞতাতেই তপন আপ্লুত হয়ে পড়েছিল।
মেসোমশাই তপনের গল্পের প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তার লেখাটি বেশ ভালো
হয়েছে। তবে তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন—গল্পটি কিছুটা ‘কারেকশন’ বা সংশোধন করতে
হবে। মেসোমশাই বলেছিলেন, "তপন, তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে। একটু ‘কারেকশান’
করে ইয়ে করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।" তিনি আরও আশ্বাস দিয়েছিলেন যে
সন্ধ্যাতারা পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকায় তিনি বললে সম্পাদক গল্পটি
ফিরিয়ে দেবেন না। মেসোর এই অভিভাবকসুলভ উৎসাহ এবং গল্পটি ছাপানোর প্রতিশ্রুতিই
তপনকে চরমভাবে আলোড়িত করেছিল।
উঃ নতুন মেসোমশাই কিশোর তপনের সাহিত্য প্রতিভা সম্পর্কে
এই ইতিবাচক মন্তব্যটি করেছিলেন।
সাধারণত কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েরা যখন গল্প লিখতে যায়, তখন তারা
কাল্পনিক বা অতি নাটকীয় বিষয়বস্তু বেছে নেয়। তারা হয় রূপকথার মতো রাজা-রানির গল্প
লেখে, নতুবা খুন, জখম, দুর্ঘটনা কিংবা নিদারুণ দারিদ্র্যের মতো বিষয় নিয়ে লেখে যা
তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে। কিন্তু তপন এই প্রথাগত পথে না গিয়ে নিজের বাস্তব
অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করেছিল। সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিনের অভিজ্ঞতা এবং তার সেই
সময়ের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা গল্পে লিখেছিল। মেসোমশাই তপনের এই মৌলিকতা দেখেই
মন্তব্যটি করেছিলেন।
মেসোমশাই তপনের গল্পের বিশেষত্ব হিসেবে বলেছিলেন যে তার মধ্যে
সাহিত্যিকের ‘চোখ’ এবং ‘হাত’ দুইই আছে। তার মতে, গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনে তপন
যে পরিপক্বতা দেখিয়েছে তা প্রশংসাযোগ্য। কাল্পনিক জগতের বদলে নিজের বাস্তব
অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা তপনের আছে, যা একজন প্রকৃত লেখকের লক্ষণ। এই
বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই তপনের গল্পকে অন্য দশজন কিশোরের লেখা থেকে আলাদা করেছিল।
উঃ ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে অলৌকিক ঘটনা বলতে তপনের নিজের
লেখা গল্পটি একটি নামী পত্রিকা ‘সন্ধ্যাতারা’-র পাতায় ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত
হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের কাছে তার নাম ও তার গল্প পৌঁছে যাবে, এই
অভাবনীয় ঘটনাই ছিল তার কাছে ‘অলৌকিক’। নিজের সৃজনশীলতা যে একদিন বাস্তব রূপ নিয়ে
মানুষের হাতে হাতে ঘুরবে, এটি একজন সাধারণ কিশোরের কাছে বিস্ময়কর প্রাপ্তি ছিল।
তপনের কাছে এটি অলৌকিক মনে হওয়ার কারণ হলো তার আত্মবিশ্বাসের অভাব
এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট। সে নিজেকে একজন নগণ্য এবং সাধারণ কিশোর বলে মনে করত। তার
মতো একজন ছেলের লেখা গল্প যে কোনো বড় পত্রিকার সম্পাদক গুরুত্ব দিয়ে ছাপাবেন, এটা
তার কল্পনার অতীত ছিল। সূচিপত্রে যখন সে নিজের নাম দেখল— "প্রথম দিন (গল্প)
শ্রীতপন কুমার রায়"—তখন তার মনে হলো যেন কোনো অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। এই অভাবনীয়
সাফল্যের আকস্মিকতা এবং তার লেখক সত্তার এই নাটকীয় স্বীকৃতিই তার কাছে মিরাকল বা
অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল।
উঃ তপনের বাড়িতে তার গল্প ছাপা হওয়ার পর এক উৎসবের
পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে সেই আলোচনায় তপনের প্রতিভার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল
মেসোমশাইয়ের ‘দয়া’ ও ‘মহত্ত্ব’। মেসোমশাই যে তপনের গল্পটি সংশোধন করে দিয়েছেন এবং
নিজে গিয়ে সম্পাদকের হাতে দিয়ে এসেছেন, সেই কথাই বারবার বাড়ির বড়দের মুখে ঘুরছিল।
"মেসো না থাকলে তপনের গল্প কেউ ছুঁয়েও দেখত না"—এই ধরনের তাচ্ছিল্যপূর্ণ
প্রশংসাসূচক আলোচনাকেই এখানে ‘এইসব কথা’ বলা হয়েছে।
তপন এই ভিড়ের মধ্যে নিজেকে একা ও অবহেলিত অনুভব করে হারিয়ে যায়। সে
চেয়েছিল তার মৌলিক সৃজনশীলতা নিয়ে আলোচনা হোক, সবাই তার লেখনীর প্রশংসা করুক।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কৃতিত্বের সিংহভাগ চলে গেছে মেসোমশাইয়ের ঝুলিতে। বাড়ির
লোকের কাছে সে মেসোর দয়ার পাত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়ে। নিজের সৃষ্টির অপমান এবং
নিজের পরিচিতি হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায় তপন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তাই সে
নিজেকে এই কলরবের মধ্যে খুঁজে পায় না।
উঃ ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের ছোটোমাসি মনে করেছিল,
তপনের লেখা গল্পটি মেসোমশাই যদি নিজের উদ্যোগে কোনো নামী পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার
ব্যবস্থা করেন, তবে সেটিই হবে তাঁর মতো একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের ‘উপযুক্ত কাজ’।
মেসো একজন লেখক এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, তাই একজন নতুন প্রতিভাকে উৎসাহিত
করা তাঁর সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে—এটাই ছিল মাসির ভাবনা।
মাসি এই কথাটি বলেছিল প্রধানত তপনের ওপর তার মেসোর প্রভাব এবং মেসোর
ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস থেকে। মাসি জানত মেসো বড় বড় সম্পাদকদের চেনেন। সে চেয়েছিল
মেসো যেন নতুন বিয়ের আত্মীয় হিসেবে তপনকে একটু সাহায্য করেন। মাসির কাছে এটা ছিল
একাধারে তপনের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বামীর লেখক পরিচয়ের গৌরব প্রচারের একটি সুযোগ।
সে ভেবেছিল মেসো যদি গল্পটি ছাপিয়ে দেন, তবে তা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মেসোর
প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করবে এবং তপনেরও অনেক বড় উপকার হবে।
উঃ সন্ধ্যাতারা পত্রিকার সূচিপত্রে লেখা ছিল: ‘প্রথম
দিন (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়’। সূচিপত্রে নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখা যে
কোনো লেখকের কাছে এক স্মরণীয় মুহূর্ত। তপনের ক্ষেত্রেও তার পূর্ণ নাম এবং গল্পের
নাম সুনির্দিষ্টভাবে ছাপা হয়েছিল।
এটি দেখে তপনের মধ্যে এক তীব্র উত্তেজনা ও আবেগের সংঘাত শুরু
হয়েছিল। প্রথমে তার বুকের রক্ত ছলকে ওঠে, অর্থাৎ সে প্রচণ্ড আনন্দ ও বিস্ময় অনুভব
করে। তার মনে হয় আজ তার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন। কিন্তু পরক্ষণেই যখন বাড়ির
লোকেদের আলোচনা এবং মেসোর ‘কারেকশন’-এর কথা বারবার সামনে আসতে থাকে, তখন সেই আনন্দ
বিষাদে পরিণত হয়। নিজের নামের পাশে অন্যের কলমের কারুকার্য মিশে থাকার গ্লানি তাকে
ভেতর থেকে বিদ্ধ করতে থাকে। গর্বের মুহূর্তেও এক গভীর হীনম্মন্যতা ও অপমানবোধ তাকে
আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
উঃ তপন যখন তার নিজের লেখা গল্পটি সবার সামনে জোরে পড়তে
শুরু করে, তখন সে এক মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি হয়। সে দেখে গল্পের প্রতিটি লাইন
বদলে গেছে। মেসোমশাই গল্পটি সংশোধন করার নামে নিজের পাকা হাতের কলমে এমনভাবে নতুন
করে লিখেছেন যে, সেখানে তপনের নিজস্ব শব্দ বা ভাবনার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।
অন্যের লেখা শব্দগুলো নিজের নামে পড়তে গিয়ে তপন কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে যায় এবং সে আর এগিয়ে
যেতে পারে না।
তপনের এই মানসিক যন্ত্রণা ছিল গভীর অপমানের। সে অনুভব করেছিল তার
সৃষ্টিকে খুন করা হয়েছে। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির যে ‘রত্ন’ সে মেসোকে
দিয়েছিল, মেসো তা পাল্টে দিয়েছেন। নিজের নামে প্রকাশিত গল্পে নিজেকে খুঁজে না
পাওয়ার যে হাহাকার, তা তাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। সে এক চরম আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে।
বাড়ির লোকেদের কাছে সে লজ্জিত হয় কারণ সে জানে যে সে যা পড়ছে তা তার নিজের নয়। এই
প্রতারণা ও মেসোর তথাকথিত ‘দয়া’ তাকে বোবা করে দিয়েছিল।
উঃ যে দিন তপনের লেখা গল্প ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়ে তার হাতে এসেছিল, সেই দিনটির কথাই এখানে বলা হয়েছে। সাধারণ বিচারে এই
দিনটি তার সাফল্যের দিন হওয়ার কথা থাকলেও তপনের কাছে তা ছিল চরমতম কষ্টের দিন।
এর প্রধান কারণ হলো মেসোমশাইয়ের গল্পের আমূল পরিবর্তন। তপন নিজের
লেখা পড়তে গিয়ে দেখে সেটি সম্পূর্ণ নতুনের মতো হয়ে গেছে। প্রতিটি লাইন তার কাছে
অপরিচিত ঠেকে। তার সৃজনশীলতার কোনো ছাপ সেখানে ছিল না। দ্বিতীয়ত, বাড়িতে তার
গল্পের গুণের চেয়ে মেসোর করুণা নিয়ে বেশি চর্চা হচ্ছিল। বাবা ও মেজোকাকু বারবার মনে
করিয়ে দিচ্ছিলেন যে মেসো না থাকলে তপনের কপালে ছাপা হওয়া জুটত না। নিজের সৃষ্টির
মৌলিকতা হারিয়ে ফেলা এবং অন্যের দাক্ষিণ্যের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়া—এই দ্বিবিধ
অপমান তপনকে গভীরভাবে বিদ্ধ করেছিল। সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিঃস্ব ও
পরজীবী মনে হওয়ায় দিনটি তার কাছে সবচেয়ে দুঃখের দিন হয়ে ওঠে।
উঃ এই ভাবনার মধ্য দিয়ে একজন কিশোর লেখকের যশোপ্রার্থনা
এবং নিজের সৃষ্টির স্বীকৃতির জন্য তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়। তপন চেয়েছিল তার
নাম ও ভাবনা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। মুদ্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে নিজের
কল্পনাকে স্থায়ী রূপ দান করা এবং সমাজের কাছ থেকে ‘লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার
যে সহজাত বাসনা থাকে, তপনের এই ভাবনায় সেই স্বপ্নই প্রতিফলিত হয়েছে। সে চেয়েছিল
তার লেখা পড়ে অন্য কিশোররা অনুপ্রাণিত হোক এবং সে এক বিশিষ্ট সত্তা হিসেবে
আত্মপ্রকাশ করুক।
শেষ পর্যন্ত তপনের এই আশা আংশিকভাবে পূর্ণ হলেও মানসিকভাবে তা
ব্যর্থ হয়েছিল। গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল এবং মানুষের হাতে হাতেও পৌঁছেছিল ঠিকই,
কিন্তু সেই লেখার মধ্যে তপনের আসল পরিচয় ছিল না। মেসোমশাইয়ের ‘কারেকশন’-এর ফলে
গল্পটি আর তপনের থাকেনি। তার নাম ছাপার অক্ষরে থাকলেও, মনের দিক থেকে সে নিজেকে
লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। নিজের সৃষ্টির মৌলিকতা হারিয়ে যাওয়ার ফলে এই
প্রাপ্তি তার কাছে অর্থহীন ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল।
উঃ আলোচ্য উক্তিটি তপনের নতুন মেসোমশাইয়ের।
তিনি খবরের কাগজের বিভিন্ন খবর পড়েন এবং সেইসব খবরের ওপর ভিত্তি করে
তর্কে মেতে ওঠেন। দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির সমালোচনায় সরব হয়ে তিনি এক
ধরনের নিস্পৃহ ও হতাশাগ্রস্ত সিদ্ধান্ত নেন যে এই দেশের উন্নতি হওয়া সম্ভব নয়। এই
ধরনের মন্তব্য সাধারণত তথাকথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির লোকেরা করে থাকেন
যারা সমস্যার গভীরে না গিয়ে কেবল উপরিস্তরের সমালোচনাতেই আনন্দ পান। দেশের প্রতি
এক ধরনের উন্নাসিক অবজ্ঞা থেকেই তিনি এমন কথা বলেছেন।
এই উক্তির মাধ্যমে মেসোমশাইয়ের চরিত্রের ‘ছদ্ম-বুদ্ধিজীবী’ ও
অবাস্তববাদী দিকটি ফুটে ওঠে। তিনি নিজেকে অনেক বড় সমাজ সচেতন হিসেবে জাহির করতে
চান, কিন্তু বাস্তবে তিনি সমস্যার সমাধান না খুঁজে সিনেমার বিনোদন বা ভ্রমণে মত্ত
থাকতে ভালোবাসেন। তাঁর এই মন্তব্য গভীর দেশপ্রেম থেকে নয়, বরং এক ধরনের
আভিজাত্যবোধ ও অলস মানসিকতা থেকে উৎসারিত। তিনি সব কিছুর মধ্যেই খুঁত খুঁজে বের
করেন, যা পরবর্তীতে তপনের গল্পের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
উঃ তপনের আহ্লাদ হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল তার
প্রকাশিত গল্পের ‘পরকীয়া’ রূপ। সে চেয়েছিল নিজের কাঁচা কিন্তু অকৃত্রিম লেখাটি
ছাপার অক্ষরে দেখতে। কিন্তু মেসোমশাই গল্পটির প্রতিটি বাক্য বদলে দিয়েছেন। অন্যের
লেখা লাইনগুলো নিজের নামে পড়তে গিয়ে তপন লজ্জিত হয়। নিজের সৃষ্টির ওপর অন্যের
কর্তৃত্ব তার মনকে বিষিয়ে দেয়। এছাড়া সবাই যখন মেসোর দয়ার কথা বারবার বলে, তখন
তপনের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব ধুলোয় মিশে যায়। এই মানসিক গ্লানিই তার আহ্লাদ কেড়ে
নিয়েছিল।
বাড়ির বড়দের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত নিরুৎসাহব্যঞ্জক ও
ব্যঙ্গাত্মক। বাবা টিপ্পনি কেটেছিলেন যে মেসো যখন ছাপিয়ে দিয়েছে তখন আর কথা নেই।
মেজোকাকু আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন যে অমন মেসো থাকলে তিনিও লেখক হওয়ার চেষ্টা
করতেন। কেউ তপনের লেখার প্রশংসা করার চেয়ে মেসোমশাইয়ের ‘মহত্ত্ব’ ও ‘সংশোধন’-এর
ওপর বেশি জোর দিচ্ছিলেন। বড়দের এই অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ তপনের শিশুমনকে গভীরভাবে আঘাত
করেছিল।
উঃ তপন যখন তার নিজের লেখা গল্পটি সবার সামনে পড়তে শুরু
করে, সে আবিষ্কার করে যে প্রতিটি শব্দ ও বাক্য তার অচেনা। মেসোমশাই গল্পের কাঠামো
ঠিক রেখে ভাষা ও শৈলী এমনভাবে পাল্টে দিয়েছেন যে তা আর তপনের নিজস্ব সৃষ্টি নেই।
নিজের কৃতিত্বের জায়গায় অন্যের দখলদারি দেখে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। নিজের নামে
অন্যের কলমের জয়গান গাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই সে মাঝপথে পড়া থামিয়ে
দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে।
এই অবস্থায় তপনের মানসিক যন্ত্রণা ছিল অসহনীয় অপমানের। সে অনুভব
করেছিল যেন তাকে সবার সামনে নগ্ন করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির সবাই যখন হাসাহাসি করছে
এবং মেসোর মেধার গুণগান গাইছে, তপন তখন নিজের ব্যর্থতায় গুমরে মরছে। সে বুঝতে
পারে, এই সাফল্যের পেছনে কোনো সততা নেই। নিজের সৃষ্টিকে রক্ষা করতে না পারার
আক্ষেপ এবং পরজীবিতার গ্লানি তাকে কুঁকড়ে দিয়েছিল। এই নীরবতা ছিল তার প্রতিবাদের
ভাষা এবং গভীর অন্তর্দহন।
উঃ গল্পের শুরুতে তপন দেখে তার নতুন মেসোমশাই একজন
বিখ্যাত লেখক হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেন। আগে তপনের
ধারণা ছিল লেখকরা অলৌকিক শক্তির অধিকারী। কিন্তু মেসোকে দেখে সে বুঝল লেখকরাও দাড়ি
কামান, সিগারেট খান এবং সাধারণ মানুষের মতোই আবেগপ্রবণ। এই উপলব্ধির ফলে তপনের
সাহিত্যের প্রতি মোহভঙ্গ হয় এবং সে নিজে লেখক হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। এটি ছিল তার
জীবনের প্রথমবার ‘জ্ঞানচক্ষু’ খোলার ঘটনা।
গল্পের শেষে তপনের প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু খোলে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার
মাধ্যমে। নিজের নামে ছাপা গল্প পড়তে গিয়ে সে দেখে মেসো সেটিকে সম্পূর্ণ পাল্টে
দিয়েছেন। বাড়ির লোকেদের ব্যঙ্গ ও মেসোর দয়ার আধিক্যে সে বুঝতে পারে যে, নিজের
মৌলিকতা হারিয়ে অন্যের দাক্ষিণ্যে পাওয়া সাফল্য আসলে চরম অমর্যাদার। সে সংকল্প
করে, এরপর থেকে নিজের কাঁচা লেখাই নিজে গিয়ে জমা দিয়ে আসবে। সাফল্যের চেয়ে
আত্মসম্মান যে বড়—এই বোধোদয়ই ছিল তার দ্বিতীয় তথা প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু লাভ।
উঃ নতুন মেসোমশাই পেশায় কলেজের অধ্যাপক হলেও নেশায় একজন
সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক। তাঁর লেখা অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে এবং সাহিত্য মহলে তাঁর
যথেষ্ট প্রতিপত্তি রয়েছে। তিনি ‘সন্ধ্যাতারা’-র মতো নামী পত্রিকার সম্পাদককে চেনেন
এবং তাঁর সুপারিশে নতুনদের লেখা ছাপা হওয়া সম্ভব। তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং
সমাজ ও রাজনীতির ওপর তাঁর তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। তাঁর জীবনযাত্রা আর পাঁচটা সাধারণ
মানুষের মতোই স্বাভাবিক।
তপনের কাছে মেসোর এই লেখক পরিচয় ছিল বিস্ময়কর কারণ তপন মনে করত
লেখকরা বিশেষ কোনো জগতের মানুষ। সে ভেবেছিল লেখকদের চেহারা ও স্বভাব হয়তো সাধারণ
মানুষের চেয়ে একদম আলাদা হবে। কিন্তু মেসোকে এত কাছ থেকে দেখে তপন বুঝতে পারে যে
তার বাবা বা কাকার মতোই মেসো একজন অতি সাধারণ মানুষ। এই বাস্তবমুখী পরিচয় তপনকে
অবাক করে দেয় এবং তার মধ্যে থাকা লেখক হওয়ার ভয় দূর করে দেয়।
উঃ মেসোমশাই শ্বশুরবাড়িতে এসে নিজের পাণ্ডিত্য এবং
প্রভাব জাহির করার সুযোগ খুঁজছিলেন। তপনের কাঁচা হাতের গল্পটি সংশোধন করার দায়িত্ব
নিয়ে তিনি নিজেকে একজন ‘ত্রাতা’ বা ‘পরোপকারী’ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে
চেয়েছিলেন। তিনি এমন এক ভাব দেখাচ্ছিলেন যেন তিনি তপনের ওপর অনেক বড় দয়া করছেন। এই
আত্মশ্লাঘা এবং নিজের দাপট বোঝানোর জন্যই তিনি করুণার মূর্তি ধারণ করেছিলেন।
তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তপনের গল্পটি তিনি সংশোধন করে দেবেন এবং
সন্ধ্যাতারা পত্রিকার সম্পাদককে নিজে গিয়ে দেবেন। মেসো বলেছিলেন, "আমি বললে
সন্ধ্যাতারা-র সম্পাদক না করতে পারবে না।" তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে তপনের
গল্পের মান ভালো হলেও সামান্য কারেকশন প্রয়োজন। এই আশ্বাসের আড়ালে তিনি আসলে তপনের
সৃষ্টিশীলতাকে ছোট করে নিজের দক্ষতাকেই বড় করে তুলে ধরেছিলেন।
উঃ সন্ধ্যাতারা পত্রিকা হাতে নিয়ে মেসো ও মাসিকে তাদের
বাড়িতে আসতে দেখে তপনের মধ্যে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সে বুঝতে পারে তার দীর্ঘ
প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে এবং তার গল্পটি হয়তো ছাপা হয়েছে। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে
দেখার যে অদম্য আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে ছিল, সেই স্বপ্নের সফল পরিণতির কথা ভেবেই তার
বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল। এটি ছিল এক নবীন লেখকের প্রথম স্বীকৃতির শিহরণ।
পরবর্তী ঘটনা ছিল আনন্দ ও বিষাদের এক জটিল মিশ্রণ। সারা বাড়িতে
শোরগোল পড়ে যায় যে তপনের গল্প ছাপা হয়েছে। মেসো গল্পটি সংশোধনের কৃতিত্ব নিজের
নামে নেন। পত্রিকা সবার হাতে হাতে ঘোরে কিন্তু তপন যখন একা বইটি পড়তে শুরু করে,
তখন সে দেখে গল্পটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে লেখা হয়েছে। বাড়ির বড়দের বিদ্রূপ এবং গল্পের
এই অপরিচিত রূপ তপনের যাবতীয় উত্তেজনাকে এক মুহূর্তেই ম্লান করে দেয়। আনন্দের মুহূর্তটি
তার কাছে অপমানের দহনে পরিণত হয়।
উঃ বাড়ির বয়স্করা এবং পাড়ার ঠাট্টাবাজ আত্মীয়রা তপনের
লেখক হওয়ার প্রচেষ্টাকে বিদ্রূপ করে এই মন্তব্যটি করত। তপন যখন মেসোর আশ্রয়ে লেখক
হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, তখন বাড়ির লোকজন তার প্রতিভাকে সম্মান না দিয়ে ব্যঙ্গার্থে
উৎসাহিত করত। তাদের কাছে তপনের সাহিত্যচর্চা ছিল এক ধরনের ছেলেখেলার মতো। তাই তারা
উঠতে বসতে তাকে ‘কবি’, ‘সাহিত্যিক’ বলে খ্যাপাতো।
এই নিরন্তর বিদ্রূপ ও ঠাট্টা তপনের ওপর এক নেতিবাচক ও রোখালো প্রভাব
ফেলেছিল। সে লোকের কথা উপেক্ষা করে আরও নিবিড়ভাবে লিখতে শুরু করে। তার মধ্যে এক
জেদ তৈরি হয় নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। অপমানিত বোধ করলেও সে লেখা ছাড়েনি, বরং
নেশার মতো একের পর এক গল্প লিখে গেছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে তার এই নিরলস সাধনা ছিল
আসলে তার সৃজনশীল সত্তার এক নীরব প্রতিবাদ। তবে শেষ পর্যন্ত মেসোর সংশোধনের ঘটনায়
তার এই জেদ অপমানে পর্যবসিত হয়।
উঃ আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের নামকরণটি
আক্ষরিক ও ব্যঞ্জনধর্মী উভয় দিক থেকেই সার্থক। গল্পের নায়ক কিশোর তপন সাহিত্য
সম্পর্কে এক কাল্পনিক ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছিল। গল্পের শুরুতেই আমরা দেখি মেসোমশাইকে
লেখক হিসেবে চিনতে পেরে তপনের প্রথম ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচিত হয়। সে বুঝতে পারে লেখক
হওয়ার জন্য দেবত্ব প্রয়োজন নেই, সাধারণ মানুষই সাহিত্যিক হন। এটি ছিল তার বাহ্যিক
জগতের জ্ঞানলাভ।
কিন্তু গল্পের প্রকৃত পরিণতিতে তপনের অন্তরের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত
হয়। নিজের নামে ছাপা গল্প পড়তে গিয়ে যখন সে অন্যের লেখা লাইন খুঁজে পায় এবং সবার
কাছে দয়ার পাত্র হিসেবে উপহাসিত হয়, তখন সে প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করে। সে বুঝতে
পারে, অন্যের হাত ধরে পাওয়া সাফল্য আসলে মিথ্যে এবং অসম্মানের। নিজের কৃতিত্ব যদি
নিজের না হয়, তবে সেই যশের কোনো মূল্য নেই। সাফল্যের মোহে অন্ধ না থেকে নিজের
মর্যাদা রক্ষা করাই যে বড় কথা—এই বোধোদয়ই হলো তার সত্যিকারের জ্ঞানচক্ষু লাভ।
গল্পের প্রতিটি মোড়ে তপনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শেষে আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণ
নামকরণের সার্থকতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
১. "সবাই তাঁকে আলুবাবু বলত..." — কার কথা বলা হয়েছে?
তাঁকে ‘আলুবাবু’ বলার কারণ কী? তাঁর চেহারার বর্ণনা দাও। (১+২+২)
উঃ বনফুলের ‘আলোবাবু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলোবাবুর কথা এখানে বলা
হয়েছে।
গল্পের প্রধান চরিত্রের
আসল নাম ছিল ‘আলো’। কিন্তু তাঁর বাহ্যিক অবয়ব বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এই
নামের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, নিরীহ এবং কিছুটা
অপ্রকৃতিস্থ গোছের মানুষ। সমাজের মানুষ প্রায়ই তাঁর সরলতা বা চারিত্রিক বিচ্যুতিকে
পরিহাসের ছলে দেখত। নামের ‘আলো’ শব্দটিকে বিকৃত করে বা তাঁর আলুথালু ও লক্ষ্যহীন
জীবনযাত্রার প্রতি ব্যঙ্গ করে স্থানীয় লোকেরা তাঁকে ‘আলুবাবু’ বলে ডাকত। এটি মূলত
তাঁর প্রতি সমাজের এক প্রকার অবজ্ঞা ও কৌতুকের বহিঃপ্রকাশ।
আলোবাবুর চেহারার বর্ণনা
প্রসঙ্গে লেখক জানিয়েছেন যে, তাঁর নাম ‘আলো’ হলেও গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো। তাঁর
মুখমণ্ডলকে লেখক ‘বেগুন-পোড়া’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মুখে ছিল কালো গোঁফ-দাড়ি
এবং যুগ্ম-ভ্রু। মাথায় ছিল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা বাবরি চুল। গলায় একটি তুলসীর মালা
ছিল, যা ঘাম ও ধুলোয় কালো হয়ে গিয়েছিল। তবে তাঁর পরনের থান কাপড় এবং গায়ের চাদর
ছিল ধপধপে সাদা। তিনি জুতো পরতেন না এবং অত্যন্ত সাদাসিধে বেশে থাকতেন। এই
বৈপরীত্যময় চেহারার মধ্যেই তাঁর নিঃসঙ্গ ও অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছিল।
২. "কী চাই আপনার?" — বক্তা কে? ব্যক্তিটির আগমনের প্রকৃত
উদ্দেশ্য কী ছিল? তিনি কীভাবে সাহায্য চেয়েছিলেন? (১+২+২)
উঃ ‘আলোবাবু’ গল্পের কথক তথা পেশায় ডাক্তার বিনুবাবু হলেন এই প্রশ্নের
বক্তা।
আলোবাবু যখন প্রথম
ডাক্তারের বৈঠকখানায় আসেন, তখন ডাক্তারবাবু ভেবেছিলেন তিনি হয়তো আর পাঁচজন
সাহায্যপ্রার্থীর মতো টাকা চাইতে এসেছেন। কিন্তু আলোবাবুর আগমনের উদ্দেশ্য ছিল
সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং মানবিক। তিনি একটি আহত পাখির ছানাকে বাঁচাতে এসেছিলেন। এক
পাষণ্ড বালক পাখির ছানাটির পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তা দেখে আলোবাবু
তাঁর সামান্য সম্বল থেকে দু-আনা পয়সা দিয়ে পাখিটিকে উদ্ধার করেন। সেই আহত পাখির
চিকিৎসা করাতেই তিনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
সাহায্য চাওয়ার ধরনে
আলোবাবুর বিনয় ও কুণ্ঠা প্রকট ছিল। তিনি অত্যন্ত কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে
ডাক্তারবাবুকে অনুরোধ করেন যেন পাখিটির পা একটু দেখে দেওয়া হয়। তিনি ডাক্তারবাবুর
সুখ্যাতি শুনেই সেখানে এসেছিলেন। তাঁর বাঁ হাতের একটি ছোট থলি থেকে অতি সযত্নে
পাখির ছানাটি বার করে তিনি তুলে ধরেন। তাঁর এই আচরণে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল
না, বরং ছিল এক অসহায় জীবের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। এইভাবেই তিনি এক অদ্ভুত কায়দায়
ডাক্তারের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।
৩.
"জীবন্ত কোনো জিনিস পোষবার সামর্থ্য নেই আমার।" — উক্তিটি কার? কেন তাঁর
সামর্থ্য নেই? এই উক্তির মাধ্যমে তাঁর চরিত্রের কোন দিকটি ফুটে ওঠে? (১+২+২)
উঃ আলোচ্য
উক্তিটি গল্পের প্রধান চরিত্র আলোবাবুর।
আলোবাবু ছিলেন অত্যন্ত
দরিদ্র এবং নিঃস্ব একজন মানুষ। তাঁর নিজেরই মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ঠাঁই ছিল না;
তিনি অন্যের দয়ায় অবিনাশবাবুর বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে থাকতেন। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট
আয়ের উৎস বা চাকরি ছিল না। একটি পোষা প্রাণীকে পালন করতে গেলে যে ন্যূনতম আর্থিক
সংগতি এবং খাবারের সংস্থান প্রয়োজন, তা আলোবাবুর ছিল না। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে
রাখাই যেখানে তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল, সেখানে অন্য একটি প্রাণীর দায়িত্ব নেওয়া তাঁর
সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
এই উক্তির মাধ্যমে
আলোবাবুর চরিত্রের প্রবল দায়িত্ববোধ এবং স্বচ্ছ মানসিকতা ফুটে ওঠে। তিনি জীবজন্তু
ভালোবাসতেন ঠিকই, কিন্তু সামর্থ্য নেই বলে তাদের বন্দি করে রাখা বা পুষে রাখা তাঁর
নীতিবিরুদ্ধ ছিল। তিনি কেবল উদ্ধারকর্তা হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিলেন, মালিক হিসেবে
নয়। তাঁর এই ‘সামর্থ্য নেই’ কথাটির পেছনে এক গভীর হাহাকার ও একাকীত্ব লুকিয়ে আছে।
এমনকি অর্থাভাবে তিনি বিয়ে পর্যন্ত করেননি, যা তাঁর বাস্তববোধ ও ত্যাগের পরিচয়
দেয়।
৪.
"আর একবার কুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলে চাইলেন।" — কার কথা বলা হয়েছে? তাঁর এই
কুণ্ঠার কারণ কী? তিনি কোথায় থাকতেন? (১+২+২)
উঃ এখানে
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলোবাবুর কথা বলা হয়েছে।
আলোবাবুর এই কুণ্ঠার
মূলে ছিল তাঁর চরম নিঃস্বতা এবং পরনির্ভরশীলতা। তিনি ছিলেন একজন অতি সংবেদনশীল
মানুষ, যিনি সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। যখনই কেউ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা
আশ্রয় নিয়ে প্রশ্ন করত, তখনই তিনি হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। নিজের কোনো স্থায়ী পরিচয়
বা নিজস্ব বাড়ি না থাকায় তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন। অন্যের করুণার ওপর টিকে
থাকার গ্লানি তাঁকে সবসময় কুণ্ঠিত করে রাখত, যা তাঁর চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠত।
আলোবাবু সেই সময়
অবিনাশবাবুর বাড়িতে থাকতেন। অবিনাশবাবু ছিলেন একজন নামজাদা উকিল। যদিও আলোবাবুর
সঙ্গে তাঁর সরাসরি কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না, তবুও আলোবাবু এক অদ্ভুত সম্পর্কের
কথা জানান। তাঁর এক দূর-সম্পর্কীয় ভাগ্নীর বন্ধুর শ্বশুর ছিলেন অবিনাশবাবু।
অবিনাশবাবু দয়া করেই এই অকিঞ্চিৎকর মানুষটিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই
আশ্রিত পরিচয়টি আলোবাবুর মনে সর্বদা এক প্রকার জড়তা ও কুণ্ঠা তৈরি করে রাখত।
৫.
"স্নেহের কাঙাল বেচারা। গরিবও খুব।" — কার সম্পর্কে কে এই মন্তব্য
করেছেন? তাঁর এমন মন্তব্যের কারণ কী? (১+২+২)
উঃ আলোবাবু
সম্পর্কে নামজাদা উকিল অবিনাশবাবু এই মন্তব্যটি করেছিলেন।
অবিনাশবাবু আলোবাবুকে
খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, আলোবাবুর নিজের বলতে পৃথিবীতে
কেউ নেই। একাকীত্বে ভোগা এই মানুষটি সবসময় ভালোবাসা ও মমতা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল
থাকতেন। তিনি সামান্য সুযোগ পেলেই পশু-পাখি বা মানুষের সেবা করতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
তাঁর এই অকৃত্রিম সেবা করার প্রবণতা আসলে ভালোবাসা পাওয়ারই একটি আকুতি ছিল। এই
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেই অবিনাশবাবু তাঁকে ‘স্নেহের কাঙাল’ বলে অভিহিত
করেছিলেন।
মন্তব্যের দ্বিতীয় অংশে
আলোবাবুর আর্থিক দৈন্যের কথা বলা হয়েছে। তাঁর কোনো স্থায়ী উপার্জন ছিল না, তিনি
অন্যের বাড়িতে দয়ায় থাকতেন। তাঁর পোশাক-আশাক এবং জীবনযাপন ছিল অতি নগণ্য। তিনি
জীবনের নূন্যতম চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পারতেন না। এমনকি অভাবের তাড়নায় তিনি তাঁর
শখের গান-বাজনার সরঞ্জাম পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আর্থিক দারিদ্র্য এবং
মানসিক একাকীত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আলোবাবু এক ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন
বলে অবিনাশবাবু মনে করতেন।
৬.
"সেবা করতে বড়ো ভালোবাসে..." — কার সেবার কথা বলা হয়েছে? কেন তিনি
সেবাকেই জীবনের ব্রত করেছিলেন? সেবার পাত্র-পাত্রী কারা ছিল? (১+২+২)
উঃ এখানে
আলোবাবুর নিঃস্বার্থ এবং অদ্ভুত ধরণের সেবার কথা বলা হয়েছে।
আলোবাবু ছিলেন
সমাজ-সংসার থেকে বিচ্যুত একজন মানুষ। তাঁর নিজের কোনো পরিবার বা সন্তান ছিল না।
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো কাউকে ভালোবাসা বা কারো যত্ন নেওয়া। আলোবাবু এই
ভালোবাসার অভাব পূরণ করার মাধ্যম হিসেবে সেবাকেই বেছে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে অসহায়
ও আর্ত জীবের সেবা করে তিনি এক প্রকার মানসিক তৃপ্তি লাভ করতেন। নিজের জীবনের
ব্যর্থতা ও শূন্যতা পূরণ করতেই তিনি পরহিতৈষী হয়ে উঠেছিলেন। সেবার মাধ্যমেই তিনি
নিজেকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন।
আলোবাবুর সেবার
পাত্র-পাত্রী ছিল মূলত সমাজের পরিত্যক্ত বা অসহায় জীব ও শিশুরা। তিনি রাস্তার এক
পা-কাটা পাখির ছানার সেবা করেছেন, অবিনাশবাবুর ছেলের কুকুর ছানার পিচুটি পরিষ্কার
করেছেন এবং হাসপাতালের রোগীদের ঘা ধুইয়ে দিয়েছেন। এমনকি অবিনাশবাবুর শিশু পুত্র
তিনুর প্রতিও তাঁর অগাধ স্নেহ ছিল। তাঁর সেবার বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, যাঁদের কেউ
দেখার নেই বা যারা নিজেদের কষ্ট ব্যক্ত করতে পারে না, তাঁদের প্রতিই আলোবাবুর টান
ছিল সবচেয়ে বেশি।
৭.
"মাসখানেক পরেই কিন্তু চাকরিটি গেল তাঁর।" — কার চাকরি গিয়েছিল? তাঁর
কর্মস্থল কোথায় ছিল? চাকরি যাওয়ার কারণ কী ছিল? (১+২+২)
উঃ গল্পের
প্রধান চরিত্র আলোবাবুর চাকরি যাওয়ার কথা এখানে বলা হয়েছে।
ডাক্তার বিনুবাবুর বন্ধু
তথা সিভিল সার্জনের সহায়তায় আলোবাবু স্থানীয় হাসপাতালের আউট-ডোরে একটি ‘প্রবেশনার
ড্রেসার’-এর কাজ পেয়েছিলেন। তাঁর কাজ ছিল হাসপাতালের রোগীদের ঘা পরিষ্কার করা এবং
ড্রেসিং করা। মাসিক দশ টাকা বেতনের এই চাকরিটি তাঁর মতো নিঃস্ব মানুষের কাছে
অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই রোগীদের সেবা করছিলেন।
চাকরি যাওয়ার কারণটি ছিল
আলোবাবুর অতি-সরলতা এবং ভুল সিদ্ধান্ত। একদিন এক রোগীর পায়ের ঘা কিছুতেই সারছিল
না। সেই রোগী নিজেই তাঁকে একটি ওষুধ দেখিয়ে বলেছিল সেটি লাগালে ঘা সেরে যাবে।
আলোবাবু কোনো ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়াই সরল বিশ্বাসে রোগীর কথা মতো সেই ঘায়ে
কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে দেন। এর ফলে রোগী তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার শুরু করে এবং
হাসপাতালে হৈ-চৈ পড়ে যায়। হাসপাতালের ডাক্তার এই হঠকারী কাজের জন্য অত্যন্ত
ক্ষুব্ধ হন এবং আলোবাবুকে কর্মচ্যুত করেন। তাঁর এই ‘ভালো করতে গিয়ে মন্দের’
প্রবণতাই তাঁর চাকরির কাল হয়েছিল।
৮.
"আলোবাবু যা করেছিলেন তা কোনও মা সহ্য করতে পারেন না।" — আলোবাবু কী
করেছিলেন? এর ফলে তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল? (১+২+২)
উঃ আলোবাবু
এক অদ্ভুত কায়দায় কুকুরের ছানা এবং অবিনাশবাবুর শিশু পুত্র তিনুকে স্নেহ প্রকাশ
করেছিলেন।
একদিন আলোবাবু এক বগলে
অবিনাশবাবুর শিশু পুত্র তিনুকে এবং অন্য বগলে একটি দেশি কুকুরের ছানাকে নিয়ে আদর
করছিলেন। তিনি একবার কুকুরটির মুখে এবং পরক্ষণেই শিশুটির মুখে চুমু খাচ্ছিলেন।
স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক সংস্কারের দিক থেকে এটি ছিল অত্যন্ত বীভৎস ও
অগ্রহণযোগ্য একটি কাজ। আলোবাবুর কাছে জীব ও মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না,
কিন্তু একজন সচেতন মায়ের কাছে এটি ছিল তাঁর সন্তানের চরম অবমাননা ও বিপদের কারণ।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া
ছিল অত্যন্ত কঠোর। অবিনাশবাবুর স্ত্রী এই দৃশ্য দেখে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন এবং
আলোবাবুকে তৎক্ষণাৎ তাঁদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। আলোবাবু তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুও
হারান। সমাজের চোখে যা অস্বাস্থ্যকর বা অদ্ভুত, আলোবাবুর কাছে তা ছিল নিছকই
ভালোবাসা। কিন্তু এই ‘অস্বাভাবিক’ আচরণের ফলেই তাঁকে পথে বসতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত
ডাক্তার বিনুবাবুই তাঁকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে বাধ্য হন।
৯.
"আপনি গান-বাজনা জানেন নাকি?" — বক্তা কে? আলোবাবু গান-বাজনা সম্পর্কে
কী জানিয়েছিলেন? তিনি বর্তমানে কী বাজাচ্ছিলেন? (১+২+২)
উঃ এই
প্রশ্নের বক্তা হলেন ডাক্তার বিনুবাবু, যিনি আলোবাবুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
ডাক্তারবাবুর প্রশ্নের
উত্তরে আলোবাবু অত্যন্ত কুণ্ঠার সঙ্গে জানান যে, এককালে তিনি ডুগি-তবলা বাজাতে
পারতেন। অর্থাৎ সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং প্রাথমিক শিক্ষা ছিল। কিন্তু
দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে পড়ে তাঁকে তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্রগুলো বিক্রি করে দিতে
হয়। তাঁর জীবনের রিক্ততা এতটাই ছিল যে, শখের সরঞ্জামগুলোও তিনি ধরে রাখতে পারেননি।
তাঁর এই উত্তর থেকে তাঁর অতীত স্বচ্ছলতা এবং বর্তমান করুণ অবস্থার এক করুণ চিত্র
ফুটে ওঠে।
বর্তমানে আলোবাবু একটি
পুরনো ‘সোলার হ্যাট’ বা সাহেবি টুপি বাজাচ্ছিলেন। বাদ্যযন্ত্রহীন জীবনে তিনি এই
টুপিটিকেই তবলার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি টুপির ওপর আঙুল চালিয়ে গান
গাইতেন। এককালে যিনি সালোয়ার-স্যুট পরতেন এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, তাঁর কাছে এখন
সম্বল বলতে ছিল শুধু এই পুরনো হ্যাটটি। এই অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ঘটনাটি একদিকে
যেমন কৌতুক তৈরি করে, অন্যদিকে আলোবাবুর নিঃস্ব জীবনের করুণ ইতিহাসকে তুলে ধরে।
১০.
"দশটা বেজে গেছে আমার ঘড়িতে দম দেওয়া হয়নি এখনও।" — উক্তিটি কার? তিনি
কেন ছুটছিলেন? তাঁর কাছে ঘড়ির গুরুত্ব কী ছিল? (১+২+২)
উঃ উক্তিটি
আলোবাবুর।
আলোবাবু হন্তদন্ত হয়ে
ছুটছিলেন কারণ তাঁর ঘড়িতে দম দেওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। তিনি অন্য একজনের বাড়ি
গিয়েছিলেন গাইয়ের বাছুর দেখতে। সেখানে দশটার ঘণ্টা শুনে তিনি আঁতকে ওঠেন। তিনি
প্রতিদিন ঠিক সকাল দশটায় তাঁর প্রিয় ঘড়িতে দম দিতেন। এক মিনিট দেরি হওয়াকেও তিনি
সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর মনে হয়েছিল, সময়মতো দম না দিলে তাঁর প্রিয় ঘড়িটি হয়তো
কষ্ট পাবে। এই তীব্র ব্যাকুলতা থেকেই তিনি উর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটছিলেন।
আলোবাবুর কাছে ঘড়িটি
নিছক কোনো যন্ত্র ছিল না, সেটি ছিল তাঁর একমাত্র ভালোবাসার বস্তু। তাঁর জীবনে কোনো
আত্মীয় বা বন্ধু ছিল না, তাই তিনি তাঁর সমস্ত স্নেহ ও মমতা ওই ঘড়িটির ওপর উজাড় করে
দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের যেমন খাবারের প্রয়োজন হয়, ঘড়ির তেমনি দমের
প্রয়োজন। ঘড়িটিকে তিনি প্রাণবন্ত এক সত্তা হিসেবে দেখতেন। সেটিকে অতি সযত্নে লাল
শালু ও তুলোর আবরণে ঢেকে রাখতেন এবং পুজোর মতো ভক্তি ভরে দম দিতেন।
১১.
"আমাদের যেমন খাবার, ঘড়ির তেমনি দম..." — এই উপমাটি কার? কেন তিনি এমন
কথা বলেছেন? উক্তিটির তাৎপর্য লেখো। (১+২+২)
উঃ এই
চমৎকার উপমাটি আলোবাবুর নিজস্ব দর্শন থেকে উদ্ভূত।
আলোবাবু ঘড়িটিকে কোনো জড়
বস্তু মনে করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি সচল জিনিসেরই জীবন আছে এবং সেই
জীবন টিকিয়ে রাখতে শক্তির প্রয়োজন। মানুষ যেমন খাদ্য গ্রহণ না করলে দুর্বল হয়ে পড়ে
এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়, ঘড়িটিও তেমনি দম না পেলে অচল হয়ে পড়ে। ঘড়ির এই সচলতাকে
তিনি জীবনের স্পন্দনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর এই বিশ্বাসের ফলেই তিনি দম
দেওয়াকে একটি আবশ্যকীয় সেবামূলক কাজ হিসেবে দেখতেন।
এই উক্তিটির তাৎপর্য
অত্যন্ত গভীর। আলোবাবু সমাজে কোনো মর্যাদা বা ভালোবাসা পাননি। মানুষ তাঁকে অবজ্ঞা
করেছে, চাকরি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই তিনি তাঁর ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে
নিয়ে গেছেন একটি ঘড়ির ওপর। একটি যন্ত্রকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে তিনি আসলে নিজের নিঃসঙ্গতাকে
ঢাকতে চেয়েছেন। ঘড়িটিকে ‘খাবার’ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের পিতৃত্ব বা
অভিভাবকত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতেন। এটি তাঁর মানসিক অস্থিরতা এবং একাকীত্বেরই
বহিঃপ্রকাশ।
১২.
"দেখলাম ঘরে ঢুকেই তিনি নিজের ভাঙা তোরঙ্গটা খুললেন।" — কে তোরঙ্গ
খুলেছিলেন? তোরঙ্গের ভেতর থেকে কী কী বেরিয়ে এল? (১+২+২)
উঃ ডাক্তার
বিনুবাবু যখন আড়াল থেকে লক্ষ্য করছিলেন, তখন তিনি দেখেন আলোবাবু নিজের ঘরে ঢুকে
তাঁর ভাঙা তোরঙ্গটি খুলছেন।
তোরঙ্গের ভেতর থেকে
আলোবাবু প্রথমে একটি ছোট টিনের বাক্স বার করেন। সেই বাক্সের ভেতর ছিল একটি
ন্যাকড়ার ছোট পুঁটুলি। সেটি খুললে বেরিয়ে এল লাল রঙের শালুর একটি পুঁটুলি। সেই
শালুর আবরণ সরালে দেখা গেল রেশমি ন্যাকড়ার আরও একটি আস্তরণ। সর্বশেষ স্তরে ছিল
খানিকটা তুলো। এই বহুস্তরীয় সুরক্ষার নিচেই সযত্নে রাখা ছিল আলোবাবুর সেই অতি
প্রিয় ছোট্ট ঘড়িটি।
এই বর্ণনা থেকে আলোবাবুর
ঘড়িটির প্রতি অগাধ মমত্ববোধ ও সংরক্ষণের মানসিকতা ফুটে ওঠে। তিনি অত্যন্ত সযত্নে
ঘড়িটিকে লুকিয়ে রাখতেন যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। ঘড়িটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে দামি
রত্ন। তাঁর অভাবের সংসারে ঘড়িটিই ছিল একমাত্র আভিজাত্যের প্রতীক। বহুস্তরীয় কাপড়ের
আবরণে ঢেকে রাখার অর্থ হলো, তিনি ঘড়িটিকে ধুলোবালি বা অনিষ্ট থেকে স্রেফ
যান্ত্রিকভাবে নয়, বরং এক প্রকার ধর্মীয় শুচিতার সঙ্গে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
১৩.
"মনে হলো যেন পুজো করছেন।" — কার কথা বলা হয়েছে? তিনি কী করছিলেন? কেন
লেখক এমন মন্তব্য করেছেন? (১+২+২)
উঃ এখানে
আলোবাবুর কথা বলা হয়েছে।
আলোবাবু তাঁর সযত্নে
রক্ষিত ছোট্ট ঘড়িটি বের করে অত্যন্ত একাগ্রতার সঙ্গে দম দিচ্ছিলেন। তিনি বাবু হয়ে
চাপটালি খেয়ে বসে ঘড়িটিকে হাতে নিলেন এবং চোখ বুজে অতি ধীরে ধীরে দমের চাবি
ঘোরাচ্ছিলেন। তাঁর এই কাজে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, বরং ছিল এক প্রকার প্রশান্তি ও
নিমগ্নতা। তিনি যেন জাগতিক সমস্ত কিছু ভুলে ওই মুহূর্তটিকে পবিত্র মনে করছিলেন।
লেখক এই দৃশ্যকে ‘পুজো’র
সঙ্গে তুলনা করেছেন কারণ আলোবাবুর মধ্যে ছিল অগাধ ভক্তি ও একাগ্রতা। সাধারণত মানুষ
দেবতার মূর্তির সামনে যে ভক্তি নিয়ে বসে, আলোবাবুও ঠিক সেই একই নিবেদন নিয়ে ঘড়িটির
সামনে বসেছিলেন। তাঁর কাছে ঘড়িটি ছিল পরমাত্মার মতো। ঘড়িটিকে দম দেওয়া তাঁর কাছে
নিছক কাজ ছিল না, ছিল এক প্রকার আধ্যাত্মিক সাধনা। জীবনের সমস্ত প্রেম ও ভক্তি
তিনি একটি ছোট যন্ত্রে সমর্পণ করেছিলেন বলেই লেখক এই আধ্যাত্মিক উপমাটি ব্যবহার
করেছেন।
১৪.
"আমায় ওরা সইলো না কেউ/আমার কাছে রইলো না কেউ —" — এই গানটি কে
গাইছিলেন? গানের লাইন দুটির তাৎপর্য আলোচনা করো। (১+৪)
উঃ এই করুণ
এবং আত্মবিশ্লেষণমূলক গানটি গাইছিলেন আলোবাবু।
গানের এই দুটি লাইনের
মধ্যে আলোবাবুর সমগ্র জীবনের ট্র্যাজেডি বা করুণ রস নিহিত আছে। আলোবাবু ছিলেন একজন
অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ, যিনি সবাইকে ভালোবাসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ তাঁকে
গ্রহণ করতে পারেনি। অবিনাশবাবুর বাড়ি থেকে তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে, হাসপাতাল থেকে
তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অদ্ভুত আচরণ ও ‘পাগলামি’র কারণে কেউ তাঁর কাছে স্থায়ীভাবে
থাকেনি। গানটির মাধ্যমে তাঁর এই নিদারুণ একাকীত্ব এবং সামাজিক বর্জনের যন্ত্রণা
ফুটে উঠেছে। তিনি অনুভব করেছেন যে, এই পৃথিবীতে তিনি ব্রাত্য।
এই গানের মধ্য দিয়ে তাঁর
মনের গভীরতম ক্ষত প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গানটি গাইছিলেন তাঁর একমাত্র ভালোবাসার
বস্তু ‘ঘড়ি’টি হারিয়ে যাওয়ার ঠিক পরেই। মানুষ তো তাঁকে আগেই ত্যাগ করেছিল, এখন
তাঁর শেষ সম্বল ও সঙ্গি ঘড়িটিও তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে গেছে। ‘ওরা’ বলতে তিনি যেমন
সমাজকে বুঝিয়েছেন, তেমনি তাঁর দুর্ভাগ্যের শিকার হওয়া প্রতিটি মুহূর্তকেও
বুঝিয়েছেন। এটি ছিল তাঁর অস্তিত্বের সংকট ও চরমতম বিষাদের এক সুর, যা
ডাক্তারবাবুকেও অবাক করে দিয়েছিল।
১৫.
"আমার ঘড়িটা চুরি হয়ে গেছে।" — উক্তিটি কার? ঘড়ি চুরির ফলে তাঁর মানসিক
অবস্থা কেমন হয়েছিল? (১+২+২)
উঃ উক্তিটি
আলোবাবুর। তিনি ডাক্তার বিনুবাবুর কাছে এই দুঃসংবাদটি দিয়েছিলেন।
ঘড়িটি চুরি হওয়ার ফলে
আলোবাবু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি এক চরম নিরাপত্তাহীনতা ও শোকের মধ্যে
নিমজ্জিত হয়েছিলেন। তাঁর কাছে ঘড়িটি কেবল সময় দেখার যন্ত্র ছিল না, ছিল তাঁর
একমাত্র আত্মার আত্মীয়। ঘড়িটি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো তাঁর জীবনের শেষ আশাটুকুও
চিরতরে নিভে যাওয়া। তিনি অনুভব করেছিলেন যে তাঁর ভালোবাসার পাত্রটি তাঁর থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলে গেছে।
এই অবস্থায় আলোবাবু
অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। তিনি তাঁর হ্যাট বাজিয়ে তারস্বরে গান গাইতে
থাকেন। সাধারণ মানুষ দুঃখে চুপ করে থাকে, কিন্তু আলোবাবু তাঁর হাহাকারকে গানের
সুরে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপ-টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর বড়
আফসোস ছিল এই যে, যে চোর ঘড়িটি নিয়েছে, সে হয়তো ঠিক সময়মতো সযত্নে ঘড়িটিকে ‘খাবার’
বা দম দিতে পারবে না। ঘড়িটির কষ্টের কথা ভেবেই তাঁর যন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিল।
১৬.
"আলোবাবু এখন পাগলা গারদে আছেন।" — গল্পের শেষে আলোবাবুর এই পরিণতির
কারণ কী? সমাজ এই পরিণতির জন্য কতটা দায়ী? (১+২+২)
উঃ ‘আলোবাবু’
গল্পের শেষে প্রধান চরিত্রটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগলা গারদে আশ্রয় নিয়েছেন।
আলোবাবুর এই করুণ
পরিণতির মূলে ছিল তাঁর অতি-সংবেদনশীলতা এবং সমাজের নিষ্ঠুরতা। তিনি তাঁর সমস্ত
আবেগ ও ভালোবাসা একটি ঘড়ির ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। যখন সেই ঘড়িটিও চুরি হয়ে গেল, তখন
তাঁর মনের শেষ বাঁধনটিও ছিঁড়ে গেল। পৃথিবীতে তাঁর আর কোনো অবলম্বন অবশিষ্ট রইল না।
একাকীত্ব ও শোকের আতিশয্যে তিনি বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। তাঁর
বিচিত্র আচরণ পাগলামি হিসেবে গণ্য হলো এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বন্দি হতে হলো।
এই পরিণতির জন্য সমাজ
অনেকাংশেই দায়ী। সমাজ আলোবাবুকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ দেয়নি। তাঁর
সরলতাকে লোকে উপহাস করেছে, তাঁর সেবাকে পাগলামি বলেছে। হাসপাতালে তিনি ভালো করতে
গিয়ে ভুল করেছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে সংশোধনের সুযোগ দেয়নি। তাঁর নিঃসঙ্গতাকে কেউ
সহানুভূতির চোখে দেখেনি। সমাজ যদি তাঁকে একটু মর্যাদা ও আশ্রয় দিত, তবে হয়তো একটি
জড় বস্তুর ওপর তাঁকে এতটা নির্ভর করতে হতো না। সমাজের অসহিষ্ণুতাই এক সুস্থ
মানুষকে উন্মাদনায় ঠেলে দিয়েছে।
১৭.
"সমাজের সঙ্গে নিজেকে তিনি খাপ খাওয়াতে পারলেন না কিছুতে।" — ‘আলোবাবু’
গল্প অবলম্বনে মন্তব্যটির সত্যতা বিচার করো। (৫)
উঃ বনফুলের
‘আলোবাবু’ গল্পে দেখা যায় যে, আলোবাবু ছিলেন এক অদ্ভুত খেয়ালি মানুষ, যাঁর
জীবনদর্শন প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক ছিল। সমাজ চলে
নির্দিষ্ট নিয়ম, স্বার্থ এবং ব্যবহারিক বুদ্ধির ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে আলোবাবু
চলতেন কেবল আবেগ ও অকৃত্রিম মমত্ববোধের টানে।
প্রথমত, হাসপাতালে চাকরি
করার সময় তিনি কোনো প্রোটোকল না মেনে রোগীর উপকারের নেশায় কার্বলিক অ্যাসিড
ব্যবহার করেন। সমাজ চায় নিয়মনিষ্ঠা, কিন্তু আলোবাবু চেয়েছিলেন দ্রুত আরোগ্য।
দ্বিতীয়ত, অবিনাশবাবুর বাড়িতে তিনি কুকুর এবং শিশুকে একাসনে বসিয়ে আদর করেছিলেন।
সমাজ মানুষ ও ইতর প্রাণীর মধ্যে যে বৈষম্য বজায় রাখে, আলোবাবু তা মানতেন না। তাঁর
এই সমদর্শী প্রেমই সমাজের কাছে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ও ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে হয়েছিল।
তৃতীয়ত, একটি ঘড়িকে সজীব সত্তা হিসেবে দেখা এবং তার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করাকে
সাধারণ মানুষ পাগলামি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেনি।
আলোবাবু ছিলেন ‘স্নেহের
কাঙাল’। তিনি সবার সঙ্গে মিশতে চেয়েছিলেন, সবাইকে সেবা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু
সমাজ তাঁকে কেবল ‘আলুবাবু’ বলে উপহাস করেছে। তাঁর সরলতা ও রিক্ততা সমাজের কাছে
ব্রাত্য ছিল। সমাজ সবসময় সফল ও বাস্তববাদী মানুষকে গ্রহণ করে, কিন্তু আলোবাবুর মতো
নিঃস্ব ও ভাবালু মানুষের জন্য সেখানে কোনো স্থান ছিল না। এই সংঘাতের ফলেই শেষ
পর্যন্ত তিনি ছিটকে পড়ে পাগলা গারদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
১৮.
"তাঁর আসল নাম আলো। চেহারা অবশ্য নামের উপযুক্ত নয়।" — আলোবাবুর
চরিত্রের বৈপরীত্য আলোচনা করো। (৫)
উঃ ‘আলোবাবু’
গল্পের প্রধান চরিত্রের নাম ‘আলো’ হলেও তাঁর জীবনে এবং চেহারায় অন্ধকারেরই আধিপত্য
ছিল বেশি। লেখক শুরুতেই এক চমৎকার বৈপরীত্যের অবতারণা করেছেন। আলো মানে উজ্জ্বলতা,
পবিত্রতা এবং দিশা। কিন্তু আলোবাবুর গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো এবং তাঁর ভাগ্য ছিল
ততোধিক অন্ধকারাচ্ছন্ন।
চরিত্রের এই বৈপরীত্য
তাঁর বাহ্যিক সাজপোশাকেও প্রকট। কুচকুচে কালো রঙের ওপর তিনি সবসময় ধপধপে সাদা থান
এবং সাদা চাদর পরতেন। এই সাদা ও কালোর বৈপরীত্য যেন তাঁর অন্তরের শুচিতা এবং
বাইরের প্রতিকূলতার সংঘর্ষকে নির্দেশ করে। আবার তাঁর চেহারায় যখন ‘বেগুন-পোড়া’র
মতো রুক্ষতা ছিল, তখন তাঁর মনের ভেতর ছিল শিশুর মতো কমনীয়তা।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য
দেখা যায় তাঁর পেশা ও প্রবৃত্তিতে। তিনি কোনো কাজ বা উপার্জনে সফল হতে পারেননি,
কিন্তু সেবার কাজে তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি অর্থাভাবে বিয়ে করেননি বা সংসার গড়তে
পারেননি, অথচ তাঁর মনের ভেতর ছিল অগাধ পিতৃস্নেহ ও মমতা। তিনি নিঃস্ব ও দরিদ্র
হয়েও অন্যের প্রয়োজনে দু-আনা পয়সা খরচ করে পাখির ছানা উদ্ধার করেন। এই
বৈপরীত্যগুলোই প্রমাণ করে যে আলোবাবু বাহ্যিকভাবে কদাকার বা সাধারণ হলেও তাঁর
অন্তরাত্মা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অসাধারণ। এই বৈপরীত্যই তাঁকে এক ট্র্যাজিক হিরোর
মর্যাদা দিয়েছে।
১৯.
"টপ-টপ করে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা।" — আলোবাবুর কান্নার
কারণ কী? তাঁর এই শোকের গভীরতা আলোচনা করো। (২+৩)
উঃ আলোবাবুর
এই নিভৃত কান্নার কারণ ছিল তাঁর পরম প্রিয় ছোট্ট ঘড়িটির চুরি হয়ে যাওয়া। এটি কোনো
সাধারণ বিচ্ছেদ ছিল না, ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র সঙ্গীকে চিরতরে হারানো।
আলোবাবুর এই শোক ছিল
অত্যন্ত গভীর ও মর্মস্পর্শী। সাধারণত মানুষ প্রিয়জন হারালে যে শোক প্রকাশ করে,
আলোবাবু একটি জড় যন্ত্রের জন্য সেই একই রকম ব্যাকুলতা অনুভব করেছিলেন। তাঁর এই
কান্নার পেছনে কেবল ঘড়িটির দাম বা উপযোগিতা ছিল না, ছিল সেটির নিরাপত্তার
দুশ্চিন্তা। তিনি ভাবছিলেন, যে ব্যক্তি ঘড়িটি চুরি করেছে, সে হয়তো তাঁর মতো করে
ঘড়িটিকে ভালোবাসতে পারবে না। সময়মতো দম বা ‘খাবার’ না পেয়ে ঘড়িটি হয়তো অচল হয়ে
ধুঁকবে—এই কল্পনা তাঁকে যন্ত্রণাদগ্ধ করছিল।
তাঁর শোকের গভীরতা বোঝা
যায় যখন তিনি আর্তস্বরে গান গাইতে থাকেন। মানুষের নিঃসঙ্গতা যখন চরম সীমায় পৌঁছায়,
তখন চোখের জলই হয় তার শেষ আশ্রয়। আলোবাবু জানতেন, সমাজ তাঁর এই শোক বুঝবে না, বরং
হাসাহাসি করবে। তাই ডাক্তারবাবুর সামনে তাঁর এই কান্না ছিল এক অসহায়ত্বের
আত্মসমর্পণ। এই অশ্রু বিসর্জনের মাধ্যমেই তাঁর জীবনের শেষ আশার প্রদীপটি নিভে
যাওয়ার সংকেত পাওয়া যায়।
২০.
‘আলোবাবু’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (৫)
উঃ ছোটগল্পের
নামকরণের ক্ষেত্রে চরিত্রধর্মী বা ভাবধর্মী হওয়া অত্যন্ত সাধারণ প্রথা। বনফুলের এই
গল্পটি পুরোপুরি একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘আলোবাবু’ নামকরণটি
অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও সার্থক।
গল্পের শুরু থেকে শেষ
পর্যন্ত আমরা আলোবাবু নামের এক অদ্ভুত ও সংবেদনশীল মানুষের জীবন সংগ্রাম ও তাঁর
মানসিক বিবর্তনকে দেখতে পাই। লেখকের কৃতিত্ব হলো, তিনি এমন এক মানুষকে আমাদের
সামনে তুলে ধরেছেন যাঁর নাম ‘আলো’ হলেও জীবন ছিল বিষাদময়। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে
এক গভীর ব্যঙ্গ বা আইরনি (Irony) ফুটে উঠেছে। যে মানুষটির নাম আলো, সে নিজে সমাজের
অন্ধকার কোণে পড়ে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধকার পাগলা গারদে নিঃশেষ হয়ে যায়।
আবার অন্য এক দৃষ্টিকোণ
থেকে দেখলে, আলোবাবু তাঁর নিঃস্বার্থ সেবা এবং প্রাণের মমত্ব দিয়ে অন্যের জীবনে
আলোকপাত করতে চেয়েছিলেন। তিনি পাখির ছানা, কুকুরের ছানা বা রোগীদের সেবা করে এক
প্রকার মানবধর্মের ‘আলো’ জ্বালিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর চারপাশের অন্ধকার সমাজ সেই
আলো সহ্য করতে পারেনি। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আলোবাবুর বিচিত্র চরিত্র, তাঁর
আবেগ, তাঁর ঘড়ির প্রতি প্রেম এবং শেষ করুণ পরিণতি—সবই এই নামকরণের সার্থকতাকে
সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এটি কেবল একটি মানুষের নাম নয়, বরং এক অবহেলিত এবং সংবেদনশীল
হৃদয়ের প্রতীকী পরিচয়।