১. "সবাই তাঁকে আলুবাবু বলত..." — কার কথা বলা হয়েছে?
তাঁকে ‘আলুবাবু’ বলার কারণ কী? তাঁর চেহারার বর্ণনা দাও। (১+২+২)
উঃ বনফুলের ‘আলোবাবু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলোবাবুর কথা এখানে বলা
হয়েছে।
গল্পের প্রধান চরিত্রের
আসল নাম ছিল ‘আলো’। কিন্তু তাঁর বাহ্যিক অবয়ব বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এই
নামের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, নিরীহ এবং কিছুটা
অপ্রকৃতিস্থ গোছের মানুষ। সমাজের মানুষ প্রায়ই তাঁর সরলতা বা চারিত্রিক বিচ্যুতিকে
পরিহাসের ছলে দেখত। নামের ‘আলো’ শব্দটিকে বিকৃত করে বা তাঁর আলুথালু ও লক্ষ্যহীন
জীবনযাত্রার প্রতি ব্যঙ্গ করে স্থানীয় লোকেরা তাঁকে ‘আলুবাবু’ বলে ডাকত। এটি মূলত
তাঁর প্রতি সমাজের এক প্রকার অবজ্ঞা ও কৌতুকের বহিঃপ্রকাশ।
আলোবাবুর চেহারার বর্ণনা
প্রসঙ্গে লেখক জানিয়েছেন যে, তাঁর নাম ‘আলো’ হলেও গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো। তাঁর
মুখমণ্ডলকে লেখক ‘বেগুন-পোড়া’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মুখে ছিল কালো গোঁফ-দাড়ি
এবং যুগ্ম-ভ্রু। মাথায় ছিল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা বাবরি চুল। গলায় একটি তুলসীর মালা
ছিল, যা ঘাম ও ধুলোয় কালো হয়ে গিয়েছিল। তবে তাঁর পরনের থান কাপড় এবং গায়ের চাদর
ছিল ধপধপে সাদা। তিনি জুতো পরতেন না এবং অত্যন্ত সাদাসিধে বেশে থাকতেন। এই
বৈপরীত্যময় চেহারার মধ্যেই তাঁর নিঃসঙ্গ ও অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছিল।
২. "কী চাই আপনার?" — বক্তা কে? ব্যক্তিটির আগমনের প্রকৃত
উদ্দেশ্য কী ছিল? তিনি কীভাবে সাহায্য চেয়েছিলেন? (১+২+২)
উঃ ‘আলোবাবু’ গল্পের কথক তথা পেশায় ডাক্তার বিনুবাবু হলেন এই প্রশ্নের
বক্তা।
আলোবাবু যখন প্রথম
ডাক্তারের বৈঠকখানায় আসেন, তখন ডাক্তারবাবু ভেবেছিলেন তিনি হয়তো আর পাঁচজন
সাহায্যপ্রার্থীর মতো টাকা চাইতে এসেছেন। কিন্তু আলোবাবুর আগমনের উদ্দেশ্য ছিল
সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং মানবিক। তিনি একটি আহত পাখির ছানাকে বাঁচাতে এসেছিলেন। এক
পাষণ্ড বালক পাখির ছানাটির পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তা দেখে আলোবাবু
তাঁর সামান্য সম্বল থেকে দু-আনা পয়সা দিয়ে পাখিটিকে উদ্ধার করেন। সেই আহত পাখির
চিকিৎসা করাতেই তিনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
সাহায্য চাওয়ার ধরনে
আলোবাবুর বিনয় ও কুণ্ঠা প্রকট ছিল। তিনি অত্যন্ত কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে
ডাক্তারবাবুকে অনুরোধ করেন যেন পাখিটির পা একটু দেখে দেওয়া হয়। তিনি ডাক্তারবাবুর
সুখ্যাতি শুনেই সেখানে এসেছিলেন। তাঁর বাঁ হাতের একটি ছোট থলি থেকে অতি সযত্নে
পাখির ছানাটি বার করে তিনি তুলে ধরেন। তাঁর এই আচরণে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল
না, বরং ছিল এক অসহায় জীবের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। এইভাবেই তিনি এক অদ্ভুত কায়দায়
ডাক্তারের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।
৩.
"জীবন্ত কোনো জিনিস পোষবার সামর্থ্য নেই আমার।" — উক্তিটি কার? কেন তাঁর
সামর্থ্য নেই? এই উক্তির মাধ্যমে তাঁর চরিত্রের কোন দিকটি ফুটে ওঠে? (১+২+২)
উঃ আলোচ্য
উক্তিটি গল্পের প্রধান চরিত্র আলোবাবুর।
আলোবাবু ছিলেন অত্যন্ত
দরিদ্র এবং নিঃস্ব একজন মানুষ। তাঁর নিজেরই মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ঠাঁই ছিল না;
তিনি অন্যের দয়ায় অবিনাশবাবুর বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে থাকতেন। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট
আয়ের উৎস বা চাকরি ছিল না। একটি পোষা প্রাণীকে পালন করতে গেলে যে ন্যূনতম আর্থিক
সংগতি এবং খাবারের সংস্থান প্রয়োজন, তা আলোবাবুর ছিল না। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে
রাখাই যেখানে তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল, সেখানে অন্য একটি প্রাণীর দায়িত্ব নেওয়া তাঁর
সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
এই উক্তির মাধ্যমে
আলোবাবুর চরিত্রের প্রবল দায়িত্ববোধ এবং স্বচ্ছ মানসিকতা ফুটে ওঠে। তিনি জীবজন্তু
ভালোবাসতেন ঠিকই, কিন্তু সামর্থ্য নেই বলে তাদের বন্দি করে রাখা বা পুষে রাখা তাঁর
নীতিবিরুদ্ধ ছিল। তিনি কেবল উদ্ধারকর্তা হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিলেন, মালিক হিসেবে
নয়। তাঁর এই ‘সামর্থ্য নেই’ কথাটির পেছনে এক গভীর হাহাকার ও একাকীত্ব লুকিয়ে আছে।
এমনকি অর্থাভাবে তিনি বিয়ে পর্যন্ত করেননি, যা তাঁর বাস্তববোধ ও ত্যাগের পরিচয়
দেয়।
৪.
"আর একবার কুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলে চাইলেন।" — কার কথা বলা হয়েছে? তাঁর এই
কুণ্ঠার কারণ কী? তিনি কোথায় থাকতেন? (১+২+২)
উঃ এখানে
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলোবাবুর কথা বলা হয়েছে।
আলোবাবুর এই কুণ্ঠার
মূলে ছিল তাঁর চরম নিঃস্বতা এবং পরনির্ভরশীলতা। তিনি ছিলেন একজন অতি সংবেদনশীল
মানুষ, যিনি সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। যখনই কেউ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা
আশ্রয় নিয়ে প্রশ্ন করত, তখনই তিনি হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। নিজের কোনো স্থায়ী পরিচয়
বা নিজস্ব বাড়ি না থাকায় তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন। অন্যের করুণার ওপর টিকে
থাকার গ্লানি তাঁকে সবসময় কুণ্ঠিত করে রাখত, যা তাঁর চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠত।
আলোবাবু সেই সময়
অবিনাশবাবুর বাড়িতে থাকতেন। অবিনাশবাবু ছিলেন একজন নামজাদা উকিল। যদিও আলোবাবুর
সঙ্গে তাঁর সরাসরি কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না, তবুও আলোবাবু এক অদ্ভুত সম্পর্কের
কথা জানান। তাঁর এক দূর-সম্পর্কীয় ভাগ্নীর বন্ধুর শ্বশুর ছিলেন অবিনাশবাবু।
অবিনাশবাবু দয়া করেই এই অকিঞ্চিৎকর মানুষটিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই
আশ্রিত পরিচয়টি আলোবাবুর মনে সর্বদা এক প্রকার জড়তা ও কুণ্ঠা তৈরি করে রাখত।
৫.
"স্নেহের কাঙাল বেচারা। গরিবও খুব।" — কার সম্পর্কে কে এই মন্তব্য
করেছেন? তাঁর এমন মন্তব্যের কারণ কী? (১+২+২)
উঃ আলোবাবু
সম্পর্কে নামজাদা উকিল অবিনাশবাবু এই মন্তব্যটি করেছিলেন।
অবিনাশবাবু আলোবাবুকে
খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, আলোবাবুর নিজের বলতে পৃথিবীতে
কেউ নেই। একাকীত্বে ভোগা এই মানুষটি সবসময় ভালোবাসা ও মমতা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল
থাকতেন। তিনি সামান্য সুযোগ পেলেই পশু-পাখি বা মানুষের সেবা করতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
তাঁর এই অকৃত্রিম সেবা করার প্রবণতা আসলে ভালোবাসা পাওয়ারই একটি আকুতি ছিল। এই
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেই অবিনাশবাবু তাঁকে ‘স্নেহের কাঙাল’ বলে অভিহিত
করেছিলেন।
মন্তব্যের দ্বিতীয় অংশে
আলোবাবুর আর্থিক দৈন্যের কথা বলা হয়েছে। তাঁর কোনো স্থায়ী উপার্জন ছিল না, তিনি
অন্যের বাড়িতে দয়ায় থাকতেন। তাঁর পোশাক-আশাক এবং জীবনযাপন ছিল অতি নগণ্য। তিনি
জীবনের নূন্যতম চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পারতেন না। এমনকি অভাবের তাড়নায় তিনি তাঁর
শখের গান-বাজনার সরঞ্জাম পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আর্থিক দারিদ্র্য এবং
মানসিক একাকীত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আলোবাবু এক ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন
বলে অবিনাশবাবু মনে করতেন।
৬.
"সেবা করতে বড়ো ভালোবাসে..." — কার সেবার কথা বলা হয়েছে? কেন তিনি
সেবাকেই জীবনের ব্রত করেছিলেন? সেবার পাত্র-পাত্রী কারা ছিল? (১+২+২)
উঃ এখানে
আলোবাবুর নিঃস্বার্থ এবং অদ্ভুত ধরণের সেবার কথা বলা হয়েছে।
আলোবাবু ছিলেন
সমাজ-সংসার থেকে বিচ্যুত একজন মানুষ। তাঁর নিজের কোনো পরিবার বা সন্তান ছিল না।
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো কাউকে ভালোবাসা বা কারো যত্ন নেওয়া। আলোবাবু এই
ভালোবাসার অভাব পূরণ করার মাধ্যম হিসেবে সেবাকেই বেছে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে অসহায়
ও আর্ত জীবের সেবা করে তিনি এক প্রকার মানসিক তৃপ্তি লাভ করতেন। নিজের জীবনের
ব্যর্থতা ও শূন্যতা পূরণ করতেই তিনি পরহিতৈষী হয়ে উঠেছিলেন। সেবার মাধ্যমেই তিনি
নিজেকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন।
আলোবাবুর সেবার
পাত্র-পাত্রী ছিল মূলত সমাজের পরিত্যক্ত বা অসহায় জীব ও শিশুরা। তিনি রাস্তার এক
পা-কাটা পাখির ছানার সেবা করেছেন, অবিনাশবাবুর ছেলের কুকুর ছানার পিচুটি পরিষ্কার
করেছেন এবং হাসপাতালের রোগীদের ঘা ধুইয়ে দিয়েছেন। এমনকি অবিনাশবাবুর শিশু পুত্র
তিনুর প্রতিও তাঁর অগাধ স্নেহ ছিল। তাঁর সেবার বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, যাঁদের কেউ
দেখার নেই বা যারা নিজেদের কষ্ট ব্যক্ত করতে পারে না, তাঁদের প্রতিই আলোবাবুর টান
ছিল সবচেয়ে বেশি।
৭.
"মাসখানেক পরেই কিন্তু চাকরিটি গেল তাঁর।" — কার চাকরি গিয়েছিল? তাঁর
কর্মস্থল কোথায় ছিল? চাকরি যাওয়ার কারণ কী ছিল? (১+২+২)
উঃ গল্পের
প্রধান চরিত্র আলোবাবুর চাকরি যাওয়ার কথা এখানে বলা হয়েছে।
ডাক্তার বিনুবাবুর বন্ধু
তথা সিভিল সার্জনের সহায়তায় আলোবাবু স্থানীয় হাসপাতালের আউট-ডোরে একটি ‘প্রবেশনার
ড্রেসার’-এর কাজ পেয়েছিলেন। তাঁর কাজ ছিল হাসপাতালের রোগীদের ঘা পরিষ্কার করা এবং
ড্রেসিং করা। মাসিক দশ টাকা বেতনের এই চাকরিটি তাঁর মতো নিঃস্ব মানুষের কাছে
অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই রোগীদের সেবা করছিলেন।
চাকরি যাওয়ার কারণটি ছিল
আলোবাবুর অতি-সরলতা এবং ভুল সিদ্ধান্ত। একদিন এক রোগীর পায়ের ঘা কিছুতেই সারছিল
না। সেই রোগী নিজেই তাঁকে একটি ওষুধ দেখিয়ে বলেছিল সেটি লাগালে ঘা সেরে যাবে।
আলোবাবু কোনো ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়াই সরল বিশ্বাসে রোগীর কথা মতো সেই ঘায়ে
কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে দেন। এর ফলে রোগী তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার শুরু করে এবং
হাসপাতালে হৈ-চৈ পড়ে যায়। হাসপাতালের ডাক্তার এই হঠকারী কাজের জন্য অত্যন্ত
ক্ষুব্ধ হন এবং আলোবাবুকে কর্মচ্যুত করেন। তাঁর এই ‘ভালো করতে গিয়ে মন্দের’
প্রবণতাই তাঁর চাকরির কাল হয়েছিল।
৮.
"আলোবাবু যা করেছিলেন তা কোনও মা সহ্য করতে পারেন না।" — আলোবাবু কী
করেছিলেন? এর ফলে তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল? (১+২+২)
উঃ আলোবাবু
এক অদ্ভুত কায়দায় কুকুরের ছানা এবং অবিনাশবাবুর শিশু পুত্র তিনুকে স্নেহ প্রকাশ
করেছিলেন।
একদিন আলোবাবু এক বগলে
অবিনাশবাবুর শিশু পুত্র তিনুকে এবং অন্য বগলে একটি দেশি কুকুরের ছানাকে নিয়ে আদর
করছিলেন। তিনি একবার কুকুরটির মুখে এবং পরক্ষণেই শিশুটির মুখে চুমু খাচ্ছিলেন।
স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক সংস্কারের দিক থেকে এটি ছিল অত্যন্ত বীভৎস ও
অগ্রহণযোগ্য একটি কাজ। আলোবাবুর কাছে জীব ও মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না,
কিন্তু একজন সচেতন মায়ের কাছে এটি ছিল তাঁর সন্তানের চরম অবমাননা ও বিপদের কারণ।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া
ছিল অত্যন্ত কঠোর। অবিনাশবাবুর স্ত্রী এই দৃশ্য দেখে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন এবং
আলোবাবুকে তৎক্ষণাৎ তাঁদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। আলোবাবু তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুও
হারান। সমাজের চোখে যা অস্বাস্থ্যকর বা অদ্ভুত, আলোবাবুর কাছে তা ছিল নিছকই
ভালোবাসা। কিন্তু এই ‘অস্বাভাবিক’ আচরণের ফলেই তাঁকে পথে বসতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত
ডাক্তার বিনুবাবুই তাঁকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে বাধ্য হন।
৯.
"আপনি গান-বাজনা জানেন নাকি?" — বক্তা কে? আলোবাবু গান-বাজনা সম্পর্কে
কী জানিয়েছিলেন? তিনি বর্তমানে কী বাজাচ্ছিলেন? (১+২+২)
উঃ এই
প্রশ্নের বক্তা হলেন ডাক্তার বিনুবাবু, যিনি আলোবাবুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
ডাক্তারবাবুর প্রশ্নের
উত্তরে আলোবাবু অত্যন্ত কুণ্ঠার সঙ্গে জানান যে, এককালে তিনি ডুগি-তবলা বাজাতে
পারতেন। অর্থাৎ সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং প্রাথমিক শিক্ষা ছিল। কিন্তু
দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে পড়ে তাঁকে তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্রগুলো বিক্রি করে দিতে
হয়। তাঁর জীবনের রিক্ততা এতটাই ছিল যে, শখের সরঞ্জামগুলোও তিনি ধরে রাখতে পারেননি।
তাঁর এই উত্তর থেকে তাঁর অতীত স্বচ্ছলতা এবং বর্তমান করুণ অবস্থার এক করুণ চিত্র
ফুটে ওঠে।
বর্তমানে আলোবাবু একটি
পুরনো ‘সোলার হ্যাট’ বা সাহেবি টুপি বাজাচ্ছিলেন। বাদ্যযন্ত্রহীন জীবনে তিনি এই
টুপিটিকেই তবলার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি টুপির ওপর আঙুল চালিয়ে গান
গাইতেন। এককালে যিনি সালোয়ার-স্যুট পরতেন এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, তাঁর কাছে এখন
সম্বল বলতে ছিল শুধু এই পুরনো হ্যাটটি। এই অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ঘটনাটি একদিকে
যেমন কৌতুক তৈরি করে, অন্যদিকে আলোবাবুর নিঃস্ব জীবনের করুণ ইতিহাসকে তুলে ধরে।
১০.
"দশটা বেজে গেছে আমার ঘড়িতে দম দেওয়া হয়নি এখনও।" — উক্তিটি কার? তিনি
কেন ছুটছিলেন? তাঁর কাছে ঘড়ির গুরুত্ব কী ছিল? (১+২+২)
উঃ উক্তিটি
আলোবাবুর।
আলোবাবু হন্তদন্ত হয়ে
ছুটছিলেন কারণ তাঁর ঘড়িতে দম দেওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। তিনি অন্য একজনের বাড়ি
গিয়েছিলেন গাইয়ের বাছুর দেখতে। সেখানে দশটার ঘণ্টা শুনে তিনি আঁতকে ওঠেন। তিনি
প্রতিদিন ঠিক সকাল দশটায় তাঁর প্রিয় ঘড়িতে দম দিতেন। এক মিনিট দেরি হওয়াকেও তিনি
সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর মনে হয়েছিল, সময়মতো দম না দিলে তাঁর প্রিয় ঘড়িটি হয়তো
কষ্ট পাবে। এই তীব্র ব্যাকুলতা থেকেই তিনি উর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটছিলেন।
আলোবাবুর কাছে ঘড়িটি
নিছক কোনো যন্ত্র ছিল না, সেটি ছিল তাঁর একমাত্র ভালোবাসার বস্তু। তাঁর জীবনে কোনো
আত্মীয় বা বন্ধু ছিল না, তাই তিনি তাঁর সমস্ত স্নেহ ও মমতা ওই ঘড়িটির ওপর উজাড় করে
দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের যেমন খাবারের প্রয়োজন হয়, ঘড়ির তেমনি দমের
প্রয়োজন। ঘড়িটিকে তিনি প্রাণবন্ত এক সত্তা হিসেবে দেখতেন। সেটিকে অতি সযত্নে লাল
শালু ও তুলোর আবরণে ঢেকে রাখতেন এবং পুজোর মতো ভক্তি ভরে দম দিতেন।
১১.
"আমাদের যেমন খাবার, ঘড়ির তেমনি দম..." — এই উপমাটি কার? কেন তিনি এমন
কথা বলেছেন? উক্তিটির তাৎপর্য লেখো। (১+২+২)
উঃ এই
চমৎকার উপমাটি আলোবাবুর নিজস্ব দর্শন থেকে উদ্ভূত।
আলোবাবু ঘড়িটিকে কোনো জড়
বস্তু মনে করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি সচল জিনিসেরই জীবন আছে এবং সেই
জীবন টিকিয়ে রাখতে শক্তির প্রয়োজন। মানুষ যেমন খাদ্য গ্রহণ না করলে দুর্বল হয়ে পড়ে
এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়, ঘড়িটিও তেমনি দম না পেলে অচল হয়ে পড়ে। ঘড়ির এই সচলতাকে
তিনি জীবনের স্পন্দনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর এই বিশ্বাসের ফলেই তিনি দম
দেওয়াকে একটি আবশ্যকীয় সেবামূলক কাজ হিসেবে দেখতেন।
এই উক্তিটির তাৎপর্য
অত্যন্ত গভীর। আলোবাবু সমাজে কোনো মর্যাদা বা ভালোবাসা পাননি। মানুষ তাঁকে অবজ্ঞা
করেছে, চাকরি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই তিনি তাঁর ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে
নিয়ে গেছেন একটি ঘড়ির ওপর। একটি যন্ত্রকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে তিনি আসলে নিজের নিঃসঙ্গতাকে
ঢাকতে চেয়েছেন। ঘড়িটিকে ‘খাবার’ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের পিতৃত্ব বা
অভিভাবকত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতেন। এটি তাঁর মানসিক অস্থিরতা এবং একাকীত্বেরই
বহিঃপ্রকাশ।
১২.
"দেখলাম ঘরে ঢুকেই তিনি নিজের ভাঙা তোরঙ্গটা খুললেন।" — কে তোরঙ্গ
খুলেছিলেন? তোরঙ্গের ভেতর থেকে কী কী বেরিয়ে এল? (১+২+২)
উঃ ডাক্তার
বিনুবাবু যখন আড়াল থেকে লক্ষ্য করছিলেন, তখন তিনি দেখেন আলোবাবু নিজের ঘরে ঢুকে
তাঁর ভাঙা তোরঙ্গটি খুলছেন।
তোরঙ্গের ভেতর থেকে
আলোবাবু প্রথমে একটি ছোট টিনের বাক্স বার করেন। সেই বাক্সের ভেতর ছিল একটি
ন্যাকড়ার ছোট পুঁটুলি। সেটি খুললে বেরিয়ে এল লাল রঙের শালুর একটি পুঁটুলি। সেই
শালুর আবরণ সরালে দেখা গেল রেশমি ন্যাকড়ার আরও একটি আস্তরণ। সর্বশেষ স্তরে ছিল
খানিকটা তুলো। এই বহুস্তরীয় সুরক্ষার নিচেই সযত্নে রাখা ছিল আলোবাবুর সেই অতি
প্রিয় ছোট্ট ঘড়িটি।
এই বর্ণনা থেকে আলোবাবুর
ঘড়িটির প্রতি অগাধ মমত্ববোধ ও সংরক্ষণের মানসিকতা ফুটে ওঠে। তিনি অত্যন্ত সযত্নে
ঘড়িটিকে লুকিয়ে রাখতেন যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। ঘড়িটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে দামি
রত্ন। তাঁর অভাবের সংসারে ঘড়িটিই ছিল একমাত্র আভিজাত্যের প্রতীক। বহুস্তরীয় কাপড়ের
আবরণে ঢেকে রাখার অর্থ হলো, তিনি ঘড়িটিকে ধুলোবালি বা অনিষ্ট থেকে স্রেফ
যান্ত্রিকভাবে নয়, বরং এক প্রকার ধর্মীয় শুচিতার সঙ্গে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
১৩.
"মনে হলো যেন পুজো করছেন।" — কার কথা বলা হয়েছে? তিনি কী করছিলেন? কেন
লেখক এমন মন্তব্য করেছেন? (১+২+২)
উঃ এখানে
আলোবাবুর কথা বলা হয়েছে।
আলোবাবু তাঁর সযত্নে
রক্ষিত ছোট্ট ঘড়িটি বের করে অত্যন্ত একাগ্রতার সঙ্গে দম দিচ্ছিলেন। তিনি বাবু হয়ে
চাপটালি খেয়ে বসে ঘড়িটিকে হাতে নিলেন এবং চোখ বুজে অতি ধীরে ধীরে দমের চাবি
ঘোরাচ্ছিলেন। তাঁর এই কাজে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, বরং ছিল এক প্রকার প্রশান্তি ও
নিমগ্নতা। তিনি যেন জাগতিক সমস্ত কিছু ভুলে ওই মুহূর্তটিকে পবিত্র মনে করছিলেন।
লেখক এই দৃশ্যকে ‘পুজো’র
সঙ্গে তুলনা করেছেন কারণ আলোবাবুর মধ্যে ছিল অগাধ ভক্তি ও একাগ্রতা। সাধারণত মানুষ
দেবতার মূর্তির সামনে যে ভক্তি নিয়ে বসে, আলোবাবুও ঠিক সেই একই নিবেদন নিয়ে ঘড়িটির
সামনে বসেছিলেন। তাঁর কাছে ঘড়িটি ছিল পরমাত্মার মতো। ঘড়িটিকে দম দেওয়া তাঁর কাছে
নিছক কাজ ছিল না, ছিল এক প্রকার আধ্যাত্মিক সাধনা। জীবনের সমস্ত প্রেম ও ভক্তি
তিনি একটি ছোট যন্ত্রে সমর্পণ করেছিলেন বলেই লেখক এই আধ্যাত্মিক উপমাটি ব্যবহার
করেছেন।
১৪.
"আমায় ওরা সইলো না কেউ/আমার কাছে রইলো না কেউ —" — এই গানটি কে
গাইছিলেন? গানের লাইন দুটির তাৎপর্য আলোচনা করো। (১+৪)
উঃ এই করুণ
এবং আত্মবিশ্লেষণমূলক গানটি গাইছিলেন আলোবাবু।
গানের এই দুটি লাইনের
মধ্যে আলোবাবুর সমগ্র জীবনের ট্র্যাজেডি বা করুণ রস নিহিত আছে। আলোবাবু ছিলেন একজন
অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ, যিনি সবাইকে ভালোবাসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ তাঁকে
গ্রহণ করতে পারেনি। অবিনাশবাবুর বাড়ি থেকে তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে, হাসপাতাল থেকে
তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অদ্ভুত আচরণ ও ‘পাগলামি’র কারণে কেউ তাঁর কাছে স্থায়ীভাবে
থাকেনি। গানটির মাধ্যমে তাঁর এই নিদারুণ একাকীত্ব এবং সামাজিক বর্জনের যন্ত্রণা
ফুটে উঠেছে। তিনি অনুভব করেছেন যে, এই পৃথিবীতে তিনি ব্রাত্য।
এই গানের মধ্য দিয়ে তাঁর
মনের গভীরতম ক্ষত প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গানটি গাইছিলেন তাঁর একমাত্র ভালোবাসার
বস্তু ‘ঘড়ি’টি হারিয়ে যাওয়ার ঠিক পরেই। মানুষ তো তাঁকে আগেই ত্যাগ করেছিল, এখন
তাঁর শেষ সম্বল ও সঙ্গি ঘড়িটিও তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে গেছে। ‘ওরা’ বলতে তিনি যেমন
সমাজকে বুঝিয়েছেন, তেমনি তাঁর দুর্ভাগ্যের শিকার হওয়া প্রতিটি মুহূর্তকেও
বুঝিয়েছেন। এটি ছিল তাঁর অস্তিত্বের সংকট ও চরমতম বিষাদের এক সুর, যা
ডাক্তারবাবুকেও অবাক করে দিয়েছিল।
১৫.
"আমার ঘড়িটা চুরি হয়ে গেছে।" — উক্তিটি কার? ঘড়ি চুরির ফলে তাঁর মানসিক
অবস্থা কেমন হয়েছিল? (১+২+২)
উঃ উক্তিটি
আলোবাবুর। তিনি ডাক্তার বিনুবাবুর কাছে এই দুঃসংবাদটি দিয়েছিলেন।
ঘড়িটি চুরি হওয়ার ফলে
আলোবাবু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি এক চরম নিরাপত্তাহীনতা ও শোকের মধ্যে
নিমজ্জিত হয়েছিলেন। তাঁর কাছে ঘড়িটি কেবল সময় দেখার যন্ত্র ছিল না, ছিল তাঁর
একমাত্র আত্মার আত্মীয়। ঘড়িটি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো তাঁর জীবনের শেষ আশাটুকুও
চিরতরে নিভে যাওয়া। তিনি অনুভব করেছিলেন যে তাঁর ভালোবাসার পাত্রটি তাঁর থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলে গেছে।
এই অবস্থায় আলোবাবু
অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। তিনি তাঁর হ্যাট বাজিয়ে তারস্বরে গান গাইতে
থাকেন। সাধারণ মানুষ দুঃখে চুপ করে থাকে, কিন্তু আলোবাবু তাঁর হাহাকারকে গানের
সুরে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপ-টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর বড়
আফসোস ছিল এই যে, যে চোর ঘড়িটি নিয়েছে, সে হয়তো ঠিক সময়মতো সযত্নে ঘড়িটিকে ‘খাবার’
বা দম দিতে পারবে না। ঘড়িটির কষ্টের কথা ভেবেই তাঁর যন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিল।
১৬.
"আলোবাবু এখন পাগলা গারদে আছেন।" — গল্পের শেষে আলোবাবুর এই পরিণতির
কারণ কী? সমাজ এই পরিণতির জন্য কতটা দায়ী? (১+২+২)
উঃ ‘আলোবাবু’
গল্পের শেষে প্রধান চরিত্রটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগলা গারদে আশ্রয় নিয়েছেন।
আলোবাবুর এই করুণ
পরিণতির মূলে ছিল তাঁর অতি-সংবেদনশীলতা এবং সমাজের নিষ্ঠুরতা। তিনি তাঁর সমস্ত
আবেগ ও ভালোবাসা একটি ঘড়ির ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। যখন সেই ঘড়িটিও চুরি হয়ে গেল, তখন
তাঁর মনের শেষ বাঁধনটিও ছিঁড়ে গেল। পৃথিবীতে তাঁর আর কোনো অবলম্বন অবশিষ্ট রইল না।
একাকীত্ব ও শোকের আতিশয্যে তিনি বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। তাঁর
বিচিত্র আচরণ পাগলামি হিসেবে গণ্য হলো এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বন্দি হতে হলো।
এই পরিণতির জন্য সমাজ
অনেকাংশেই দায়ী। সমাজ আলোবাবুকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ দেয়নি। তাঁর
সরলতাকে লোকে উপহাস করেছে, তাঁর সেবাকে পাগলামি বলেছে। হাসপাতালে তিনি ভালো করতে
গিয়ে ভুল করেছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে সংশোধনের সুযোগ দেয়নি। তাঁর নিঃসঙ্গতাকে কেউ
সহানুভূতির চোখে দেখেনি। সমাজ যদি তাঁকে একটু মর্যাদা ও আশ্রয় দিত, তবে হয়তো একটি
জড় বস্তুর ওপর তাঁকে এতটা নির্ভর করতে হতো না। সমাজের অসহিষ্ণুতাই এক সুস্থ
মানুষকে উন্মাদনায় ঠেলে দিয়েছে।
১৭.
"সমাজের সঙ্গে নিজেকে তিনি খাপ খাওয়াতে পারলেন না কিছুতে।" — ‘আলোবাবু’
গল্প অবলম্বনে মন্তব্যটির সত্যতা বিচার করো। (৫)
উঃ বনফুলের
‘আলোবাবু’ গল্পে দেখা যায় যে, আলোবাবু ছিলেন এক অদ্ভুত খেয়ালি মানুষ, যাঁর
জীবনদর্শন প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক ছিল। সমাজ চলে
নির্দিষ্ট নিয়ম, স্বার্থ এবং ব্যবহারিক বুদ্ধির ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে আলোবাবু
চলতেন কেবল আবেগ ও অকৃত্রিম মমত্ববোধের টানে।
প্রথমত, হাসপাতালে চাকরি
করার সময় তিনি কোনো প্রোটোকল না মেনে রোগীর উপকারের নেশায় কার্বলিক অ্যাসিড
ব্যবহার করেন। সমাজ চায় নিয়মনিষ্ঠা, কিন্তু আলোবাবু চেয়েছিলেন দ্রুত আরোগ্য।
দ্বিতীয়ত, অবিনাশবাবুর বাড়িতে তিনি কুকুর এবং শিশুকে একাসনে বসিয়ে আদর করেছিলেন।
সমাজ মানুষ ও ইতর প্রাণীর মধ্যে যে বৈষম্য বজায় রাখে, আলোবাবু তা মানতেন না। তাঁর
এই সমদর্শী প্রেমই সমাজের কাছে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ও ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে হয়েছিল।
তৃতীয়ত, একটি ঘড়িকে সজীব সত্তা হিসেবে দেখা এবং তার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করাকে
সাধারণ মানুষ পাগলামি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেনি।
আলোবাবু ছিলেন ‘স্নেহের
কাঙাল’। তিনি সবার সঙ্গে মিশতে চেয়েছিলেন, সবাইকে সেবা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু
সমাজ তাঁকে কেবল ‘আলুবাবু’ বলে উপহাস করেছে। তাঁর সরলতা ও রিক্ততা সমাজের কাছে
ব্রাত্য ছিল। সমাজ সবসময় সফল ও বাস্তববাদী মানুষকে গ্রহণ করে, কিন্তু আলোবাবুর মতো
নিঃস্ব ও ভাবালু মানুষের জন্য সেখানে কোনো স্থান ছিল না। এই সংঘাতের ফলেই শেষ
পর্যন্ত তিনি ছিটকে পড়ে পাগলা গারদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
১৮.
"তাঁর আসল নাম আলো। চেহারা অবশ্য নামের উপযুক্ত নয়।" — আলোবাবুর
চরিত্রের বৈপরীত্য আলোচনা করো। (৫)
উঃ ‘আলোবাবু’
গল্পের প্রধান চরিত্রের নাম ‘আলো’ হলেও তাঁর জীবনে এবং চেহারায় অন্ধকারেরই আধিপত্য
ছিল বেশি। লেখক শুরুতেই এক চমৎকার বৈপরীত্যের অবতারণা করেছেন। আলো মানে উজ্জ্বলতা,
পবিত্রতা এবং দিশা। কিন্তু আলোবাবুর গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো এবং তাঁর ভাগ্য ছিল
ততোধিক অন্ধকারাচ্ছন্ন।
চরিত্রের এই বৈপরীত্য
তাঁর বাহ্যিক সাজপোশাকেও প্রকট। কুচকুচে কালো রঙের ওপর তিনি সবসময় ধপধপে সাদা থান
এবং সাদা চাদর পরতেন। এই সাদা ও কালোর বৈপরীত্য যেন তাঁর অন্তরের শুচিতা এবং
বাইরের প্রতিকূলতার সংঘর্ষকে নির্দেশ করে। আবার তাঁর চেহারায় যখন ‘বেগুন-পোড়া’র
মতো রুক্ষতা ছিল, তখন তাঁর মনের ভেতর ছিল শিশুর মতো কমনীয়তা।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য
দেখা যায় তাঁর পেশা ও প্রবৃত্তিতে। তিনি কোনো কাজ বা উপার্জনে সফল হতে পারেননি,
কিন্তু সেবার কাজে তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি অর্থাভাবে বিয়ে করেননি বা সংসার গড়তে
পারেননি, অথচ তাঁর মনের ভেতর ছিল অগাধ পিতৃস্নেহ ও মমতা। তিনি নিঃস্ব ও দরিদ্র
হয়েও অন্যের প্রয়োজনে দু-আনা পয়সা খরচ করে পাখির ছানা উদ্ধার করেন। এই
বৈপরীত্যগুলোই প্রমাণ করে যে আলোবাবু বাহ্যিকভাবে কদাকার বা সাধারণ হলেও তাঁর
অন্তরাত্মা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অসাধারণ। এই বৈপরীত্যই তাঁকে এক ট্র্যাজিক হিরোর
মর্যাদা দিয়েছে।
১৯.
"টপ-টপ করে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা।" — আলোবাবুর কান্নার
কারণ কী? তাঁর এই শোকের গভীরতা আলোচনা করো। (২+৩)
উঃ আলোবাবুর
এই নিভৃত কান্নার কারণ ছিল তাঁর পরম প্রিয় ছোট্ট ঘড়িটির চুরি হয়ে যাওয়া। এটি কোনো
সাধারণ বিচ্ছেদ ছিল না, ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র সঙ্গীকে চিরতরে হারানো।
আলোবাবুর এই শোক ছিল
অত্যন্ত গভীর ও মর্মস্পর্শী। সাধারণত মানুষ প্রিয়জন হারালে যে শোক প্রকাশ করে,
আলোবাবু একটি জড় যন্ত্রের জন্য সেই একই রকম ব্যাকুলতা অনুভব করেছিলেন। তাঁর এই
কান্নার পেছনে কেবল ঘড়িটির দাম বা উপযোগিতা ছিল না, ছিল সেটির নিরাপত্তার
দুশ্চিন্তা। তিনি ভাবছিলেন, যে ব্যক্তি ঘড়িটি চুরি করেছে, সে হয়তো তাঁর মতো করে
ঘড়িটিকে ভালোবাসতে পারবে না। সময়মতো দম বা ‘খাবার’ না পেয়ে ঘড়িটি হয়তো অচল হয়ে
ধুঁকবে—এই কল্পনা তাঁকে যন্ত্রণাদগ্ধ করছিল।
তাঁর শোকের গভীরতা বোঝা
যায় যখন তিনি আর্তস্বরে গান গাইতে থাকেন। মানুষের নিঃসঙ্গতা যখন চরম সীমায় পৌঁছায়,
তখন চোখের জলই হয় তার শেষ আশ্রয়। আলোবাবু জানতেন, সমাজ তাঁর এই শোক বুঝবে না, বরং
হাসাহাসি করবে। তাই ডাক্তারবাবুর সামনে তাঁর এই কান্না ছিল এক অসহায়ত্বের
আত্মসমর্পণ। এই অশ্রু বিসর্জনের মাধ্যমেই তাঁর জীবনের শেষ আশার প্রদীপটি নিভে
যাওয়ার সংকেত পাওয়া যায়।
২০.
‘আলোবাবু’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (৫)
উঃ ছোটগল্পের
নামকরণের ক্ষেত্রে চরিত্রধর্মী বা ভাবধর্মী হওয়া অত্যন্ত সাধারণ প্রথা। বনফুলের এই
গল্পটি পুরোপুরি একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘আলোবাবু’ নামকরণটি
অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও সার্থক।
গল্পের শুরু থেকে শেষ
পর্যন্ত আমরা আলোবাবু নামের এক অদ্ভুত ও সংবেদনশীল মানুষের জীবন সংগ্রাম ও তাঁর
মানসিক বিবর্তনকে দেখতে পাই। লেখকের কৃতিত্ব হলো, তিনি এমন এক মানুষকে আমাদের
সামনে তুলে ধরেছেন যাঁর নাম ‘আলো’ হলেও জীবন ছিল বিষাদময়। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে
এক গভীর ব্যঙ্গ বা আইরনি (Irony) ফুটে উঠেছে। যে মানুষটির নাম আলো, সে নিজে সমাজের
অন্ধকার কোণে পড়ে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধকার পাগলা গারদে নিঃশেষ হয়ে যায়।
আবার অন্য এক দৃষ্টিকোণ
থেকে দেখলে, আলোবাবু তাঁর নিঃস্বার্থ সেবা এবং প্রাণের মমত্ব দিয়ে অন্যের জীবনে
আলোকপাত করতে চেয়েছিলেন। তিনি পাখির ছানা, কুকুরের ছানা বা রোগীদের সেবা করে এক
প্রকার মানবধর্মের ‘আলো’ জ্বালিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর চারপাশের অন্ধকার সমাজ সেই
আলো সহ্য করতে পারেনি। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আলোবাবুর বিচিত্র চরিত্র, তাঁর
আবেগ, তাঁর ঘড়ির প্রতি প্রেম এবং শেষ করুণ পরিণতি—সবই এই নামকরণের সার্থকতাকে
সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এটি কেবল একটি মানুষের নাম নয়, বরং এক অবহেলিত এবং সংবেদনশীল
হৃদয়ের প্রতীকী পরিচয়।
0 comments:
Post a Comment