ধ্বনি ও ধ্বনি পরিবর্তন । ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ । ধ্বনি পরিবর্তনের ধারা ।

 

ধ্বনি ও ধ্বনির শ্রেণিবিভাগ:

 

১. ধ্বনির তাত্ত্বিক ধারণা, সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

সাধারণ জগতে একটি কাচের গ্লাস মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেলে যে শব্দ হয়, কিংবা বাতাসের ধাক্কায় গাছের পাতা নড়ে উঠলে যে খসখস আওয়াজ হয়, তাকে আমরা ধ্বনি বলি। কিন্তু ব্যাকরণের দৃষ্টিতে এগুলো ধ্বনি নয়, এগুলো কেবলই ‘শব্দ’ বা ‘আওয়াজ’। ব্যাকরণে ধ্বনি হতে গেলে তার তিনটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হয়:

১. তা মানুষের বাক্-যন্ত্রের (Vocal Organs) সাহায্যে উৎপাদিত হতে হবে।

২. তা অবশ্যই অর্থবোধক (Meaningful) হতে হবে বা কোনো অর্থপূর্ণ শব্দের অংশ হতে হবে।

৩. তা কোনো নির্দিষ্ট ভাষার অংশ বা উপাদান হিসেবে স্বীকৃত হতে হবে।

 

ক. ধ্বনির সংজ্ঞা: মানুষের ফুসফুস-নিঃসৃত বাতাস মুখবিবর, কণ্ঠনালি, তালু, জিহ্বা, দন্ত ও ওষ্ঠের মতো বিভিন্ন বাক্-অঙ্গের সংস্পর্শে ও সংঘর্ষে এসে যে অর্থপূর্ণ, সূক্ষ্মতম এবং শ্রবণযোগ্য আওয়াজ তৈরি করে, তাকে ধ্বনি (Sound) বলে।

খ. ধ্বনি এবং বর্ণের গভীর সম্পর্ক: ভাষা মূলত দুটি রূপে আবির্ভূত হয়: একটি মৌখিক বা বাচনিক রূপ, অন্যটি লিখিত বা চাক্ষুষ রূপ।

1.     ধ্বনি হলো ভাষার মৌখিক রূপ: এটি কানে শোনার বিষয় এবং বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার বিষয়। ধ্বনির কোনো দৃশ্যমান আকৃতি নেই।

2.     বর্ণ হলো ভাষার লিখিত রূপ: ধ্বনি মুখে উচ্চারণ করার পর তা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য তাকে চোখে দেখার জন্য যে নির্দিষ্ট প্রতীক বা লৈখিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, তাকে বর্ণ (Letter) বলে।

সহজ কথায়, ধ্বনি হলো বর্ণের উচ্চারিত রূপ, আর বর্ণ হলো ধ্বনির লিখিত রূপ। আমরা যখন মুখে বলি ‘অ’, তখন তা একটি ধ্বনি; কিন্তু যখন খাতায় ‘অ’ চিহ্নটি লিখে প্রকাশ করি, তখন তা একটি বর্ণে পরিণত হয়।

 

গ. ধ্বনি ও অক্ষরের পার্থক্য (Sound vs Syllable)

অনেকেই ধ্বনি এবং অক্ষরকে এক করে ফেলেন, যা ব্যাকরণগতভাবে মস্ত বড় ভুল।

1.     ধ্বনি: একটি শব্দের সবচেয়ে ছোট অংশ যাকে আর ভাঙা যায় না। যেমন: ‘আম’ শব্দটিতে দুটি ধ্বনি আছে: $আ + ম্$

2.     অক্ষর (Syllable): কোনো শব্দের যতটুকু অংশ মানুষের মুখ দিয়ে একবারে বা একঝোঁকে একক প্রয়াসে উচ্চারিত হয়, তাকে অক্ষর বলে। যেমন: ‘বন্ধন’ শব্দটিকে আমরা একঝোঁকে ভাঙি ‘বন্-ধন্’ হিসেবে। এখানে দুটি অক্ষর আছে, কিন্তু ধ্বনি আছে ৫টি (ব্ + অ + ন্ + ধ্ + অ + ন্)।

 

২. বাক্-যন্ত্র ও ধ্বনি উৎপাদন বিজ্ঞান (Phonetics)

মানুষের শরীরে ধ্বনি তৈরি করার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ নেই। যেসব অঙ্গ মূলত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া এবং খাদ্য গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত হয়, মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেগুলোকে ধ্বনি তৈরির কাজে রূপান্তর করেছে। ধ্বনি উৎপাদনে অংশ নেওয়া এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে একত্রে বাক্-যন্ত্র (Vocal Apparatus / Organs of Speech) বলা হয়।

বাক্-যন্ত্রের প্রধান অংশসমূহের কার্যপ্রণালী:

১. ফুসফুস (Lungs): ফুসফুসকে ধ্বনি উৎপাদনের 'পাওয়ার হাউস' বা মূল চালিকাশক্তি বলা চলে। ফুসফুস নিজে কোনো ধ্বনি তৈরি করতে পারে না; এর মূল কাজ হলো শ্বাস ছাড়ার মাধ্যমে বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি করা। এই বহির্গামী বায়ুপ্রবাহই মুখের ভেতর বিভিন্ন অঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ধ্বনির রূপ নেয়।

২. শ্বাসনালি (Windpipe): ফুসফুস থেকে বাতাস যে নল বা নালি বেয়ে ওপরের দিকে উঠে আসে, তাকে শ্বাসনালি বলে। এটি বাতাসকে স্বরযন্ত্রের দিকে পৌঁছে দেওয়ার পথ হিসেবে কাজ করে।

৩. স্বরযন্ত্র (Larynx): শ্বাসনালিক উপরিভাগে এবং গলনালির নিচে অবস্থিত একটি বাক্সসদৃশ অংশই হলো স্বরযন্ত্র। এর ভেতরে দুটি পাতলা পেশিযুক্ত পর্দা থাকে, যাদের স্বরতন্ত্রী (Vocal Cords) বলে। এই স্বরতন্ত্রী দুটির মাঝখানের ফাঁকা পথ দিয়ে বাতাস যাওয়ার সময় পর্দাদুটি কাঁপলে ঘোষধ্বনি তৈরি হয়, আর না কাঁপলে অঘোষধ্বনি তৈরি হয়।

৪. গলনালি (Pharynx): স্বরযন্ত্রের ওপর থেকে মুখবিবরের পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত অংশটি হলো গলনালি। ফুসফুস থেকে আসা বাতাস এখানে এসে খানিকটা প্রতিধ্বনিত হওয়ার সুযোগ পায়।

৫. জিহ্বা (Tongue): মুখের ভেতরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নমনীয় এবং সচল অঙ্গ হলো জিব। জিবকে সামনে, পেছনে, ওপরে, নিচে নাড়িয়ে এবং জিবের ডগা দিয়ে বিভিন্ন অংশ ছুঁয়ে মানুষ অসংখ্য বৈচিত্র্যময় ধ্বনি তৈরি করে। জিবের বিভিন্ন অংশ যেমন— জিহ্বামূল, জিহ্বা-গ্রন্ঠ, জিহ্বা-ফলক এবং জিহ্বাগ্র ধ্বনি উৎপাদনে অংশ নেয়।

৬. তালু (Palate): মুখবিবরের ছাদকে তালু বলা হয়। এর দুটি অংশ: পেছনের নরম ও মাংসল অংশটিকে বলে কোমল তালু বা নরম তালু (Soft Palate) এবং সামনের শক্ত হাড়ের অংশটিকে বলে কঠিন তালু বা শক্ত তালু (Hard Palate)। জিব যখন নরম তালুকে ছোঁয় তখন কণ্ঠ্যধ্বনি এবং শক্ত তালুকে ছুঁলে তালব্যধ্বনি তৈরি হয়।

৭. মূর্ধা (Alveolars/Retroflex): ওপরের পাটির দাঁতের ঠিক পেছনে এবং শক্ত তালুর শুরুতে যে খসখসে বা উঁচু মাংসল অংশটি রয়েছে, তাকে মূর্ধা বা দন্তমূলের উপরিভাগ বলা হয়। এখানে জিবের ডগা দিয়ে আঘাত করলে মূর্ধন্য ধ্বনি উৎপন্ন হয়।

৮. দন্ত বা দাঁত (Teeth): বিশেষ করে ওপরের পাটির দাঁতগুলো ধ্বনি উৎপাদনে জিবকে স্থির বাধা দিতে সাহায্য করে। জিবের ডগা যখন দাঁতের গোড়ায় বা পিঠে স্পর্শ করে, তখন দন্ত্যধ্বনি তৈরি হয়।

৯. ওষ্ঠ বা ঠোঁট (Lips): মুখবিবরের সবচেয়ে বাইরের দরজা হলো ঠোঁট (ওপরের ঠোঁটকে ওষ্ঠ এবং নিচের ঠোঁটকে অধর বলা হয়)। ঠোঁট দুটি কখনো গোল হয়, কখনো চ্যাপ্টা হয়, কখনোবা একে অপরকে সম্পূর্ণ চেপে ধরে বাতাস আটকে দেয় (যেমন: 'প', 'ফ' উচ্চারণের সময়)।

১০. নাসিকা বা নাক (Nose): মুখবিবরের ভেতরের আলজিবটি বা কোমল তালু যখন নিচে নেমে আসে, তখন ফুসফুসের বাতাস মুখ দিয়ে বের হতে না পেরে নাক দিয়ে বের হয়। এর ফলে যে অনুনাসিক বা নাকের বাঁশির মতো আওয়াজ তৈরি হয়, তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলে।

 

৩. ধ্বনির প্রধান দুই ভাগ: বাংলা ভাষার সমস্ত ধ্বনিকে তাদের উচ্চারণ-প্রক্রিয়া এবং বায়ুপ্রবাহের বাধার ওপর ভিত্তি করে প্রধানত দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

১. স্বরধ্বনি (Vowel Sounds)

২. ব্যঞ্জনধ্বনি (Consonant Sounds)

 

৪. স্বরধ্বনি (Vowels):

স্বরধ্বনির সংজ্ঞা: যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে নির্গত বাতাস গলনালি বা মুখবিবরের কোথাও কোনো প্রকার পূর্ণ বা আংশিক বাধা পায় না, অবাধে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং যা অন্য কোনো ধ্বনির ন্যূনতম সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্পষ্টভাবে নিজে নিজে উচ্চারিত হতে পারে, তাকে স্বরধ্বনি বলে।

বাংলা বর্ণমালায় লিখিত স্বরবর্ণ ১১টি থাকলেও, আধুনিক ধ্বনিবিজ্ঞানীদের মতে বাংলা ভাষায় খাঁটি বা মৌলিক স্বরধ্বনি মাত্র ৭টি। এগুলো হলো: /অ/, /আ/, /ই/, /উ/, /এ/, /ও/, এবং /অ্যা/ (যেমন: 'অ্যাটম' বা 'ব্যাঙ' শব্দের উচ্চারণ)।

স্বরধ্বনিকে প্রধানত ৪টি মানদণ্ডের ভিত্তিতে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ভাগ করা হয়:

 

ক. উচ্চারণকাল বা স্থায়িত্ব অনুসারে (Based on Duration)

একটি স্বরধ্বনি উচ্চারণ করতে মানুষের কতটুকু সময় বা দম লাগছে, তার ওপর ভিত্তি করে একে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

১. হ্রস্বস্বর (Short Vowels): যেসব স্বরধ্বনি উচ্চারণ করতে অত্যন্ত কম সময় লাগে, উচ্চারণে কোনো টান থাকে না এবং ফুসফুসের বাতাস অল্পতেই শেষ হয়, তাদের হ্রস্বস্বর বলা হয়। বাংলায় মৌলিক হ্রস্বস্বর ৪টি।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: অতি (ওতি)। এখানে 'অ' অত্যন্ত কম সময় ধরে উচ্চারিত হয়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: ইলিশ। শুরুর 'ই' ধ্বনিটি দ্রুত উচ্চারিত ও সমাপ্ত হয়।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: উট। ঠোঁট দুটি দ্রুত সংকুচিত হয়ে ধ্বনিটি শেষ করে।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ঋষি। (যদিও আধুনিক বাংলায় ঋ-এর উচ্চারণ 'রি'-এর মতো, তবুও এটি হ্রস্বস্বরের ঐতিহ্যবাহী রূপ)

5.    ই (কার রূপ) — শব্দে প্রয়োগ: দিন। এখানে দ-এর সাথে যুক্ত ই-কারটি অত্যন্ত হ্রস্ব বা ছোট।

২. দীর্ঘস্বর (Long Vowels): যেসব স্বরধ্বনি উচ্চারণ করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে, কণ্ঠস্বরকে খানিকটা টেনে বা দীর্ঘায়িত করে উচ্চারণ করতে হয়, তাদের দীর্ঘস্বর বলা হয়। বাংলায় দীর্ঘস্বর ৭টি।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: আকাশ। 'আ' ধ্বনিটি উচ্চারণ করতে মুখ গহ্বর অনেকক্ষণ খোলা রাখতে হয়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: নদী (নীল)। শেষের ঈ-কারটি টানতে হয়।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: ঊর্মি (ঢেউ)। শুরুর ঊ ধ্বনিটি দীর্ঘস্থায়ী।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ঐক্য। দুটি স্বর মিলে তৈরি হওয়ায় এর উচ্চারণকাল দীর্ঘ।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: ঔষধ। এটিও একটি দ্বি-স্বর বা দীর্ঘস্থায়ী ধ্বনি।

খ. গঠনগত কাঠামো অনুসারে (Based on Structure)

স্বরধ্বনিটি একক নাকি একাধিক স্বরের মিশ্রণে তৈরি, তার ওপর ভিত্তি করে এই বিভাগ করা হয়।

১. মৌলিক স্বরধ্বনি (Monophthongs): যেসব স্বরধ্বনিকে কোনোভাবেই বিশ্লেষণ করা যায় না, ভাঙা যায় না এবং যার ভেতরে অন্য কোনো স্বরধ্বনির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, তাদের মৌলিক স্বরধ্বনি বলে।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: অমর। এই ধ্বনিটি সম্পূর্ণ অবিভাজ্য ও একক।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: আলো। এটি ভাষার একটি আদি ও বিশুদ্ধ মৌলিক স্বর।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: ইট। এর ভেতর অন্য কোনো স্বরের মিশ্রণ নেই।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: উনুন। এটি একটি একক পশ্চাৎ মৌলিক স্বর।

5.    অ্যা — শব্দে প্রয়োগ: ব‍্যাঙ ($ব্ + অ্যা + ঙ্$)। বর্ণমালায় এর নির্দিষ্ট একক রূপ না থাকলেও এটি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান মৌলিক ধ্বনি।

২. যৌগিক স্বরধ্বনি (Diphthongs/Sandhyaksar): যখন দুটি স্বরধ্বনি (একটি পূর্ণ মৌলিক স্বর এবং একটি অর্ধ-স্বর) কোনো বিরতি ছাড়া অত্যন্ত দ্রুত একসাথে যুক্ত হয়ে একটি একক ধ্বনি হিসেবে কান ও মুখে ধরা দেয়, তখন তাকে যৌগিক স্বরধ্বনি বা দ্বিস্বর বা সান্ধ্যক্ষর বলে। বাংলায় এমন যৌগিক স্বরধ্বনি আছে ২৫টি, তবে বর্ণমালায় স্থান পেয়েছে মাত্র ২টি।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    ঐ (ও + ই) — শব্দে প্রয়োগ: তৈল ($ত + ও + ই + ল$)। এখানে ও এবং ই দ্রুত মিলে 'ঐ' হয়েছে।

2.    ঔ (ও + উ) — শব্দে প্রয়োগ: নৌকা ($ন + ও + উ + কা$)। ও এবং উ-এর দ্রুত যৌগিক রূপ।

3.    আই (আ + ই) — শব্দে প্রয়োগ: খাই ($খ + আ + ই$)। এটি একটি বর্ণহীন যৌগিক স্বরধ্বনি।

4.    আউ (আ + উ) — শব্দে প্রয়োগ: লাউ ($ল + আ + উ$)। আ এবং উ-এর মিলন।

5.    এই (এ + ই) — শব্দে প্রয়োগ: সেই ($স + এ + ই$)। দ্রুত উচ্চারণে এটি একক দ্বিস্বর তৈরি করে।

 

গ. জিহ্বার অবস্থান অনুসারে (Based on Tongue Position)

উচ্চারণের সময় মুখের ভেতর জিবটি কোন দিকে সরছে— সামনে, পেছনে, ওপরে নাকি নিচে, তার ওপর ভিত্তি করে ৩টি উপবিভাগে ভাগ করা হয়:

১. জিহ্বার অনুভূমিক অবস্থান (সম্মুখ, মধ্য ও পশ্চাৎ)

·         সম্মুখ স্বরধ্বনি: জিব যখন সামনের দিকে এগিয়ে আসে। (যেমন: ই, এ, অ্যা)।

·         মধ্য স্বরধ্বনি: জিব যখন সামনে বা পেছনে না গিয়ে মাঝখানেই স্বাভাবিক থাকে। (যেমন: আ)।

·         পশ্চাৎ স্বরধ্বনি: জিব যখন পেছনের দিকে কণ্ঠের দিকে সংকুচিত হয়। (যেমন: উ, ও, অ)।

২. জিহ্বার উলম্ব অবস্থান বা উচ্চতা (উচ্চ, উচ্চ-মধ্য, নিম্ন-মধ্য, নিম্ন)

·         উচ্চ স্বরধ্বনি: জিব যখন মুখের ছাদের সবচেয়ে উঁচুতে ওঠে। (৫টি উদাহরণ: ই, উ এবং শব্দে প্রয়োগ: তিনি, তুমি, বই, লাউ, ঘি)।

·         উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি: জিব যখন উচ্চ অবস্থানের চেয়ে সামান্য নিচে থাকে। (৫টি উদাহরণ: এ, ও এবং শব্দে প্রয়োগ: দেশ, দোষ, কোণ, খেলো, গেলো)।

·         নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি: জিব যখন সাধারণ অবস্থার চেয়ে নিচে থাকে কিন্তু একদম নিচে নয়। (৫টি উদাহরণ: অ, অ্যা এবং শব্দে প্রয়োগ: অক্ষ, ব্যায়াম, দেখা (দ্যাটখা), বেলা, নষ্ট)।

·         নিম্ন স্বরধ্বনি: জিব যখন মুখের মেঝেতে একদম নিচে নেমে অবস্থান করে। (৫টি উদাহরণ: আ এবং শব্দে প্রয়োগ: আজ, মা, রাত, চাঁদ, ভাত)।

 

ঘ. মুখবিবরের উন্মুক্ততা বা হা-এর আকৃতি অনুসারে (Based on Mouth Opening)

স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় আমাদের মুখ কতটা হাঁ হচ্ছে বা বন্ধ থাকছে, তার ওপর ভিত্তি করে ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়।

[সংবৃত] (মুখ সবচেয়ে বন্ধ)       ──► ই, উ   (যেমন: দিন, চুল)
[অর্ধ-সংবৃত] (অর্ধেক বন্ধ)     ──► এ, ও   (যেমন: কেক, চোর)
[অর্ধ-বিবৃত] (অর্ধেক খোলা)     ──► অ্যা, অ (যেমন: ব‍্যাঙ, মন)
[বিবৃত] (মুখ সবচেয়ে খোলা)      ──► আ      (যেমন: আকাশ, আম)

১. সংবৃত স্বরধ্বনি (Close Vowels): যেসব স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখগহ্বর বা ঠোঁটের ফাঁক সবচেয়ে কম বা সংকুচিত (বন্ধের কাছাকাছি) থাকে।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: লিপি। মুখ সম্পূর্ণ খোলে না।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: কুকুর। ঠোঁট দুটি সুড়ঙ্গের মতো সরু হয়ে যায়।

3.    ঈ (উচ্চারণে ই) — শব্দে প্রয়োগ: গীত।

4.    ঊ (উচ্চারণে উ) — শব্দে প্রয়োগ: মূল।

5.    সংবৃত এ — শব্দে প্রয়োগ: কেহ (এখানে 'এ' এর উচ্চারণ সংকুচিত)।

২. বিবৃত স্বরধ্বনি (Open Vowels): যেসব স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখবিবর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বা সবচেয়ে বেশি ‘হা’ হয়।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: আম। ডাক্তাররা যখন রোগীর গলা দেখেন, তখন মুখ হা করার জন্য 'আ' বলতে বলেন।

2.    আ (কার রূপ) — শব্দে প্রয়োগ: রাজা। দুবার মুখ পূরণ বিবৃত হয়।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: আকাশ।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: বাতাস।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: সাফল্য।

৩. অর্ধ-সংবৃত ও অর্ধ-বিবৃত স্বরধ্বনি: অর্ধ-সংবৃত (Half-Close): মুখবিবর সংবৃতর চেয়ে একটু বেশি খোলে (যেমন: এ, ও — শব্দ: খেলা, পোকা)।

·         অর্ধ-বিবৃত (Half-Open): মুখবিবর বিবৃতর চেয়ে একটু কম খোলে (যেমন: অ, অ্যা — শব্দ: গল্প, খ্যাটাস)।

 

৫. ব্যঞ্জনধ্বনি (Consonants):

ব্যঞ্জনধ্বনির সংজ্ঞা: যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুসজাত বাতাস মুখবিবরের বা গলনালির কোথাও না কোথাও সম্পূর্ণ আটকে গিয়ে, ঘষা খেয়ে বা সংকীর্ণ পথে বাধা পেয়ে বের হয় এবং যা কোনো স্বরধ্বনির সাহায্য ছাড়া একা একা স্পষ্ট বা পূর্ণরূপে উচ্চারিত হতে পারে না, তাদের ব্যঞ্জনধ্বনি বলে।

যেমন: আমরা যখন মুখে বলি ‘ক্’, তখন ফুসফুসের বাতাস প্রথমে জিহ্বামূলে আটকে যায় এবং স্বরধ্বনি ‘অ’ যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত একে পূর্ণ শব্দে রূপ দেওয়া যায় না (ক্ + অ = ক)।

ব্যঞ্জনধ্বনিকে প্রধানত ৪টি বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর ভাগ করা হয়:

 

ক. উচ্চারণের স্থান অনুসারে (Based on Place of Articulation): ফুসফুস থেকে আসা বাতাস মুখগহ্বরের কোন নির্দিষ্ট দরজায় বা দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে, সেই মিলনস্থল বা উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনিকে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে বর্গের প্রথম ২৫টি ধ্বনিকে স্পর্শ ধ্বনি (Stop/Plosive Consonants) বলে।

১. কণ্ঠ্য বা জিহ্বামূলীয় ধ্বনি (Velar Consonants)

জিবের পেছনের অংশ আলজিবের ঠিক নিচে নরম তালুকে স্পর্শ করে এই ধ্বনিগুলো উৎপন্ন করে।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: কাক। কণ্ঠনালির ঠিক ওপরে বাতাস আটকে যায়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: খই। ক-এর চেয়ে বেশি বাতাস দিয়ে কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয়।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: গাছ। এটি একটি গম্ভীর কণ্ঠ্যধ্বনি।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ঘণ্টা।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: রাঙা। কণ্ঠ ও নাকের মিলিত রূপ।

২. তালব্য ধ্বনি (Palatal Consonants)

জিবের মাঝখানের অংশ বা অগ্রভাগ চ্যাপ্টা হয়ে মুখের ছাদের শক্ত হাড়ের তালুকে স্পর্শ করে বাতাস রোধ করে।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: চিল। জিব শক্ত তালুতে মসৃণভাবে ছোঁয়া দেয়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: ছাগল।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: জাহাজ।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ঝিনুক।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: শহর। (তালব্য 'শ' উচ্চারণের সময় শিস আওয়াজ তালু স্পর্শ করে)।

৩. মূর্ধন্য ধ্বনি (Retroflex Consonants)

জিবের ডগাটি সামান্য পেছনের দিকে উল্টে বা muড়ে গিয়ে ওপরের পাটির দাঁতের গোড়ার ঠিক ওপরের শক্ত অংশ বা মূর্ধায় আঘাত করে। এদের ‘ধাবমান ধ্বনি’ বা ‘মূর্ধন্য’ বলা হয়।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: টিয়া। জিবের ডগা উল্টে তালুর ছাদে টোকা দেয়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: ঠোঙা।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: ডাব।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ঢোল।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: বীণা। (আধুনিক বাংলায় এর উচ্চারণ দন্ত্য ন-এর মতো হলেও স্থান মূর্ধা)।

৪. দন্ত্য ধ্বনি (Dental Consonants)

জিবের ডগা বা অগ্রভাগ সরাসরি ওপরের পাটির দাঁতের পেছনের দেওয়ালে বা দাঁতের ধারালো প্রান্তে গিয়ে ধাক্কা মারে।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: তুমি। জিব দাঁত না ছুঁলে এটি উচ্চারণ করা অসম্ভব।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: থালা।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: দই।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ধোয়া।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: নৌকা।

৫. ওষ্ঠ্য ধ্বনি (Bilabial Consonants)

নিচের ঠোঁট গিয়ে ওপরের ঠোঁটকে সম্পূর্ণ স্পর্শ করে বা চেপে ধরে বাতাসকে হঠাৎ আটকে দেয়। ঠোঁট দুটি বিচ্ছিন্ন না করলে এই ধ্বনি বের হয় না।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: পাখি। ঠোঁট দুটি বন্ধ হয়ে খুলে যায়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: ফল।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: বাবা।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ভাল্লুক।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: মাছ।

 

খ. উচ্চারণের রীতি বা প্রকৃতি অনুসারে (Based on Manner of Articulation)

বাতাসকে কেবল আটকে দেওয়া হচ্ছে, নাকি ঘষে বের করা হচ্ছে, নাকি নাক দিয়ে বের করা হচ্ছে— অর্থাৎ উৎপাদনের স্টাইল বা রীতির ওপর ভিত্তি করে এই বিভাগ করা হয়।

১. নাসিক্য বা অনুনাসিক ধ্বনি (Nasal Consonants): যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখবিবরের পথটি কোমল তালু দিয়ে বন্ধ থাকে এবং ফুসফুস থেকে আসা বাতাস নাক দিয়ে বা নাসিকাপথ দিয়ে বের হয়ে যায়।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: বাঙ্কাল।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: মিঞা (মিঞা)।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: লবণ।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: নদী।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: মানুষ।

২. উষ্ম বা শিস ধ্বনি (Fricatives): ‘উষ্ম’ শব্দের অর্থ শ্বাস। যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাসকে সম্পূর্ণ আটকে না রেখে জিব ও তালুর মাঝখানের অতি সংকীর্ণ পথ দিয়ে ঘর্ষণ করে বের করা হয়, যতক্ষণ শ্বাস থাকে ততক্ষণ এই ধ্বনি টেনে লম্বা করা যায় এবং একটি শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ হয়।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: শাপলা। (তালব্য শিস ধ্বনি)।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: কষ্ট। (মূর্ধন্য স্থানে ঘর্ষণ)।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: সবুজ। (দন্ত্য শিস ধ্বনি)।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: হাত। (এটি কণ্ঠনালীয় উষ্মধ্বনি, ঘোষ রূপ)।

5.    হ (যুক্ত রূপ) — শব্দে প্রয়োগ: আহ্লাদ (এখানে হ-এর উষ্মতা স্পষ্ট)।

৩. অন্তস্থ ধ্বনি (Semi-vowels/Approximants): যেসব ধ্বনির উচ্চারণ স্পর্শধ্বনি (ক-ম) এবং উষ্মধ্বনির (শ-হ) মাঝামাঝি বা অন্তে অবস্থিত এবং যা স্বর ও ব্যঞ্জনের সন্ধিস্থলে থাকে।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    য (উচ্চারণে জ) — শব্দে প্রয়োগ: যমুনা।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: রাত।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: লাল।

4.    ব (অন্তস্থ) — শব্দে প্রয়োগ: ত্বক (এখানে ব-এর বিশেষ উচ্চারণ)।

5.    য় — শব্দে প্রয়োগ: মায়া।

৪. কম্পনজাত ধ্বনি (Trill/Vibrant): যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিবের ডগাটি ওপরের দন্তমূল বা মূর্ধায় গিয়ে বাতাসের প্রচণ্ড চাপে বারবার দ্রুত কাঁপতে থাকে। বাংলায় একমাত্র কম্পনজাত ধ্বনি হলো ‘র’।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ: র এবং এর শব্দ প্রয়োগ: রক্ত, রাজপ্রাসাদ, রংধনু, রোদন, রাতের। (উচ্চারণ করার সময় জিবের অগ্রভাগে কম্পন অনুভব করা যায়)

৫. তাড়নজাত ধ্বনি (Flapped/Retroflex Flap): যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিবের ডগাটি উল্টো হয়ে ওপরের মূর্ধায় খুব দ্রুত একটিমাত্র শক্ত টোকা বা থাপ্পড় (তাড়ন) মারে। জিবের পিঠ দিয়ে মূর্ধাকে তাড়িত করা হয় বলে এর নাম তাড়নজাত।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ: ড় এবং ঢ় যুক্ত শব্দ যেমন: পাহাড়, আষাঢ়, ঘোড়া, দৃঢ়, বুড়ো।

৬. পার্শ্বিক ধ্বনি (Lateral): যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিবের ডগাটি ওপরের দাঁতের মাড়ি বা শক্ত তালুকে মাঝখানে চেপে ধরে বাতাস আটকে দেয়, আর ফুসফুসের বাতাস জিবের দুই পাশের বা পগারের মুক্ত গলি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাংলায় 'ল' হলো পার্শ্বিক ধ্বনি।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ: ল এবং এর শব্দ প্রয়োগ: লাঙ্গল, লতা, লিলুয়া, আলু, বালক।

 

 

গ. স্বরতন্ত্রীর কম্পন বা ঘোষত্ব অনুসারে (Based on Voicing)

স্বরযন্ত্রের ভেতরে থাকা স্বরতন্ত্রী নামক পাতলা পর্দাদুটি বাতাসের ধাক্কায় কাঁপছে কি কাঁপছে না— তার ওপর ভিত্তি করে ব্যঞ্জনধ্বনিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

বর্গের ১ম ও ২য় ধ্বনি   ──►  [অঘোষ] (স্বরতন্ত্রী কাঁপে না) ──► ক, খ, চ, ছ...
বর্গের ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম  ──►  [ঘোষ]  (স্বরতন্ত্রী কাঁপে)   ──► গ, gh, ঙ, জ, ঝ...

১. অঘোষ ধ্বনি (Voiceless Consonants): যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী শিথিল থাকে, বাতাস কোনো বাধা বা কম্পন ছাড়াই সহজে বেরিয়ে যায়। ফলে আওয়াজে কোনো গাম্ভীর্য বা গুমগুম শব্দ তৈরি হয় না। বর্গের ১ম ও ২য় ধ্বনি এর উদাহরণ।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: কমল। হালকা ও মসৃণ উচ্চারণ।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: খাতা।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: চাকা।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ছবি।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: তবলা।

২. ঘোষ ধ্বনি (Voiced Consonants): যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী দুটি পরস্পরের কাছাকাছি এসে বাতাসের চাপে কাঁপতে থাকে। এর ফলে গলার ভেতর একটি গম্ভীর, অনুরণিত বা ‘ঘোষ’ (গুমগুম) আওয়াজ তৈরি হয়। বর্গের ৩য়, ৪র্থ ও ৫মা ধ্বনি এর উদাহরণ।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: গলা। গলার গভীরে কম্পন অনুভূত হয়।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: ঘাস।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: জীবন।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: ঝরনা।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: দালান।

 

ঘ. বায়ুর প্রবাহ বা প্রাণতা অনুসারে (Based on Aspiration)

ধ্বনিটি উচ্চারণের সময় মুখ দিয়ে কতটা বাতাস বা ফুসফুসের দম বের হচ্ছে— বাতাসের পরিমাণ কম নাকি অনেক বেশি বাতাস বের হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে একে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

১. অল্পপ্রাণ ধ্বনি (Unaspirated Consonants): ‘প্রাণ’ মানে বাতাস। যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাসের চাপের তীব্রতা থাকে না, মুখ দিয়ে সামান্য বাতাস বের হয় এবং উচ্চারণে জোর কম লাগে। বর্গের ১ম ও ৩য় ধ্বনি এর অন্তর্ভুক্ত।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    — শব্দে প্রয়োগ: কলম। উচ্চারণটি সরল ও সংক্ষিপ্ত।

2.    — শব্দে প্রয়োগ: গাধা। বাতাসের ধাক্কা নেই।

3.    — শব্দে প্রয়োগ: চামচ।

4.    — শব্দে প্রয়োগ: জাদুকর।

5.    — শব্দে প্রয়োগ: টুপি।

২. মহাপ্রাণ ধ্বনি (Aspirated Consonants): যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে প্রচণ্ড বেগে বাতাস বের হয়, মুখের সামনে হাত রাখলে গরম বাতাসের ধাক্কা অনুভব করা যায় এবং যার শেষের দিকে একটি স্পষ্ট ‘হ’ ধ্বনির মতো স্রোত মিশে থাকে। বর্গের ২য় ও ৪র্থ ধ্বনি এর অন্তর্ভুক্ত।

·         ৫টি বিস্তৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ:

1.    খ (ক + হ) — শব্দে প্রয়োগ: খড়গ। প্রচুর বাতাস নির্গত হয়।

2.    ঘ (গ + হ) — শব্দে প্রয়োগ: ঘোড়া।

3.    ছ (চ + হ) — শব্দে প্রয়োগ: ছাতা।

4.    ঝ (জ + হ) — শব্দে প্রয়োগ: ঝাঁকুনি।

5.    থ (ত + হ) — শব্দে প্রয়োগ: থালা।

৬. পরাশ্রয়ী বা অযোগবাহ ধ্বনি (Dependent Sounds): বাংলা বর্ণমালায় এমন তিনটি বিশেষ ধ্বনি বা বর্ণ রয়েছে, যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে গেলে একা একা কোনো শব্দ তৈরি করতে পারে না। তারা সর্বদা কোনো স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনি পেছনের চড়ে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। এই ধ্বনিগুলোকে পরাশ্রয়ী ধ্বনি বা অযোগবাহ ধ্বনি বলে।

·         ১. অনুস্বার (ং): এটি একটি নাসিক্য পরাশ্রয়ী ধ্বনি।

o    ৫টি উদাহরণ: অংশ, বংশ, সিংহ, বাংলা, সং।

·         ২. বিসর্গ (ঃ): এটি মূলত অঘোষ কণ্ঠ্য উষ্মধ্বনি ‘হ’-এর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ।

o    ৫টি উদাহরণ: দুঃখ, নিঃশব্দ, অন্তঃকরণ, স্বতঃস্ফূর্ত, পুনঃপুনঃ।

·         ৩. চন্দ্রবিন্দু (ঁ): এটি কোনো স্বাধীন ধ্বনি নয়, এটি একটি অনুনাসিক চিহ্ন যা যে কোনো স্বরধ্বনির মাথায় বসে তাকে নাকের সাহায্যে উচ্চারণ করায়।

o    ৫টি উদাহরণ: চাঁদ, বাঁশ, হাঁস, কাঁটা, গাঁ।

 

 

৭. আধুনিক বাংলা ধ্বনিবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম রূপভেদ

আধুনিক ধ্বনিবিজ্ঞান ও উপভাষা তত্ত্বের (Dialectology) বিকাশের সাথে সাথে ধ্বনিকে আরও কিছু বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্ম এককে ভাগ করা হয়েছে:

ক. ধ্বনিমূল বা স্বনিম (Phoneme): কোনো ভাষার শব্দের মধ্যে অবস্থিত এমন কিছু ক্ষুদ্রতম ও অবিভাজ্য ধ্বনিগত একক, যার সামান্য পরিবর্তনের কারণে সম্পূর্ণ শব্দের অর্থ বদলে যায় বা নতুন শব্দের জন্ম হয়, তাকে ধ্বনিমূল বলে।

·         ৫টি জোড় উদাহরণ (Minimal Pairs):

1.    কাল এবং খাল — এখানে /ক/ এবং /খ/ হলো দুটি আলাদা ধ্বনিমূল, কারণ এদের জন্য অর্থ বদলে গেছে।

2.    তাল এবং ডাল — /ত/ এবং /ড/ আলাদা ধ্বনিমূল।

3.    বই এবং কই — /ব/ এবং /ক/ এর পার্থক্য।

4.    ভাত এবং রাত — /ভ/ এবং /র/ এর পার্থক্য।

5.    মা এবং না — /ম/ এবং /ন/ এর পার্থক্য।

খ. সহধ্বনি (Allophone): যখন একই ধ্বনিমূল শব্দের বিভিন্ন অবস্থানে বসার কারণে মানুষের মুখের উচ্চারণের অভ্যাসবশে সামান্য ভিন্ন শোনায়, কিন্তু তার জন্য শব্দের মূল অর্থের কোনো বদল ঘটে না, তখন সেই রূপগুলোকে একে অপরের সহধ্বনি বলে।

·         ৫টি বাস্তব উদাহরণ:

1.    টাকা শব্দের শুরুর (এটি একটু বেশি স্পষ্ট ও মূর্ধন্য)।

2.    উলটপালট শব্দের মাঝের বা শেষের (এটি তুলনামূলকভাবে হালকা ও তাড়িত)।

3.    করিম শব্দের শুরুর

4.    আটক শব্দের শেষের (যা অনেক সময় আমরা পুরো উচ্চারণ না করে আটকে রাখি)।

5.    খাতা শব্দের এবং আঞ্চলিক উচ্চারণে সিলেটি বা চাটগাঁইয়া ভাষায় -এর যে 'ফ্রিকটিভ' বা ঘষা রূপ শোনা যায়— এগুলো সব সহধ্বনি।

 

৮. ধ্বনি পরিবর্তনের ধারা (Phonological Processes)

মানুষ যখন বংশপরম্পরায় বা অঞ্চলভেদে কথা বলে, তখন ভৌগোলিক জলবায়ু, অলসতা (প্রয়াসলাঘব), দ্রুত কথা বলার প্রবণতা এবং শ্রুতিসুখ বা কানের আরামের কারণে মূল ধ্বনিগুলো বদলে যায়। বাংলা ব্যাকরণে একে ধ্বনি পরিবর্তন বলা হয়।

 

ক. স্বরাগম (Anaptyxis / Epenthesis)

উচ্চারণের সুবিধার জন্য বা যুক্তব্যঞ্জনের জটিলতা এড়াতে শব্দের বিভিন্ন স্থানে যখন বাইরে থেকে কোনো নতুন স্বরধ্বনি এসে জুড়ে বসে, তখন তাকে স্বরাগম বলে। এটি ৩ প্রকার:

১. আদি স্বরাগম (Prothesis)

শব্দের একদম শুরুতে বা আদিতে নতুন স্বরধ্বনি এলে।

·         ৫টি উদাহরণ: স্কুল > স্কুল, স্টেশন > স্টেশন, স্পর্ধা > স্পর্ধা, স্ত্রী > স্ত্রী, স্মারক > স্মারক।

২. মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ (Svarabhakti)

শব্দের মাঝখানে থাকা যুক্তব্যঞ্জনকে ভেঙে মাঝখানে একটি স্বরধ্বনি নিয়ে আসা।

·         ৫টি উদাহরণ: রত্ন > রত (মাঝখানে 'অ' স্বর), ধর্ম > ধর, প্রীতি > পিরীতি, মুক্তা > মুকুতা, ফিল্ম > ফিলিম।

৩. অন্ত স্বরাগম (Epithesis)

শব্দের শেষে কোনো স্বরধ্বনি ছিল না, কিন্তু উচ্চারণের ঝোঁকে শেষে একটি স্বরধ্বনি যুক্ত হলে।

·         ৫টি উদাহরণ: দিশ্ > দিশা (শেষে 'আ'), বেঞ্চ > বেঞ্চি (শেষে 'ই'), পোখ্ত > পোখতো (শেষে 'ও'), সত্য > সত্যি, দুষ্ট > দুষ্টু।

 

খ. স্বরলোপ (Apocope / Syncope)

দ্রুত কথা বলার সময় শব্দের ভেতরের কোনো স্বরধ্বনি যদি হুট করে লোপ পায় বা হারিয়ে যায়, তবে তাকে স্বরলোপ বলে। এটিও ৩ প্রকার:

১. আদি স্বরলোপ

শব্দের শুরুর স্বরধ্বনি হারিয়ে যাওয়া।

·         ৫টি উদাহরণ: অলাবু > লাবু > লাউ, উদ্ধার > উধার > ধার, উপাধ্যায় > ওঝা, অভ্যন্তর > ভেতর, অপি > পি > হি।

২. মধ্য স্বরলোপ (Syncope)

শব্দের মাঝখান থেকে দ্রুত উচ্চারণের কারণে স্বরধ্বনি উবে যাওয়া।

·         ৫টি উদাহরণ: অগুরু > অগ্রু, সুবর্ণ > स्वर्ण, জানালা > জানলা, গামছা (গামিছা) > গামছা, বসতি > বস্তি।

৩. অন্ত স্বরলোপ (Apocope)

শব্দের শেষ প্রান্তে থাকা স্বরধ্বনিটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া।

·         ৫টি উদাহরণ: আশা > আশ, আজি > আজ, চারু > চার, রাতি > রাত, ভালো > ভাল।

 

 

গ. সমীভবন বা সমীকরণ (Assimilation)

শব্দের মধ্যে যখন দুটি ভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি থাকে, তখন দ্রুত উচ্চারণের সময় তারা একে অপরের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে একই ধ্বনিতে বা সমতা লাভ করে।

·         ৫টি উদাহরণ: জন্ম > জম্ম, কাঁদনা > কান্না, গল্প > গপ্পো, পদ্ম > পদ্দ, শখ > সগ্গ (শখ > সখ > সগ্গ)।

 

ঘ. ধ্বনি বিপর্যয় (Metathesis)

শব্দের মধ্যে পাশাপাশি থাকা দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি যখন অলসতা বা ভুল উচ্চারণের কারণে পরস্পরের জায়গা অদলবদল বা ওলটপালট করে নেয়, তখন তাকে ধ্বনি বিপর্যয় বলে।

·         ৫টি উদাহরণ: রিকশা > রিসকা, পিশাচ > পিচাশ, বাক্স > বাস্ক, লাফ > ফাল, মুকুট > মুটুক।

 

ঙ. অপিনিহিতি (Epenthesis)

শব্দের কোনো স্থানে 'ই-কার' বা 'উ-কার' পরে উচ্চারিত হওয়ার কথা থাকলেও, যদি তা জিভের টানে তার নির্দিষ্ট স্থানের আগেই উচ্চারিত হয়ে বসে, তাকে অপিনিহিতি বলে।

·         ৫টি উদাহরণ: আজি > আইজ, সাধু > সাউধ, রাখিয়া > রাইখ্যা, চারিপাশ > চাইরপাশ, বাক্য > বাইক‍্য।

 

৯. ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ

১. মুখসুখ বা প্রয়াস-লাঘব (Effort-saving)

মানুষ সহজাতভাবেই কথা বলার সময় কম পরিশ্রম করতে চায়। উচ্চারণের কষ্ট কমানোর এই মানসিকতার কারণে কঠিন বা জটিল ধ্বনিগুলো সহজে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

·         যেমন: 'পদ্ম' (পদ-ম) উচ্চারণ কঠিন বলে আমরা সহজে 'পদ্দ' বলি।

২. দ্রুত উচ্চারণের প্রবণতা (Rapidity of Speech)

খুব তাড়াহুড়ো করে কথা বলার সময় শব্দের ভেতরের সবকটি ধ্বনি স্পষ্ট উচ্চারণ করার সময় পাওয়া যায় না। ফলে একটি ধ্বনি লোপ পায় বা অন্য ধ্বনির সাথে মিশে যায়।

·         যেমন: 'বড়দাদা' থেকে দ্রুত উচ্চারণে হয়ে যায় 'বড়দা'।

৩. বাগন্ত্রের অসতর্কতা বা অসাবধানতা

অনেক সময় গভীরভাবে খেয়াল না করে অসতর্কভাবে কথা বলার কারণে মুখের ভেতরের অঙ্গ বা বাগ্যন্ত্র ভুল উচ্চারণ করে ফেলে, যা পরে স্থায়ী রূপ নেয়।

·         যেমন: 'রাত্রির' বদলে হঠাৎ অসাবধানতায় 'রাত্তির' বা 'লক্ষণ' থেকে 'লক্ষ্মণ' হয়ে যাওয়া।

৪. ভৌগোলিক প্রভাব ও জলবায়ু

ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া এবং জলবায়ু মানুষের বাগ্যন্ত্রের গঠন ও পেশির ওপর প্রভাব ফেলে। শীতপ্রধান ও গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের মানুষের শ্বাস নেওয়ার গতি ও কথা বলার ধরন আলাদা হয়, যা ধ্বনি বদলে ভূমিকা রাখে।

·         যেমন: এই ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই একই বাংলা ভাষা অঞ্চলভেদে (যেমন: নোয়াখালী, সিলেট বা পুরুলিয়া) ভিন্ন ভিন্ন ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়।

৫. শ্রবণ-বিভ্রাট (Defective Hearing)

কোনো শব্দ প্রথমবার শোনার সময় যদি কেউ ভুল বা অস্পষ্ট শোনে, তবে সে পরবর্তীকালে নিজেই শব্দটি ভুল উচ্চারণ করতে শুরু করে। বিশেষ করে শিশুরা বা অপরিচিত শব্দ শোনার সময় এই বিভ্রাট বেশি ঘটে।

·         যেমন: ইংরেজি Armchair শব্দটিকে অনেকে ভুল শুনে 'আরামচেয়ার' হিসেবে উচ্চারণ করা শুরু করে।

৬. অজ্ঞতা বা লোক-নিরুক্তি (Folk Etymology)

অপরিচিত বা বিদেশি শব্দের সঠিক অর্থ ও উচ্চারণ সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে না, তখন তারা নিজেদের চেনা কোনো শব্দের ছাঁচে ফেলে সেটিকে সহজ করে নেয়।

·         যেমন: ইংরেজি Hospital হয়ে গেছে 'হাসপাতাল' (যেখানে হাসিমুখে পাতা যায়/থাকা যায়)।

৭. বাগ্যন্ত্রের ত্রুটি বা শারীরিক অক্ষমতা

সবার জিহ্বা, তালু, দাঁত বা চোয়ালের গঠন নিখুঁত হয় না। কারও বাগ্যন্ত্রে কোনো জন্মগত বা সাময়িক ত্রুটি থাকলে কিছু নির্দিষ্ট ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে যায়।

·         যেমন: অনেকে জিহ্বা জড়তার কারণে 'র' ধ্বনি উচ্চারণ করতে না পেরে 'ল' উচ্চারণ করে ('রাস্তা' হয়ে যায় 'লাস্তা')।

৮. অনুকরণ-লিপ্সা বা অন্ধ অনুকরণ

মানুষ বিশেষ করে শিশুরা বড়দের বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কথা বলার স্টাইল অন্ধভাবে অনুকরণ করতে গিয়ে অনেক সময় মূল ধ্বনি পরিবর্তন করে ফেলে।

·         যেমন: পরিবারের কেউ 'মিথ্যা'-কে 'মিছা' বললে ছোটরাও তা-ই শেখে।

৯. আবেগ ও আদিখ্যেতা (Emotion)

অতিরিক্ত আনন্দ, অতি-আদর, ভয় বা ক্রোধের মাথায় কথা বলার সময় মানুষের স্বাভাবিক উচ্চারণ বদলে যায়।

·         যেমন: আদরের চোটে 'ছেলে' হয়ে যায় 'ছাওয়াল' বা 'সোনার ছেলে' হয়ে যায় 'সোনাই'।

১০. ভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণ (Language Contact)

যখন দুটি ভিন্ন ভাষার মানুষ ব্যবসা, রাজনীতি বা সংস্কৃতির কারণে দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করে, তখন এক ভাষার ধ্বনি অন্য ভাষার ধ্বনিকে প্রভাবিত করে বদলে দেয়।

·         যেমন: ফারসি 'নালিশ' বা ইংরেজি 'বক্স' (Box) শব্দগুলো বাঙালিরা নিজেদের মতো করে 'নালিশ' বা 'বাক্স' হিসেবে গ্রহণ করেছে।

 

 

১০. ধ্বনি ও বর্ণের মূল পার্থক্যের তুলনামূলক কাঠামো

ধ্বনি এবং বর্ণের মৌলিক অমিলগুলো নিচে সুনির্দিষ্ট টেবিল আকারে সাজানো হলো:

বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র

ধ্বনি (Sound)

বর্ণ (Letter)

১. ইন্দ্রিয়গত রূপ

এটি সম্পূর্ণভাবে কানের বিষয় (শ্রবণযোগ্য)। দেখা যায় না।

এটি সম্পূর্ণভাবে চোখের বিষয় (দৃশ্যমান)। দেখা ও ছোঁয়া যায়।

২. স্থায়িত্ব

ক্ষণস্থায়ী। মুখ থেকে উচ্চারণের পরেই বাতাসে মিলিয়ে যায়।

চিরস্থায়ী। কাগজে বা পাথরে লিখে রাখলে হাজার বছর টিকে থাকে।

৩. প্রকাশ মাধ্যম

মানুষের কণ্ঠস্বর এবং ফুসফুস-নিঃসৃত বায়ুপ্রবাহ।

কালি, কলম, লিপি, কীবোর্ড এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা।

৪. উৎপত্তির ক্রম

মানব ইতিহাসে ধ্বনি আগে এসেছে (উৎস)।

ধ্বনি প্রকাশের জন্য বর্ণ পরে আবিষ্কৃত হয়েছে (প্রতিচ্ছবি)।

৫. সংখ্যাগত মিল

বাংলা ভাষায় মৌলিক ধ্বনির সংখ্যা তুলনামূলক কম (যেমন: স্বরধ্বনি ৭টি)।

বাংলা বর্ণমালায় মোট বর্ণের সংখ্যা বেশি (যেমন: স্বরবর্ণ ১১টি)।

 

0 comments:

Post a Comment