১. কর্মধারয় সমাস কাকে বলে?
যেখানে বিশেষণ বা বিশেষ্য ভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষণ ভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং সমস্তপদে পরপদের (পরের শব্দটির) অর্থই প্রধান হিসেবে প্রতীয়মান হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।
সহজ কথায়:
বিশেষণ + বিশেষ্য =
কর্মধারয় সমাস (যেখানে মূল গুরুত্ব পাবে
পরের শব্দটি)।
- উদাহরণ: ‘নীল যে
পদ্ম = নীলপদ্ম’। এখানে ‘নীল’ হলো বিশেষণ এবং ‘পদ্ম’ হলো বিশেষ্য। সমস্তপদ
‘নীলপদ্ম’ দিয়ে কোনো নীল রঙকে বোঝানো হচ্ছে না, বরং একটি ‘পদ্ম’ ফুলকেই
বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ, পরপদ ‘পদ্ম’-এর অর্থই এখানে প্রধান।
২. কর্মধারয় সমাস চেনার উপায়
পরীক্ষায় বা সাধারণ পাঠে
কোনো শব্দ দেখে সেটি কর্মধারয় সমাস কি না, তা চেনার জন্য নিচের ৪টি কৌশল মনে
রাখবেন:
1.
পরপদের প্রাধান্য: সমস্তপদটি ভাঙার পর বা দেখার পর নিজেকে প্রশ্ন করুন—এখানে মূলত কার
কথা বলা হচ্ছে? উত্তর যদি পরের শব্দটি হয়, তবে এটি কর্মধারয়। (যেমন: 'কাঁচকলা'
-> কাঁচা যে কলা। এখানে কলাটাই মুখ্য, কাঁচাটা তার অবস্থা)।
2.
ব্যাসবাক্যে ‘যে’,
‘যিনি-তিনি’, ‘যা-তা’ এর ব্যবহার: সাধারণ কর্মধারয় সমাসের ব্যাসবাক্য করতে গেলে মাঝখানে ‘যে’, ‘যিনি’,
‘তিনি’, ‘যা’, ‘তা’ ইত্যাদি সাপেক্ষ সর্বনাম আসে।
3.
তুলনা বোঝালে: যদি দুটি জিনিসের মধ্যে তুলনা করা হয় (যেমন: সিংহের মতো পুরুষ =
সিংহপুরুষ, তুষারের মতো শুভ্র = তুষারশুভ্র), তবে চোখ বন্ধ করে সেটি কর্মধারয়
সমাস।
4.
রূপক বা অভেদ কল্পনা: যখন উপমান (যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে) এবং উপমেয় (যাকে তুলনা করা
হচ্ছে) এর মধ্যে কোনো তফাত রাখা হয় না, দুটোকে এক করে দেওয়া হয় (যেমন: মন রূপ মাঝি
= মনমাঝি), তখন তা কর্মধারয় হয়।
৩. কর্মধারয় সমাসের বিস্তারিত শ্রেণিবিভাগ
কর্মধারয় সমাসকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- ক) সাধারণ কর্মধারয় সমাস
- খ) মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
- গ) উপমান কর্মধারয় সমাস
- ঘ) উপমিত কর্মধারয় সমাস
- ঙ) রূপক কর্মধারয় সমাস
নিচে প্রতিটি ভাগের
খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা হলো:
ক)
সাধারণ কর্মধারয় সমাস: বিশেষণ ও
বিশেষ্য পদের সাধারণ মিলনে এই সমাস হয়। এর ব্যাসবাক্যে সাধারণত ‘যে’,
‘যিনি...তিনি’, ‘যা...তা’ ব্যবহৃত হয়। এর গঠনের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে:
১. দুটি বিশেষণ পদে একটি
বিশেষ্যকে বোঝালে: যখন দুটি আলাদা গুণ বা অবস্থা দিয়ে একজন ব্যক্তি বা একটি
বস্তুকে বোঝানো হয়।
- চালাক চতুর: যে
চালাক, সেই চতুর। (ব্যক্তি একজনই)
- পাকা-মিঠে: যা
পাকা, তাই মিঠে।
- কাঁচা-মিঠা: যা
কাঁচা, তাই মিঠা।
- হালকা-নরম: যা
হালকা, তাই নরম।
২. দুটি বিশেষ্য পদে একই
ব্যক্তিকে বোঝালে: যখন দুটি আলাদা পদবী বা পরিচয় দিয়ে একজন মানুষকে বোঝানো হয়।
- জজ-সাহেব: যিনি জজ,
তিনিই সাহেব।
- ডাক্তার-বাবু: যিনি
ডাক্তার, তিনিই বাবু।
- রাজর্ষি: যিনি
রাজা, তিনিই ঋষি।
- পণ্ডিত-মূর্খ: যিনি
পণ্ডিত, তিনিই মূর্খ (ব্যঙ্গার্থে)।
৩. বিশেষণ আগে এবং
বিশেষ্য পরে থাকলে (সবচেয়ে সাধারণ রূপ):
- নীলাকাশ: নীল যে
আকাশ।
- মহাপুরুষ: মহান যে
পুরুষ (মনে রাখবেন, মহান বা মহৎ শব্দ থাকলে সমস্তপদে তা ‘মহা’ হয়ে যায়)।
- মহাকীর্তি: মহতী যে
কীর্তি (‘মহতী’ স্ত্রীলিঙ্গ হলেও সমস্তপদে ‘মহা’ হয়)।
- কুপ্রথা: কু (মন্দ)
যে প্রথা।
- সুখবর: সু (ভালো)
যে খবর।
৪. কার্যপরম্পরা বোঝাতে
দুটি কৃদন্ত বিশেষণ পদে সমাস হলে:
আগে একটা কাজ, পরে
আরেকটা কাজ—এমন বোঝালে।
- ধোয়া-মোছা: আগে
ধোয়া, পরে মোছা।
- শায়িত-উত্থিত: আগে
শায়িত, পরে উত্থিত।
- দেখা-শোনা: আগে
দেখা, পরে শোনা।
খ)
মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস: যে কর্মধারয়
সমাসে ব্যাসবাক্যের মাঝখানের পদ বা পদগুচ্ছ সমস্তপদে লোপ (মুছে) পায়, তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে।
এখানে ব্যাসবাক্যের মাঝখানে সাধারণত ‘আশ্রিত’, ‘চিহ্নিত’, ‘মিশ্রিত’, ‘যুক্ত’,
‘নিমিত্ত’ ইত্যাদি শব্দ থাকে।
উদাহরণ ও বিশ্লেষণ:
- সিংহাসন: সিংহ চিহ্নিত আসন। (এখানে
‘চিহ্নিত’ পদটি মাঝখান থেকে লোপ পেয়েছে)।
- পলান্ন: পল
(মাংস) মিশ্রিত অন্ন।
- স্মৃতিসৌধ: স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ।
- ঘিভাত: ঘি মিশ্রিত ভাত।
- জয়পতাকা: জয় সূচক পতাকা।
- বাষ্পশকট: বাষ্প দ্বারা চালিত শকট।
- আদালত-পাড়া: আদালত সংলগ্ন পাড়া।
- বিছানা-চাদর: বিছানায় পাতার চাদর।
গ)
উপমান কর্মধারয় সমাস: এই অংশটি এবং এর পরের
দুটি অংশ (উপমিত ও রূপক) বোঝার জন্য আগে ৩টি শব্দ ভালোভাবে বুঝতে হবে:
১. উপমেয়: যাকে
তুলনা করা হচ্ছে (যেমন: মুখ)।
২. উপমান: যার
সাথে তুলনা করা হচ্ছে (যেমন: চাঁদ)।
৩. সাধারণ ধর্ম: যে
গুণের কারণে তুলনা করা হচ্ছে (যেমন: সুন্দর)।
উপমান কর্মধারয় চেনার
নিয়ম:
উপমান (বিশেষ্য) + সাধারণ ধর্ম (বিশেষণ) = উপমান কর্মধারয়।
সহজ কথায়, এখানে তুলনাটি বাস্তব বা সত্য হবে এবং সমস্তপদে
একটি গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ থাকবে। ব্যাসবাক্যে ‘ন্যায়’ বা ‘মতো’ শব্দটি মাঝখানে বসে।
উদাহরণ ও বিশ্লেষণ:
- তুষারশুভ্র: তুষারের
ন্যায় শুভ্র। (তুষার হলো উপমান/বিশেষ্য, আর শুভ্র হলো সাধারণ ধর্ম/বিশেষণ।
বরফ বা তুষার সত্যিই সাদা বা শুভ্র হয়, তাই এটি বাস্তব তুলনা)।
- অরুণরাঙা: অরুণের
(সূর্যের) ন্যায় রাঙা।
- ভ্রমরকৃষ্ণ: ভ্রমরের
ন্যায় কৃষ্ণ (কালো)।
- মিশকাল: মিশের (মসি
বা কালির) ন্যায় কালো।
- বজ্রকঠোর: বজ্রের
ন্যায় কঠোর।
- রক্তলাল: রক্তের
ন্যায় লাল।
- শশব্যস্ত: শশকের
(খরগোশের) ন্যায় ব্যস্ত (তটস্থ)।
ঘ)
উপমিত কর্মধারয় সমাস
উপমিত কর্মধারয় চেনার
নিয়ম:
উপমেয় (বিশেষ্য) + উপমান (বিশেষ্য) = উপমিত কর্মধারয়।
সহজ কথায়, এখানে দুটিই
নামপদ (বিশেষ্য) হবে, কোনো গুণের (বিশেষণ) উল্লেখ সমস্তপদে থাকবে না। এবং এই
তুলনাটি হবে কাল্পনিক বা অসম্ভব।
ব্যাসবাক্যে ‘ন্যায়’ বা ‘মতো’ শব্দটি সাধারণত শেষে বসে।
উদাহরণ ও বিশ্লেষণ:
- মুখচন্দ্র: মুখ
চন্দ্রের ন্যায়। (মুখ হলো উপমেয়, চন্দ্র হলো উপমান। মানুষ কি কখনো আক্ষরিক
অর্থে চাঁদ হতে পারে? না, এটি কাল্পনিক তুলনা। আর ‘মুখ’ ও ‘চন্দ্র’ দুটিই
বিশেষ্য পদ)।
- সিংহপুরুষ: পুরুষ
সিংহের ন্যায়। (মানুষ কখনো সিংহ হতে পারে না, তার বীরত্বকে তুলনা করা হচ্ছে)।
- বাহুলতা: বাহু লতার
ন্যায়।
- অধরামৃত: অধর (ঠোঁট)
অমৃতের ন্যায়।
- পাদপদ্ম: পাদ (পা)
পদ্মের ন্যায়।
- করকমল: কর (হাত)
কমলের (পদ্মের) ন্যায়।
- নয়নকমল: নয়ন
কমলের ন্যায়।
ঙ)
রূপক কর্মধারয় সমাস: যখন উপমেয় (যাকে তুলনা
করা হচ্ছে) এবং উপমান (যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে)-এর মধ্যে কোনো ভেদ বা পার্থক্য
না রেখে অভিন্ন বা এক কল্পনা
করা হয়, তখন তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে।
রূপক কর্মধারয় চেনার
নিয়ম:
ব্যাসবাক্যের
মাঝখানে ‘রূপ’ শব্দটি
বসে।
1.
সমস্তপদের প্রথম শব্দটি
সাধারণত একটি অস্পৃশ্য, কাল্পনিক বা
মানসিক ভাব (যাকে ছোঁয়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়) এবং দ্বিতীয়
শব্দটি একটি দৃশ্যমান বা বাস্তব
বস্তু হয়।
উদাহরণ ও বিশ্লেষণ:
- মনমাঝি: মন রূপ মাঝি। (মনকে ছোঁয়া যায়
না, এটি একটি ভাব। আর মাঝি বাস্তব। এখানে মন আর মাঝিকে এক করে দেওয়া হয়েছে)।
- ক্রোধানল: ক্রোধ রূপ অনল (আগুন)। (ক্রোধ দেখা
বা ছোঁয়া যায় না, অনল দেখা যায়)।
- জীবনতরি: জীবন রূপ তরি (নৌকা)।
- ভবনদী: ভব (সংসার) রূপ নদী।
- শোকাগ্নি: শোক রূপ অগ্নি।
- জ্ঞানপ্রদীপ: জ্ঞান রূপ প্রদীপ।
- দিলদরিয়া: দিল রূপ দরিয়া।
- ক্ষুধানল: ক্ষুধা রূপ অনল।
- বিষাদসিন্ধু: বিষাদ রূপ সিন্ধু (সমুদ্র)।
৪.
কর্মধারয় সমাসের কিছু ব্যতিক্রম ও বিশেষ নিয়ম
ব্যাকরণে কিছু শব্দ থাকে
যা সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে সাধিত হয়। কর্মধারয় সমাসের ক্ষেত্রেও এমন কিছু
ব্যতিক্রমী রূপ দেখা যায়:
১. ‘কু’ সুকৃতি
অর্থে ‘কদ’ বা ‘কা’ হওয়া:
- কু যে অর্থ = কদর্থ।
- কু যে আচার = কদাচার।
- কাঁচা যে কলা = কাঁচকলা (এখানে
কু অর্থে নয়, বিশেষ নিয়মে)।
২. সর্বনাম পদের
রূপান্তর:
ব্যাসবাক্যে ‘পরা’ বা
‘পর’ থাকলে সমস্তপদে তা ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তিত হয়। যেমন:
- পর যে লোক = পরলোক।
- পর যে রাষ্ট্র = পররাষ্ট্র।
৩. সংখ্যাবাচক
কর্মধারয় (দ্বিগু সমাসের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না):
কিছু সমাসে সংখ্যা আগে
থাকলেও তা সমাহার না বুঝিয়ে পরপদের অর্থ প্রধান করে। যেমন:
- একচালা: এক যে চালা
(এটি একপ্রকার ঘরের নাম, সমাহার নয়)।
অনুশীলনের
জন্য অতিরিক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ (একনজরে)
পরীক্ষায় বারবার আসে এমন
কিছু কর্মধারয় সমাসের উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
- মহারাজ: মহান যে রাজা।
(সাধারণ কর্মধারয়)
- কাঁচামিঠে: যা
কাঁচা তাই মিঠে। (সাধারণ কর্মধারয়)
- হাতেখড়ি: হাতে খড়ি
দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে। (এটি মূলত বহুব্রীহি, তবে অনেকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয়
হিসেবেও দেখান: হাতে দেওয়ার নিমিত্ত খড়ি)।
- পল্লীসমাজ: পল্লী
প্রধান সমাজ। (মধ্যপদলোপী)
- কপোতাক্ষ: কপোতের
(কবুতরের) অক্ষির (চোখের) ন্যায় অক্ষি যার। (এটি বহুব্রীহি হলেও ‘কপোতাক্ষ’
শব্দে উপমার ভাব আছে)।
- ঘনশ্যাম: ঘনের
ন্যায় শ্যাম (কালো)। (উপমান)
- কুসুমকোমল: কুসুমের
(ফুলের) ন্যায় কোমল। (উপমান)
- পাদপদ্ম: পাদ
পদ্মের ন্যায়। (উপমিত)
- পুরুষসিংহ: পুরুষ
সিংহের ন্যায়। (উপমিত)
- প্রাণপাখি: প্রাণ
রূপ পাখি। (রূপক)
- মোহনিদ্রা: মোহ রূপ
নিদ্রা। (রূপক)