১.
"কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো / গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে" — কবি
এখানে কী বোঝাতে চেয়েছেন? উপমাটির সার্থকতা আলোচনা করো। (১+৪)
উত্তর: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার বুকে
সূর্যাস্তের পর ক্ষণস্থায়ী লাল মেঘের বিলীন হয়ে যাওয়া এবং সন্ধ্যার আগমনী মুহূর্তকে
বুঝিয়েছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতির রূপ বর্ণনায় সম্পূর্ণ মৌলিক ও নতুন ঘরানার উপমা
ব্যবহার করেছেন। সূর্যাস্তের সময় আকাশের বুকে যে লালচে আভা দেখা যায়, তাকে কবি গ্রামীণ
বাংলার অতি পরিচিত ‘কামরাঙা’ ফলের লাল রঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সূর্যের আলো সম্পূর্ণ
নিভে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে সেই মেঘের রঙ ম্লান হতে থাকে। এই অবস্থাকে কবি তুলনা
করেছেন এক মৃত মনিয়া পাখির কোমল ও নিস্তেজ শরীরের সঙ্গে। মনিয়া পাখি অত্যন্ত ছোট ও
শান্ত। মৃত পাখির দেহ যেমন অসাড় হয়ে পড়ে, তেমনই দিনের আলো ফুরিয়ে এলে মেঘের সেই উজ্জ্বলতাও
শেষ হয়ে যায়। সবশেষে সেই মেঘ যেন দিগন্তের গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ের বুকে তলিয়ে যায়। চেনা
প্রকৃতিকে অচেনা ও মায়াবী এক বিষাদময় রূপকে বেঁধে কবি এখানে তাঁর অনন্য চিত্রকল্প তৈরির
ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন, যা উপমাটিকে অত্যন্ত সার্থক করে তুলেছে।
২. "আসিয়াছে
শান্ত অনুগত / বাংলার নীল সন্ধ্যা" — কবি সন্ধ্যাকে 'শান্ত' ও 'অনুগত' বলেছেন
কেন? একে 'নীল সন্ধ্যা' বলার তাৎপর্য কী? (২+৩)
উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশের চোখে বাংলার গ্রামীণ সন্ধ্যা কোনো আকস্মিক
বা ঝোড়ো ঘটনা নয়। তা অত্যন্ত ধীর, স্থির, শান্ত পায়ে এবং এক অনুগত বা বাধ্য মেয়ের মতো
কোনো কোলাহল ছাড়াই বাংলার বুকে নেমে আসে। পল্লী-প্রকৃতির এই সহজ, স্বাভাবিক ও শান্ত
রূপান্তরের কারণেই কবি সন্ধ্যাকে ‘শান্ত অনুগত’ বলেছেন। এর পাশাপাশি কবি সন্ধ্যাকে
‘নীল’ রঙে রাঙিয়েছেন কারণ এই ‘নীল’ বর্ণটি এখানে কেবল অন্ধকারের প্রতীক নয়, বরং তা
গভীর প্রশান্তি, রহস্য এবং এক মায়াবী আবেশের বহিঃপ্রকাশ। দিনের আলো পুরোপুরি নিভে যাওয়ার
পর এবং গভীর অন্ধকার নামার ঠিক আগের মুহূর্তে আকাশ ও পৃথিবীর সংযোগস্থলে যে এক মায়াবী
আলো-আঁধারির সৃষ্টি হয়, তার রঙ অনেকটা নীলাভ দেখায়। এই নীল সন্ধ্যা কবির হৃদয়ে এক শান্ত
অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
৩. "কেশবতী
কন্যা যেন এসেছে আকাশে" — কবি কাকে কেন 'কেশবতী কন্যা'র সঙ্গে তুলনা করেছেন? তাঁর
এই রূপকল্পের সৌন্দর্য বুঝিয়ে দাও। (১+৪)
উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ এখানে বাংলার বুকে নেমে আসা অন্ধকারাবৃত
মায়াবী সন্ধ্যাকে এক দীর্ঘ চুলের অধিকারিণী বা ‘কেশবতী কন্যা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কবি এখানে সন্ধ্যার অন্ধকারকে এক মানবীর রূপ দিয়েছেন, যাকে আমরা ব্যক্তিত্ব আরোপ বা
পার্সোনিফিকেশন বলতে পারি। আকাশে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন তার অন্ধকার যেন কোনো এক
রূপসী মেয়ের ছড়িয়ে দেওয়া অজস্র কালো চুলের মতো পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে। কবি অনুভব করেন,
সেই মায়াবী কন্যার চুলের স্পর্শ যেন তাঁর নিজের চোখে এবং মুখে এসে ভাসছে। গ্রামীণ বাংলার
হিজল, কাঁঠাল আর জামের বনের ওপর দিয়ে যখন সন্ধ্যার বাতাস বয়ে যায়, তখন কবির মনে হয়
সেই কেশবতী কন্যা যেন পরম মমতায় গাছগুলোকে অবিরত চুম্বন করছে। এই রূপকল্পটি অত্যন্ত
নিবিড় এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের পথ এই মায়াবী রূপ দেখেনি, কারণ
এই অনন্য সৌন্দর্য কেবল বাংলার নিভৃত পল্লিতেই অবলোকন করা সম্ভব।
৪. "নরম
ধানের গন্ধ — কলমীর ঘ্রাণ" — পঙ্ক্তিটিতে গ্রামীণ প্রকৃতির যে রূপ ফুটে উঠেছে
তা লেখো। এর মাঝে কবি কীভাবে 'বাংলার প্রাণ' খুঁজে পান? (২+৩)
উত্তর: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটিতে কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার চিরায়ত ও লোকায়ত
প্রকৃতির অত্যন্ত সাধারণ দুটি উপাদান—মাঠে বেড়ে ওঠা কচি নরম ধানের চারা এবং জলাশয়ের
ধারে ফুটে থাকা বুনো কলমী শাকের সুবাসকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি জীবনানন্দ
দাশ বাংলার আসল রূপ কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বা বিলাসবহুল শহরের মধ্যে খোঁজেননি। তিনি বাংলার
সত্তাকে খুঁজে পেয়েছেন গ্রামীণ প্রকৃতির অতি সাধারণ উপাদানের সুবাস ও স্পর্শে। নরম
ধানের গন্ধ, কলমীর বুনো ঘ্রাণ, হাঁসের পালক থেকে ঝরে পড়া জলের গন্ধ, কিংবা পুকুরের
শীতল জলে চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু আঁশটে গন্ধ—এই সব কিছুর মধ্যেই বাংলার হাজার বছরের
আবহমান ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। যখন আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে, তখন এই চেনা গন্ধগুলোর মেলবন্ধনেই
কবি মনে-প্রাণে ‘বাংলার প্রাণ’ বা প্রকৃত সত্তাকে টের পান।
৫. "লাল
লাল বটের ফালের / ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা" — এই পঙ্ক্তিটির অন্তর্নিহিত
অর্থ এবং কবির গভীর জীবনবোধের পরিচয় দাও। (১+৪)
উত্তর: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, দিনের শেষে গাছ
থেকে ঝরে পড়া এবং পথচারীদের পায়ে পিষ্ট হওয়া বটের ফলের গন্ধের মধ্যে এক ধরনের শান্ত
ক্লান্তি ও প্রচ্ছন্ন বিষাদ লুকিয়ে থাকে। জীবনানন্দ দাশ কেবল সৌন্দর্যের কবি নন, তিনি
এক গভীর জীবনবোধ ও নস্টালজিয়ার কবি। গ্রামীণ বাংলায় দুপুরের তপ্ত রোদ শেষে বা বিকেলের
আলো ফুরিয়ে এলে বটের ফলগুলো মাটিতে ঝরে পড়ে থাকে। পথচলতি মানুষের পায়ের চাপে যখন সেগুলো
পিষ্ট হয়, তখন সেখান থেকে এক অদ্ভুত বুনো ও টক-মিষ্টি গন্ধ বের হয়। কবি এই গন্ধকে
‘ব্যথিত’ বলেছেন এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা পরিবেশকে ‘ক্লান্ত নীরবতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রকৃতির এই উপাদানটির মাধ্যমে কবি জীবনের এক شাশ্বত সত্যকে তুলে
ধরেছেন। জীবনের চাকা ঘুরতে ঘুরতে যেভাবে একসময় অবসানের দিকে এগিয়ে যায়, বটের ফলের এই
ব্যথিত গন্ধ যেন সেই শান্ত ক্লান্তি ও নীরবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই অতি সাধারণ দৃশ্যের
মধ্যে গভীর জীবনদর্শনের সন্ধান করাই কবির অনন্য বৈশিষ্ট্য।
৬. "পৃথিবীর
কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো" — কোন কন্যার কথা বলা হয়েছে? পৃথিবীর অন্য কোনো
পথ তাকে দেখেনি কেন? (১+৪)
উত্তর: এখানে জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় বর্ণিত
রূপসী বাংলার বুকে নেমে আসা মায়াবী সন্ধ্যা-কন্যার কথা বলা হয়েছে। কবি জীবনানন্দ দাশের
দৃষ্টিতে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতি অনন্য এবং অতুলনীয়। পৃথিবীর বহু দেশ বা বহু পথ ঘুরেও
বাংলার নিভৃত পল্লির মতো এমন শান্ত ও স্নিগ্ধ সন্ধ্যার দেখা কোথাও পাওয়া যায় না। কবি
মনে করেন, সন্ধ্যার এই অন্ধকার যখন এক রূপসী মেয়ের দীর্ঘ কালো চুলের মতো আকাশ থেকে
হিজল, কাঁঠাল আর জামের বনে নেমে আসে, তখন তার রূপ কোনো কৃত্রিম জাঁকজমকে মলিন হয় না।
পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে বা আধুনিক নাগরিক সভ্যতায় সন্ধ্যার আগমন ঘটে এক যান্ত্রিক
আবহে। কিন্তু বাংলার নিভৃত গ্রামের মেঠোপথ, নদী আর বনের সীমান্তে যে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য
ছড়িয়ে পড়ে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো পথ দেখেনি। বাংলার গ্রামীণ সন্ধ্যার এই অকৃত্রিমতা
ও মায়াবী রূপকে বোঝাতেই কবি এমন মন্তব্য করেছেন।
৭. "জানি
নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসে" — কবি কীভাবে প্রকৃতির মধ্যে
এই রূপসীর চুলের সুবাস অনুভব করেছেন তা লেখো।
(২+৩)
উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ সন্ধ্যার মায়াবী অন্ধকারকে এক রূপসী কন্যার
চুলের বিন্যাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আকাশে সাতটি তারা ফোটার পর যখন ধীর পায়ে বাংলার
বুকে সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন কবির মনে হয় যেন সেই কন্যার অগাধ কালো চুল তাঁর নিজের চোখ
ও মুখের ওপর এসে ভাসছে। কবি গ্রামীণ প্রকৃতির বিভিন্ন প্রাকৃতিক সুবাসের মধ্যে এই রূপসীর
চুলের স্নিগ্ধ গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। হিজল, কাঁঠাল ও জাম গাছের বনের ওপর দিয়ে যখন সন্ধ্যার
বাতাস বয়ে যায়, তখন কবির মনে হয় সেই কেশবতী কন্যা তার অজস্র চুলের চুম্বনে গাছগুলোকে
ভরিয়ে দিচ্ছে। মাঠের নরম ধানের সুবাস, বুনো কলমীর ঘ্রাণ এবং পুকুরের জলের আর্দ্র গন্ধের
সাথে মিশে থাকা এই সন্ধ্যার মায়াবী বাতাসকে কবি সেই রূপসী কন্যার চুলের বিন্যাস থেকে
ঝরে পড়া এক পরম স্নিগ্ধ সুবাস হিসেবে মনে-প্রাণে অনুভব করেছেন।
৮. "অজস্র
চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত" — এই পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে প্রকৃতির
প্রতি কবির যে গভীর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে, তা বুঝিয়ে বলো। (১+৪)
উত্তর: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার চিরায়ত
গাছপালা ও প্রকৃতির ওপর সন্ধ্যার মায়াবী স্পর্শকে ভালোবাসার এক পরম অনুভূতিতে প্রকাশ
করেছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার প্রকৃতিকে কেবল দূর থেকে দেখেননি, তাকে এক পরম আত্মীয়তার
বন্ধনে অনুভব করেছেন। সন্ধ্যার অন্ধকার যখন নেমে আসে, তখন কবির চোখে তা কোনো জড়ো বস্তু
বা আলোর অভাব নয়; তা এক জীবন্ত মায়াবী কন্যা। সেই কন্যার অজস্র কালো চুলের রাশি যেন
পরম মমতায় ও ভালোবাসায় বাংলার চেনা হিজল, কাঁঠাল আর জাম গাছের বনের ওপর অবিরত চুম্বন
হয়ে ঝরে পড়ে। বাতাস যখন সেই গাছের পাতাগুলোকে স্পর্শ করে, কবি তখন তাকে প্রকৃতির এক
নিবিড় ভালোবাসার প্রকাশ বলে মনে করেন। প্রকৃতির অতি সাধারণ উপাদানকেও এমন এক রোমান্টিক
ও মানবিক সম্পর্কে বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে কবি প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর ও অকৃত্রিম ভালোবাসারই
পরিচয় দিয়েছেন।
৯. "কিশোরীর
চাল-ধোয়া ভিজে হাত — শীত হাতখান" — কবি কেন গ্রামীণ জীবনের এই অতি সাধারণ দৃশ্যটিকে
কবিতার উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছেন? (২+৩)
উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার আসল প্রাণকে কোনো বিলাসবহুল শহরের
জাঁকজমকে খোঁজেননি, বরং খুঁজেছেন লোকায়ত বাংলার অতি সাধারণ গ্রামীণ অভ্যাসের মধ্যে।
সাঁঝের বেলায় পুকুরঘাটে গ্রামের কিশোরীদের চাল ধুয়ে ঘরে ফেরার এই ছবিটি বাংলার আবহমান
সংস্কৃতির এক চিরায়ত রূপ। কবি এই দৃশ্যটিকে বেছে নিয়েছেন কারণ এর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা
নেই। চাল ধোয়ার পর কিশোরীর সেই ঠাণ্ডা বা ‘শীত হাতখান’ কেবল একটি স্পর্শ নয়, তা বাংলার
মাটির মমতা, গৃহস্থালির শান্তি ও সরলতার প্রতীক। এই আপাত-তুচ্ছ ছবির মধ্যেই গ্রামীণ
জীবনযাত্রার এক পরম সত্য লুকিয়ে আছে। প্রকৃতির রূপ ও গন্ধের বর্ণনার পাশাপাশি গ্রামীণ
নারীর এই সহজ জীবনযাত্রাকে মিলিয়ে কবি প্রমাণ করেছেন যে, এই সমস্ত লোকায়ত দৃশ্যের মেলবন্ধনেই
বাংলার প্রকৃত সত্তা বা প্রাণ জেগে থাকে।
১০.
"কিশোরের পায়ে-দলা মুথাঘাস" — এই চিত্রের মাধ্যমে কবি কীভাবে বাংলার লোকায়ত
জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন? (১+৪)
উত্তর: এই চিত্রের মাধ্যমে কবি জীবনানন্দ দাশ গ্রামীণ বাংলার মাঠের
চঞ্চল শৈশব এবং মাটির সোঁদা গন্ধের এক পরম লোকায়ত রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনানন্দ
দাশের প্রকৃতি চেতনা অত্যন্ত নিবিড় এবং মাটি-ঘেঁষা। গ্রামীণ বাংলায় রাখাল বা চঞ্চল
কিশোরের দল যখন মাঠে ছুটে বেড়ায় বা খেলাধুলা করে, তখন তাদের পায়ের নিচে পিষ্ট হয় মাঠের
সাধারণ মুথাঘাস। এই পায়ে-দলা পিষ্ট মুথাঘাস থেকে এক ধরনের তীব্র বুনো ও চেনা সুবাস
বের হয়। কবি এই গন্ধের কথা উল্লেখ করে বাংলার লোকায়ত জীবনের এক অতি বাস্তব ছবি আমাদের
সামনে তুলে ধরেছেন। নাগরিক কবিরা যেখানে প্রকৃতির কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা ফুলের বর্ণনা
করেন, সেখানে জীবনানন্দ দাশ কিশোরের পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়া ঘাসের গন্ধের মধ্যেও এক
পরম কাব্যিক সুবাস খুঁজে পান। গ্রামীণ জীবনের এই স্বাভাবিক ও চেনা ছবির মধ্য দিয়েই
বাংলার আসল রূপটি কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।
১১.
"এরই মাঝে বাংলার প্রাণ" — কবি প্রকৃতির কোন কোন উপাদানের মধ্যে 'বাংলার
প্রাণ' খুঁজে পেয়েছেন তা সংক্ষেপে সংকলন করো। (২+৩)
উত্তর: কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন গ্রামীণ প্রকৃতির
অতি সাধারণ, চেনা এবং লোকায়ত উপাদানগুলোর গন্ধ, স্পর্শ ও রূপের মধ্যে। কবি তাঁর এই
অন্বেষণে যে উপাদানগুলোকে সংকলন করেছেন তা হলো—মাঠের নরম ধানের গন্ধ, জলাশয়ের ধারের
বুনো কলমী শাকের ঘ্রাণ, সাঁতার কাটা হাঁসের পালক থেকে ঝরে পড়া জল, এবং পুকুরের শীতল
জলে চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু আঁশটে গন্ধ। এর পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনযাত্রার ছোঁয়া
হিসেবে রয়েছে সাঁঝের বেলায় কিশোরীর চাল-ধোয়া ভিজে ঠাণ্ডা হাত, চঞ্চল কিশোরের পায়ে-দলা
মুথাঘাসের সুবাস এবং গাছ থেকে ঝরে পড়া লাল লাল বটের ফলের ব্যথিত গন্ধের এক ক্লান্ত
নীরবতা। এই সমস্ত সাধারণ ও আপাত-তুচ্ছ উপাদানের অকৃত্রিম মিলনের মাঝেই কবি ‘বাংলার
প্রাণ’ বা প্রকৃত সত্তাকে খুঁজে পেয়েছেন।
১২.
"আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের।" — কবি কী টের পান এবং কেন
তা কেবল আকাশে সাতটি তারা ফোটার পরেই অনুভব করা সম্ভব হয়? (১+৪)
উত্তর: আকাশে যখন সাতটি তারা ফুটে ওঠে, তখন কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার
গ্রামীণ প্রকৃতির বুকে তার প্রকৃত সত্তা বা ‘বাংলার প্রাণ’কে মনে-প্রাণে টের পান। দিনের
কোলাহল ও রোদের তীব্রতায় প্রকৃতির ভেতরের শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপটি ঢাকা পড়ে থাকে। কিন্তু
সূর্যাস্তের পর যখন আকাশে একে একে সাতটি তারা বা সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে ওঠে, তখন চারপাশের
ব্যস্ততা থিতিয়ে আসে। এই শান্ত প্রহরেই প্রকৃতির আসল মায়াজালটি বিস্তৃত হয়। সন্ধ্যার
নীল অন্ধকার, কেশবতী কন্যার মতো মেঘের বিস্তার, ধানের সুবাস, বুনো কলমীর ঘ্রাণ আর বটের
ফলের নীরবতা—সবকিছু যেন এই বিশেষ মুহূর্তটিতেই একাত্ম হয়ে ওঠে। দিনের আলোর অনুপস্থিতিতে
কবির ইন্দ্রিয়গুলো আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। তাই এই শান্ত ও নীরব লগ্নেই কবি প্রকৃতির
প্রতিটি সূক্ষ্ম রূপান্তরকে নিবিড়ভাবে অনুভব করতে পারেন, যা অন্য কোনো সময়ে সম্ভব হয়
না।
১৩. ‘আকাশে
সাতটি তারা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের যে অনন্য ইন্দ্রিয়ঘনতা বা ঘ্রাণের অনুভূতির
প্রকাশ ঘটেছে, তা সংক্ষেপে বুঝিয়ে লেখো। (২+৩)
উত্তর: জীবনানন্দ দাশ কেবল দৃশ্যরূপের কবি নন, তিনি ঘ্রাণ বা সুবাসের
মাধ্যমে প্রকৃতিকে অনুভব করার এক অনন্য ক্ষমতার অধিকারী, যা এই কবিতায় স্পষ্ট। কবিতায়
কবি বাংলার প্রকৃতিকে কেবল চোখ দিয়ে দেখেননি, নাসিকা বা ঘ্রাণেন্দ্রিয় দিয়ে তার সত্তাকে
ছুঁয়েছেন। তিনি একে একে তুলে ধরেছেন নরম ধানের মিষ্টি গন্ধ, জলাশয়ের বনের কলমীর ঘ্রাণ,
পুকুরের জলের শীতল গন্ধ, এবং চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু আঁশটে সুবাস। শুধু তাই নয়,
কিশোরের পায়ে পিষ্ট হওয়া মুথাঘাসের তীব্র গন্ধ এবং মাটিতে ঝরে পড়া লাল বটের ফলের ‘ব্যথিত
গন্ধের’ মতো এক বিমূর্ত অনুভূতিকেও কবি ঘ্রাণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গভীর ও
সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ঘনতাই প্রমাণ করে যে, কবি বাংলার মাটির গন্ধের সাথে কতটা একাত্ম ছিলেন।
১৪. ‘আকাশে
সাতটি তারা’ কবিতায় কবি বাংলার গ্রামীণ সন্ধ্যার যে চিত্র অঙ্কন করেছেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত
বিবরণ দাও। (১+৪)
উত্তর: ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি গ্রামীণ সন্ধ্যার এক শান্ত,
স্নিগ্ধ, মায়াবী এবং চিত্রকল্পময় রূপ অঙ্কন করেছেন। কবিতার শুরুতে দেখা যায়, সূর্যাস্তের
পর আকাশের কামরাঙা-লাল মেঘ যেন এক মৃত মনিয়া পাখির মতো গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে তলিয়ে যায়।
এরপর কোনো কোলাহল ছাড়াই অত্যন্ত ধীর ও শান্ত পায়ে নেমে আসে বাংলার নীল সন্ধ্যা। এই
সন্ধ্যাকে কবি এক দীর্ঘ চুলের অধিকারিণী ‘কেশবতী কন্যা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। সেই
কন্যার ছড়ানো কালো চুলের অন্ধকার যেন পৃথিবীর বুকে নেমে আসে এবং কবির চোখ ও মুখের ওপর
ভাসতে থাকে। সন্ধ্যার এই মায়াবী অন্ধকার বাতাস হয়ে হিজল, কাঁঠাল আর জামের বনে অবিরত
চুম্বনের মতো ঝরে পড়ে। সমগ্র প্রকৃতি এক শান্ত ক্লান্তি ও নিবিড় নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়,
যা গ্রামীণ সন্ধ্যার এক নিখুঁত ও অপরূপ চিত্র তৈরি করে।
১৫. রোমান্টিক
প্রকৃতিচেতনার নিরিখে ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতার নামকরণের যৌক্তিকতা সংক্ষেপে আলোচনা
করো। (২+৩)
উত্তর: রোমান্টিক কবিরা প্রকৃতির বাহ্যিক রূপের আড়ালে তার এক অন্তলীন রহস্য ও আত্মাকে আবিষ্কার করতে চান, যা এই কবিতার নামকরণে সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। ‘আকাশে সাতটি তারা’ ফুটে ওঠার মুহূর্তটি কবির কাছে কেবল একটি সময়ের নির্দেশক নয়, এটি হলো নাগরিক জীবন থেকে মুক্ত হয়ে বাংলার চিরন্তন রূপের মায়াজালে প্রবেশ করার প্রবেশদ্বার। এই তারাগুলো যখন আকাশে দৃশ্যমান হয়, তখনই কবির রোমান্টিক চেতনা জাগ্রত হয় এবং তিনি প্রকৃতির নীল সন্ধ্যাকে ‘কেশবতী কন্যা’ হিসেবে রূপায়িত করেন। ধানের গন্ধ, কলমীর ঘ্রাণ বা বটের ফলের নীরবতার মধ্যে ‘বাংলার প্রাণ’কে খুঁজে পাওয়ার যে আকুলতা, তার সূচনা ঘটে এই তারা ফোটার লগ্নটিতেই। কবিতার শুরুতে ও শেষে এই পঙ্ক্তিটির ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সমগ্র কবিতার ভাববস্তু এই বিশেষ মুহূর্তটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই নামকরণটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক।