পোস্টমাস্টার (মূল গল্প): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অদল বদল গল্পের সংক্ষিপ্ত আলোচনা
অদল বদল গল্পের বিষয়বস্তু
পান্নালাল প্যাটেলের লেখা 'অদল-বদল' গল্পটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব এবং মানবিকতার এক অনন্য দলিল। গল্পের পটভূমি একটি গ্রাম, যেখানে হোলির বিকেলে একদল কিশোরের খেলাধুলার মধ্য দিয়ে কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে। এই গল্পের প্রধান দুই চরিত্র অমৃত ও ইসাব। তারা দুজন অভিন্নহৃদয় বন্ধু, যাদের জীবনযাপন, পারিবারিক অবস্থা এবং সামাজিক অবস্থান প্রায় একই রকম। দুজনেই চাষি পরিবারের সন্তান, একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে এবং তাদের বাড়ির অবস্থানও মুখোমুখি। এই বাহ্যিক মিলগুলোর চেয়েও বড় মিল ছিল তাদের মনের গভীরে থাকা অকৃত্রিম ভালোবাসা।
গল্পের মূল সংঘাত শুরু হয় তাদের নতুন পোশাককে কেন্দ্র করে। হোলির দিন অমৃত ও ইসাব দুজনেই একই রঙের, একই মাপের এবং একই কাপড়ের নতুন জামা পরে বেরিয়েছিল। অমৃতের এই নতুন জামাটি পাওয়া সহজ ছিল না। বন্ধু ইসাবের নতুন জামা হয়েছে দেখে সেও জেদ ধরেছিল যে হুবহু একই রকম জামা তার চাই। নয়তো সে স্কুলে যাবে না এবং না খেয়ে থাকবে। মা তাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন, ভয় দেখিয়েছিলেন যে ইসাবের বাবা যেমন জামার জন্য তাকে মেরেছেন, অমৃতকেও তেমন মার খেতে হবে। কিন্তু অমৃত ছিল নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত তার জেদের কাছে নতি স্বীকার করে তার বাবা তাকে নতুন জামা কিনে দেন। এই নতুন জামাটি ছিল অমৃতের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও মূল্যবান।
বিকেলে বন্ধুরা যখন তাদের পোশাকের হুবহু মিল দেখে তাদের শক্তির পরীক্ষা নিতে অর্থাৎ কুস্তি লড়তে উসকানি দেয়, তখন অমৃত সাফ জানিয়ে দেয় সে কুস্তি লড়বে না। তার ভয় ছিল জামা ময়লা হলে বা ছিঁড়ে গেলে মা তাকে মারধর করবেন। কিন্তু কালিয়া নামক এক দুরন্ত ছেলে জোর করে অমৃতকে কুস্তিতে নামায় এবং তাকে মাটিতে আছাড় দিয়ে ফেলে দেয়। বন্ধুর এই অপমান সহ্য করতে না পেরে ইসাব কালিয়ার সঙ্গে লড়তে নামে এবং তাকে হারিয়ে দেয়। এই সামান্য ঘটনা থেকেই বড় বিপদের সৃষ্টি হয়। হইহুল্লোড়ের মধ্যে অমৃত লক্ষ্য করে যে, ইসাবের নতুন জামার পকেট ও ধারের দিকের প্রায় ছয় ইঞ্চি কাপড় ছিঁড়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখে দুই বন্ধুর রক্ত হিম হয়ে যায়। ইসাবের বাবা অত্যন্ত রাগী মানুষ, তার মা নেই, আর এই জামাটি অনেক কষ্টে সুদে টাকা ধার করে কেনা হয়েছে। জামা ছেঁড়ার অপরাধে ইসাবের বাবা তাকে মেরেই ফেলবেন—এই ভয়ে দুই কিশোর দিশেহারা হয়ে পড়ে।
ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তেই অমৃতের হৃদয়ে বন্ধুর প্রতি ভালোবাসার এক অভাবনীয় বুদ্ধি খেলে যায়। সে ইসাবকে টেনে নিয়ে গিয়ে নিজের অক্ষত নতুন জামাটি খুলে তাকে পরতে দেয় এবং ইসাবের ছেঁড়া জামাটি নিজে পরে নেয়। ইসাব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল যে অমৃতের কী হবে? অমৃতের সরল উত্তর ছিল, তাকে বাঁচানোর জন্য অন্তত তার মা আছে, কিন্তু ইসাবের মা নেই। বাবার মারের হাত থেকে বন্ধুকে বাঁচাতে নিজের প্রিয় নতুন জামাটি অকাতরে ত্যাগ করার এই মানসিকতা সাধারণ বন্ধুত্বের সীমানা ছাড়িয়ে এক মহান আত্মত্যাগে রূপ নেয়। অমৃত জানত তাকে মার খেতে হবে, তবুও সে বন্ধুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পিছপা হয়নি।
পরবর্তীতে তাদের এই জামা বদলের গোপন কথাটি জানাজানি হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসাবের বাবা হাসান পাঠান যখন এই ত্যাগের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি রাগান্বিত হওয়ার বদলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি পাঠান হয়েও অমৃতকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং ঘোষণা করেন যে অমৃতের মতো সন্তান পাওয়ার জন্য তিনি একুশজন সন্তানকেও পালন করতে রাজি আছেন। অমৃতের এই ছোট্ট একটি কথা—'আমার মা আছে'—হাসান পাঠানের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে মাতৃহীন ইসাবের প্রতি অমৃতের এই সমবেদনা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সমাজের যেকোনো ভেদাভেদের চেয়ে অনেক বড়।
গল্পের শেষে দেখা যায়, এই মহানুভবতার খবর গ্রামপ্রধানের কান পর্যন্ত পৌঁছায়। তিনি মুগ্ধ হয়ে দুই বন্ধুর নাম দেন 'অদল' এবং 'বদল'। যে গ্রামবাসী বা কিশোররা শুরুতে তাদের নিয়ে মজা করছিল, তারাই পরে শ্রদ্ধার সাথে তাদের এই নতুন নামে ডাকতে শুরু করে। আকাশ-বাতাস 'অদল-বদল' ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই গল্পের মধ্য দিয়ে লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কোনো ধর্ম, বর্ণ বা পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো এবং বন্ধুর জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটি বিসর্জন দেওয়ার নামই হলো প্রকৃত মনুষ্যত্ব। অমৃত ও ইসাবের এই ছোট গল্পের আবহে আসলে এক বিশাল বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বাণী নিহিত রয়েছে, যা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাকে তুচ্ছ করে মানবতার জয়গান গায়। জামা অদল-বদলের মাধ্যমে তারা যেন আসলে তাদের সুখ-দুঃখ এবং অন্তরের ভালোবাসাই অদল-বদল করে নিয়েছিল, যা আধুনিক সমাজ ও সভ্যতার জন্য এক পরম শিক্ষা।
অদল বদল গল্পের নামকরনের সার্থকতা
সাহিত্যে কোনো রচনার নামকরণ কেবল একটি পরিচয় নয়, বরং তা সেই সৃষ্টির অন্তরনিহিত মূলভাব বা মর্মার্থের এক শৈল্পিক ইঙ্গিত। পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল-বদল’ গল্পটির নামকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি কেবল ঘটনার বাহ্যিক রূপ নয়, বরং গল্পের আত্মিক ও আদর্শগত সত্যকে ধারণ করে আছে। নামকরণের সার্থকতা বিচার করতে গেলে আমাদের গল্পের ঘটনাপ্রবাহ, চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব এবং লেখকের মূল বার্তাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হয়। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু অমৃত ও ইসাবকে, যাদের পোশাক, জীবনযাপন এবং পারিবারিক পটভূমি প্রায় হুবহু এক। এই বাহ্যিক সাদৃশ্যই গল্পের নামকরণের প্রথম ধাপ তৈরি করে দেয়।
গল্পের মূল ঘটনা আবর্তিত হয়েছে একটি নতুন জামাকে কেন্দ্র করে। হোলির দিনে দুই বন্ধু একই রকমের নতুন জামা পরে বের হয়। অমৃতের অনেক জেদ এবং অনাহারের বিনিময়ে পাওয়া সেই নতুন জামাটি ছিল তার কাছে অত্যন্ত আবেগের। কিন্তু খেলার ছলে কুস্তি লড়তে গিয়ে যখন বন্ধু ইসাবের জামাটি ছিঁড়ে যায়, তখনই গল্পের মোড় ঘোরে। ইসাবের মা নেই, আর তার বাবা অত্যন্ত রাগী মানুষ—এই রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে রেখে অমৃত এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের নতুন ও অক্ষত জামাটি ইসাবের ছেঁড়া জামার সঙ্গে বিনিময় করে নেয়। এই যে বস্তুগত ‘অদল-বদল’, এটাই গল্পের শিরোনামের প্রাথমিক সার্থকতা। অমৃত জানত যে বাড়িতে ফিরলে ছেঁড়া জামার জন্য তাকে মায়ের হাতে মার খেতে হবে, তবুও বন্ধুর প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে সে স্বেচ্ছায় সেই শাস্তি মাথা পেতে নেয়। এই বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তাদের বন্ধুত্বের গভীরতা এবং নিঃস্বার্থ ত্যাগের রূপটি ফুটে উঠেছে।
তবে নামকরণের গভীরতা কেবল পোশাক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই ‘অদল-বদল’ প্রক্রিয়াটি আসলে দুটি হৃদয়ের ভালোবাসার বিনিময়। অমৃতের এই ত্যাগ ইসাবের বাবা হাসান পাঠানের হৃদয়ে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। হাসান পাঠান ছিলেন একজন কঠোর পরিশ্রমী এবং কঠোর মেজাজের মানুষ। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে অমৃত নিজের মায়ের আশ্রয়ের ভরসায় বন্ধুকে বাঁচাতে নিজের প্রিয় জামাটি দিয়ে দিয়েছে, তখন তার ভেতরের কাঠিন্য গলে জল হয়ে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, মাতৃহীন ইসাবের জন্য অমৃতের এই ভালোবাসা পৃথিবীর যেকোনো সম্পর্কের চেয়েও খাঁটি। এখানে ‘অদল-বদল’ কেবল পোশাকে থাকেনি, বরং একজন মানুষের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসান পাঠান নিজে একুশজন অমৃতের মতো ছেলেকে পালন করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসলে এক বৃহত্তর মানবিকতাকে বরণ করে নিয়েছেন।
গল্পের শেষে দেখা যায়, গ্রামপ্রধান এই ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে দুই বন্ধুর নামই বদলে দেন। অমৃত হয়ে ওঠে ‘অদল’ আর ইসাব হয়ে ওঠে ‘বদল’। এই নামকরণের মাধ্যমে লেখক ব্যক্তিগত নামকে ছাড়িয়ে একটি আদর্শগত পরিচয়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে সমাজে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ বা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থাকতে পারত, সেখানে অমৃত ও ইসাবের এই পারস্পরিক বিনিময় সমাজকে এক নতুন দিশা দেখায়। তাদের এই ‘অদল-বদল’ আসলে সম্প্রীতির প্রতীক। যখন গ্রামবাসী বা গ্রামের অন্য ছেলেরা ‘অদল-বদল’ বলে চিৎকার করে, তখন তা কেবল একটি মজার ধ্বনি থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে বন্ধুত্বের জয়গান। জামা বদলের মধ্য দিয়ে তারা আসলে তাদের জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচিতিকেও ছাপিয়ে গিয়ে একে অপরের আত্মার আত্মীয় হয়ে ওঠে।
সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত তিন প্রকারের হয়—চরিত্রপ্রধান, ঘটনাপ্রধান বা ভাবপ্রধান। ‘অদল-বদল’ গল্পটির নামকরণ এই তিনটি দিকের একটি সুন্দর সমন্বয়। এটি যেমন ঘটনার সারসংক্ষেপ প্রদান করে, তেমনই এটি গল্পের মূল ভাব বা থিমকে সার্থকভাবে তুলে ধরে। বিনিময় বা ত্যাগের মাধ্যমেই যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা যায়, এই মহৎ সত্যটিই নামকরণের আড়ালে লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ করেছেন। নিজের ভালো থাকার চেয়ে বন্ধুকে ভালো রাখার যে মানসিকতা অমৃত দেখিয়েছে, তা ‘অদল-বদল’ শব্দবন্ধের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়। ছোটদের এই নিঃস্বার্থ আচরণের সামনে বড়দের অহংকার ও কঠোরতা পরাজিত হয়, যা গল্পের শেষভাগে হাসান পাঠানের সজল চোখের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ‘অদল-বদল’ শব্দটি এখানে কেবল একটি ক্রিয়া নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। সমাজ যখন বিভেদ আর সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন হয়, তখন এই বিনিময় বা পারস্পরিক ত্যাগের আদর্শই মুক্তির পথ দেখায়। জামা বিনিময়ের ছোট একটি ঘটনা থেকে শুরু হয়ে গল্পের পরিণতি যেখানে পৌঁছায়, তাতে এই নামকরণটি কেবল অর্থবহ নয়, বরং অনিবার্য হয়ে উঠেছে। নামটির মাধ্যমেই গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র রক্ষিত হয়েছে। লেখক পান্নালাল প্যাটেল অত্যন্ত সার্থকভাবে এবং পরিমিতিবোধের সাথে এই শব্দ দুটি ব্যবহার করেছেন যা গল্পের প্রতিটি পরতকে উন্মোচিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায় যে, গল্পের ভাববস্তু ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের সাথে সঙ্গতি রেখে ‘অদল-বদল’ নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক ও রসোত্তীর্ণ হয়েছে।
অদল বদল গল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
১. "অমৃত ও ইসাবের সবই একরকম, তফাত শুধু এই যে..."— অমৃত ও ইসাবের জীবনের কোন কোন দিকের মিল ও অমিলের কথা এখানে বলা হয়েছে?
২. "অমৃত সত্যি তার বাবা-মাকে খুব জ্বালিয়েছিল"— নতুন জামা পাওয়ার জন্য অমৃত কীভাবে তার বাবা-মায়ের ওপর জেদ বজায় রেখেছিল?
৩. "তোর জামা খুলে আমারটা পর"— অমৃত কেন ইসাবকে এই হুকুম দিয়েছিল? এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অমৃতের চরিত্রের কোন পরিচয় পাওয়া যায়?
৪. "না, তাহলে মা আমাকে ঠ্যাঙ্গাবে"— অমৃত কেন কুস্তি লড়তে অস্বীকার করেছিল? এর পেছনে তার মায়ের দেওয়া কোন সতর্কবার্তা ছিল?
৫. 'অদল-বদল' গল্পে কালিয়া ও অমৃতের মধ্যে যে কুস্তি হয়েছিল, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
৬. "ইসাবের মেজাজ চড়ে গেল"— কেন ইসাবের মেজাজ চড়ে গিয়েছিল? সে এর প্রতিকারে কী করেছিল?
৭. "ওদের বুকের ধুকপুকুনি বন্ধ হবার জোগাড়"— অমৃত ও ইসাবের মনে এমন আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল কেন?
৮. "ইসাবের বাবা ছেঁড়া শার্ট দেখা মাত্র ওর চামড়া তুলে নেবে"— ইসাবের বাবার সম্পর্কে এমন আশঙ্কার কারণ কী ছিল? জামাটি নিয়ে তার আবেগ কেমন ছিল?
৯. "অমৃতের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল"— অমৃতের মাথায় কোন বুদ্ধি খেলেছিল এবং সেটির প্রয়োগ সে কীভাবে করেছিল?
১০. "ঠিক আছে, আমাকে বেঁধে রাখো! মারো!"— অমৃতের এই মরিয়া আচরণের কারণ কী? সে শেষ পর্যন্ত কীভাবে সফল হয়েছিল?
১১. "আমি তোরটা পরব"— অমৃত কেন নিজে ছেঁড়া জামা পরতে রাজি হয়েছিল? এর পরিণাম কী হতে পারে বলে সে জানত?
১২. "কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য তো আমার মা আছে"— অমৃতের এই উক্তির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। এটি কীভাবে ইসাবের বাবার মনে প্রভাব ফেলেছিল?
১৩. "বাহালি বৌদি, আজ থেকে আপনার ছেলে আমার"— কে, কাকে এই কথা বলেছিলেন? কেন তার মনে এমন ইচ্ছার উদয় হয়েছিল?
১৪. "অদল-বদল" গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
১৫. "অমৃতের জবাব আমাকে বদলে দিয়েছে"— হাসান পাঠানের এই পরিবর্তনের কারণ কী? অমৃতের কোন জবাব তাকে প্রভাবিত করেছিল?
১৬. "ছেলে দুটোকে গলিতে ঢুকতে দেখেই ভেবে নিলাম..."— হাসান পাঠান গলি থেকে কী লক্ষ্য করেছিলেন এবং তাতে তিনি কী উপলব্ধি করেছিলেন?
১৭. 'অদল-বদল' গল্পে বর্ণিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্রটি নিজের ভাষায় লেখো।
১৮. "আজ থেকে আমরা অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে ডাকব"— গ্রামপ্রধান কেন এমন ঘোষণা করেছিলেন? এর সামাজিক গুরুত্ব কী?
১৯. "তোর কী হবে, তুই কী পরবি?"— ইসাবের এই আশঙ্কার উত্তরে অমৃত কী বলেছিল এবং সেই পরিকল্পনাটি কতখানি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?
২০. "দুজনের গায়েই সেদিনকার তৈরি নতুন জামা"— অমৃত ও ইসাবের নতুন জামার বর্ণনা দাও এবং এই জামা নিয়ে তাদের অনুভূতির কথা লেখো।
২১. "ছেলেদুটোর সবই একরকম"— অমৃত ও ইসাবের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থার সামঞ্জস্য বুঝিয়ে দাও।
২২. "বাবার ভারী হাতের মারের কাছে ও কিছুই নয়"— অমৃতের অভিজ্ঞতায় তার মায়ের মার ও বাবার মারের যে তুলনা পাওয়া যায়, তা লেখো।
২৩. "ওরা ভয়ে কাঠ হয়ে গেল"— কোন পরিস্থিতিতে অমৃত ও ইসাব ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিল এবং সেই বিপদ থেকে তারা কীভাবে উদ্ধার পেল?
২৪. "খাঁটি জিনিস কাকে বলে"— হাসান পাঠানের মতে 'খাঁটি জিনিস' কোনটি? গল্প অবলম্বনে বুঝিয়ে বলো।
২৫. "তামাশা করে হলেও এখন ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে পড়েছে"— কীভাবে একটি সাধারণ খেলা জটিল পরিস্থিতির দিকে এগিয়েছিল?
২৬. "অমৃত ও ইসাব অপ্রস্তুত বোধ করল না"— শুরুতে অস্বস্তি থাকলেও পরে কেন তারা 'অদল-বদল' ডাক উপভোগ করতে শুরু করেছিল?
২৭. অমৃতের মায়ের চরিত্রটি 'অদল-বদল' গল্প অবলম্বনে বিশ্লেষণ করো।
২৮. "অমৃতের মতো ছেলে পেলে আমি একুশজনকেও পালন করতে রাজি আছি"— এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে বক্তার হৃদয়ের কোন মহৎ গুণের প্রকাশ ঘটেছে?
২৯. 'অদল-বদল' গল্পের প্রেক্ষাপটে অমৃত ও ইসাবের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের পরিচয় দাও।
৩০. গল্পের শেষ দৃশ্যে 'আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠার' যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, তার তাৎপর্য সংক্ষেপে লেখো।
অদল বদল (মূল গল্প): পান্নালাল প্যাটেল
অদল বদলঃ পান্নালাল প্যাটেল
হোলির দিনের পড়ন্ত বিকেল। নিম গাছের নীচে গাঁয়ের একদল ছেলে জড়ো হয়ে ধুলো ছোড়াছুড়ি করে খেলছিল।
হাত ধরাধরি করে অমৃত ও ইসাব ওদের কাছে এল। দুজনের গায়েই সেদিনকার তৈরি নতুন জামা। রং, মাপ, কাপড় সব দিক থেকেই একরকম। এরা দুজনে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। রাস্তার মোড়ে এদের বাড়ি দুটোও মুখোমুখি। দুজনের বাবাই পেশায় চাষি, জমিও প্রায় সমান সমান। দুজনকেই সাময়িক বিপদ আপদে সুদে ধার নিতে হয়। বলতে গেলে ছেলেদুটোর সবই একরকম, তফাত শুধু এই যে, অমৃতের বাবা-মা আর তিন ভাই রয়েছে, ইসাবের আছে শুধু তার বাবা।
দুই বন্ধুতে মিলে শান-বাঁধানো ফুটপাথে এসে বসতে, ওদের একরকম পোশাক দেখে দলের একটি ছেলে বলল, 'ঠিক, তোরা দুজনে কুস্তি কর তো, দেখি তোরা শক্তিতেও সমান-সমান, না একজন বড়ো পালোয়ান।'
আরেকটি ছেলে চেঁচিয়ে উঠল, 'লড়ে যা তোরা, বেশ মজা হবে।'
ইসাব অমৃতের দিকে তাকাল। অমৃত দৃঢ়স্বরে বলল, 'না, তাহলে মা আমাকে ঠ্যাঙ্গাবে।'
অমৃতের অত জোর দিয়ে বলার কারণ ছিল। বাড়ি থেকে বেরাবার সময় ওর মা সাবধান করে দিয়েছিলেন, 'নতুন জামা পাবার জন্য তুমি কী কাণ্ডটাই না করেছিলে; এখন যদি তুমি জামা ময়লা করে বা ছিঁড়ে আসো, তাহলে তোমার কপালে কী আছে মনে রেখো।'
অমৃত সত্যি তার বাবা-মাকে খুব জ্বালিয়েছিল। শোনা মাত্র অমৃত ফতোয়া জারি করে দিল, ঠিক ইসাবের মতো জামাটি না পেলে ও স্কুলে যাবে না।
মা ওকে অনেক বুঝিয়েছিল, 'ইসাবকে ক্ষেতে কাজ করতে হয় বলে ওর জামা ছিঁড়ে গেছে, আর তোরটা তো প্রায় নতুনই রয়েছে।'
দেয়। 'মোটেই না,' বলে কাঁদতে কাঁদতে অমৃত ওর জামার একটা ছেঁড়া জায়গায় আঙুল ঢুকিয়ে আরো ছিঁড়ে মা তখন ওকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বললেন, 'নতুন জামা দেবার আগে ইসাবের বাবা ওকে খুব মেরেছিলেন, তুইও সেরকম মার খেতে রাজি আছিস?'
অমৃত এতেও পিছপা হতে রাজি নয়। ও মরিয়া হয়ে বলল, 'ঠিক আছে, আমাকে বেঁধে রাখো! মারো! কিন্তু তোমাকে ইসাবের মতো একটা জামা আমার জন্য জোগাড় করতেই হবে।'
ইসাবের মা এসব ঝামেলা থেকে বাঁচবার জন্য বললেন, 'ঠিক আছে, তোর বাবাকে গিয়ে বলগে।'
অমৃত জানত মা 'না' বললে ওর বাবার রাজি হবার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু অত সহজে হাল ছাড়ার পাত্রও সে নয়। ও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল, খাওয়া ছেড়ে দিল এবং রাত্তিরে বাড়ি ফিরতে রাজি হলো না। শেষমেশ ওর মা হাল ছেড়ে দিয়ে অমৃতের বাবাকে ওর জন্য নতুন জামা কিনে দিতে রাজি করালেন। এর পর উনি গিয়ে ইসাবের বাবার গোয়ালঘর থেকে লুকিয়ে থাকা অমৃতকে বাড়ি নিয়ে এলেন।
সুন্দর সাজগোজ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমৃতের একেবারেই ইচ্ছে ছিল না জামাকাপড় নোংরা হয় এমন কিছু করতে। বিশেষ করে ইসাবের সঙ্গে কুস্তি লড়তে তো একেবারেই গররাজি।
এমন সময় ছেলেছোকরার দঙ্গল থেকে একজন এসে হাত দিয়ে অমৃতের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, 'এসো, আমরা কুস্তি লড়ি।'
এই বলে সে অমৃতকে খোলা মাঠে নিয়ে এল। অমৃত ওর বাঁধন কেটে বেরুবার চেষ্টা করতে করতে বলল, 'দেখ কালিয়া, আমি কুস্তি লড়তে চাই না, আমাকে ছেড়ে দে।' কালিয়া তো ওকে ছাড়লই না, বরং ছুঁড়ে মাটিতে ফেলে দিল। ছেলের দল আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, 'কালিয়া জিতেছে, অমৃত হেরে গেছে, কী মজা, কী মজা।'
ইসাবের মেজাজ চড়ে গেল। ও কালিয়ার হাত ধরে বলল, 'আয়, আমি তোর সঙ্গে লড়ব।' কালিয়া ইতস্তত করছিল, কুস্তি শুরু হয়ে গেল। ইসাব ল্যাং মারতে কালিয়া ব্যাঙের মতো হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল।
তামাশা করে হলেও এখন ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে পড়েছে এবং কালিয়ার বাবা-মা এসে ওদের পিটুতে পারে বুঝতে পেরে সবাই যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল।
অমৃত আর ইসাবও রণভূমি ত্যাগ করল। কিছুটা যেতেই অমৃতের নজরে এল যে ইসাবের জামার পকেট ও ছ'ইঞ্চি পরিমাণ কাপড় ছিঁড়ে গেছে। ওরা ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। ওরা জামা কতটা ছিঁড়েছে পরীক্ষা করছে, এমন সময় শুনতে পেল ইসাবের বাবা ইসাবকে ডাকছেন।
ওদের তখন বুকের ধুকপুকুনি বন্ধ হবার জোগাড়, ওরা জানে ইসাবের বাবা ছেঁড়া শার্ট দেখা মাত্র ওর চামড়া তুলে নেবে। উনি সুদখোরের কাছ থেকে টাকা ধার করে অনেক বাছাবাছি করে কাপড় কিনে জামা সেলাই করিয়েছিলেন।
ইসাবের বাবা আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, 'কে কাঁদছে, ইসাব কোথায়?'
হঠাৎ অমৃতের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল, ও ইসাবকে টানতে টানতে বলল, 'আমার সঙ্গে আয়।' ওদের দুই বাড়ির মাঝখানে ঢুকে অমৃত জামার বোতাম খুলতে লাগল। ও হুকুম দিল, 'তোর জামা খুলে আমারটা পর।'
ইসাব বলল, 'তোর কী হবে, তুই কী পরবি?'
অমৃত বলল, 'শিগগির কর, নয়তো কেউ দেখে ফেলবে। আমি তোরটা পরব।'
'ইসাব জামা খুলতে লাগল, যদিও অমৃত কী করতে চাইছে বুঝতে পারছিল না, বলল, "জামা অদল-বদল? কিন্তু তাতে সুবিধাটা কী হবে, তোকে তো তোর বাবা পিটোবে।'
অমৃত বলল, 'নিশ্চয় ঠ্যাঙ্গাবে, কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য তো আমার মা আছে।'
ইসাবের মনে পড়ল, ও দেখেছে যে, অমৃতের বাবা যখনই মারতে গেছেন, অমৃত ওর মায়ের পেছনে লুকিয়েছে। মার হাতে অবশ্য ওকে দু'চার থাপ্পড় খেতে হয়েছে, কিন্তু বাবার ভারী হাতের মারের কাছে ও কিছুই নয়।
ইসাব তবু ইতস্তত করছে, এমন সময় সে খুব কাছে কাউকে কাশতে শুনল, তক্ষুণি ওরা ঝটপট জামা অদল-বদল করে, গলি থেকে বেরিয়ে ধীরে সুস্থে নিঃশব্দে যে যার বাড়ির দিকে চলল।
ভয়ে অমৃতের বুক ঢিপঢিপ করছিল। কিন্তু ওর কপাল ভালো দিনটা ছিল হোলির, সে সময় সবাই জানে কিছুটা ধস্তাধস্তি টানা হ্যাঁচড়া চলে। মা যখন দেখলেন জামাটা ছিঁড়েছে, উনি ভুরু কুঁচকোলেন কিন্তু মাফ করে দিলেন। একটা সুঁচসুতো নিয়ে ছেঁড়া জামাটা রিফু করে দিলেন।
এতে দুজনেরই ভয় কেটে গেল, ওরা আবার হাত ধরাধরি করে গ্রামের ধারে হোলির সময়কার বাজি
আর বুড়ির বাড়ি পোড়ানো দেখতে গেল।
একটা ছেলে ওদের জামা বদলানো দেখেছিল, সে ওদের আনন্দ মাটি করার জন্য বলল, 'তোরা অদল-বদল করেছিস, হুম্।'
সে তাদের জামা অদল-বদল করা দেখে ফেলেছে এই আশঙ্কা করে তারা চলে যেতে চাইল। কিন্তু ইতিমধ্যে অন্য ছেলেরাও কি ঘটেছে জেনে চ্যাঁচাতে লাগল, 'অদল-বদল, অদল-বদল।' অমৃত আর ইসাব সরে পড়তে চাইল, কিন্তু ছেলের দল তাদের পেছনে পেছনে 'অদল-বদল, অদল-বদল!' বলে চ্যাঁচাতে লাগল। বাবারা তাদের ব্যাপারটা জেনে ফেলবে মনে করে তারা ভয়ে বাড়ির দিকে ছুটে পালাতে লাগল।
ইসাবের বাবা বাড়ির সামনের দাওয়ায় খাটিয়ায় বসে হুঁকো খাচ্ছিলেন, তিনি ওদের ডাকলেন, 'তোমরা বন্ধুদের কাছ থেকে পালিয়ে আসছ কেন? আমার কাছে এসে বসো।'
ওঁর শান্ত গলা শুনে ওদের চিন্তা হলো, ভাবল, 'যা ভেবেছিলাম তাই হলো, উনি আসল ঘটনাটা জানেন, শুধু ভালোবাসার ভান করছেন।'
ইসবের বাবা পাঠান, উনি দশ বছরের অমৃতকে জড়িয়ে ধরলেন। চেঁচিয়ে বললেন, 'বাহালি বৌদি, আজ থেকে আপনার ছেলে আমার।' বাহালি বৌদি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসতে হাসতে বললেন, 'হাসান ভাই, আপনি এক ছেলেকেই দেখে উঠতে পারেন না, তা দুজনকে কী করে সামলাবেন?'
আবেগ ভরা গলায় হাসান বললেন, 'বাহালি বৌদি, অমৃতের মতো ছেলে পেলে আমি একুশজনকেও পালন করতে রাজি আছি।'
কেশে গলা পরিষ্কার করে পাঠান বাহালি বৌদিকে বললেন, 'ছেলে দুটোকে গলিতে ঢুকতে দেখেই ভেবে নিলাম, দেখতে হবে ওরা কী করে।' পাড়া-পড়শি মায়ের দল পাঠানের গল্প শোনার জন্য ঘিরে দাঁড়াল।
উনি অল্প কথায় ছেলেদের জামা বদলের গল্পটা বললেন, আরো বললেন, 'ইসাব অমৃতকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোর বাবা যদি তোকে মারে কী হবে? অমৃত কী জবাব দিয়েছিল জানেন? বলেছিল কিন্তু আমার তো মা রয়েছে।'
সজল চোখে পাঠান বললেন, 'কী খাঁটি কথা! অমৃতের জবাব আমাকে বদলে দিয়েছে। ও আমাকে শিখিয়েছে, খাঁটি জিনিস কাকে বলে।'
অমৃত ও ইসাবের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার গল্প শুনে তাঁদেরও বুক ভরে গেল।
ইতিমধ্যে ছেলের দল বাজি আর বুড়ির বাড়ি পোড়ানো দেখে ফিরছিল। তারা ইসাব অমৃতকে ঘিরে বলতে লাগল, 'অমৃত-ইসাব- অদল-বদল, ভাই অদল-বদল।'
এবার অবশ্য ইসাব ও অমৃত অপ্রস্তুত বোধ করল না, বরঞ্চ অদল-বদল বলাতে তাদের ভালোই লাগল।
অদল-বদলের গল্প গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গ্রাম-প্রধানের কানে গেল। উনি ঘোষণা করলেন, 'আজ থেকে আমরা অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে ডাকব।'
ছেলেরা খুব খুশি হলো, ক্রমশ গ্রাম পেরিয়ে আকাশ বাতাসও 'অমৃত-ইসাব অদল-বদল, অদল-বদল' এই আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল।
আলোবাবু গল্পের সংক্ষিপ্ত আলোচনা
আলোবাবু গল্পের বিষয়বস্তু
বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ‘আলোবাবু’ বাংলা সাহিত্যের এমন এক মর্মস্পর্শী ছোটগল্প, যা মানুষের মনের গহন কোণের একাকীত্ব, অতৃপ্ত মমতা এবং সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে এক সুতোয় বেঁধেছে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘আলো’ বা ‘আলুবাবু’ এমন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাঁর বাইরের আবরণের সঙ্গে ভেতরের সত্তার ছিল দুস্তর ব্যবধান। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, মুখটি বেগুন-পোড়ার মতো অপ্রীতিকর, জট পাকানো চুল আর সাধারণ বেশভূষার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসীম স্নেহপ্রবণ কোমল হৃদয়। তাঁর নাম ‘আলো’ হলেও সমাজ তাঁর জন্য কেবল অন্ধকারের লাঞ্ছনাই বরাদ্দ করেছিল। এই মানুষটি ছিলেন সেবার কাঙাল, স্নেহের কাঙাল—যিনি কেবল ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে ভালোবাসা বিলিয়ে দিতেই বেশি ব্যাকুল থাকতেন।
গল্পের সূচনা ঘটে একটি করুণ অথচ অর্থবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে। পেশায় ডাক্তার গল্পের কথকের কাছে একদিন হঠাৎ আলোবাবু হাজির হন একটি আহত পাখির ছানা নিয়ে। এক দুষ্টু ছেলের হাত থেকে সামান্য দু-আনা পয়সার বিনিময়ে ছানাটিকে উদ্ধার করে এনেছিলেন তিনি। নিজের সামান্য উপার্জনে যেখানে নিজের গ্রাসাচ্ছাদন দায়, সেখানে পাখির ছানার জন্য তাঁর এই আকুলতা তাঁর চরিত্রের গভীরতম মমত্ববোধকে প্রকাশ করে। তিনি কেন বিয়ে করেননি বা কোনো প্রাণী পোষেননি, তার উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন যে, কাউকে ভালোবেসে তার সেবা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। এই উক্তিটি তাঁর দায়িত্ববোধ এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক পরম নিদর্শন। তিনি জানতেন, ভালোবাসা কেবল অধিকার নয়, বরং তা এক পবিত্র দায়িত্ব।
আলোবাবুর জীবনের ট্র্যাজেডি হলো তাঁর ‘আউট অফ প্লেস’ বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান। তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই তাঁর সরলতা এবং অতি-সংবেদনশীলতা সমাজের তথাকথিত নিয়মকানুনের সঙ্গে সংঘাত ঘটিয়েছে। পেশাদারিত্বের জগতে যে কঠোরতা প্রয়োজন, আলোবাবুর হৃদয়ে তার লেশমাত্র ছিল না। হাসপাতালে ড্রেসারের কাজ পাওয়ার পর রোগীর ব্যথায় কাতর হয়ে তিনি যখন অন্যের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার করেন, তখন তিনি কেবল মানবিক আবেগের বশবর্তী হয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রের যান্ত্রিক নিয়ম এবং হাসপাতালের ডিসিপ্লিন সেই আবেগকে ‘অক্ষমার্হ অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে তাঁকে চাকরিচ্যুত করে। সমাজ এবং কর্মসংস্থান যে মমতার চেয়ে নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়, আলোবাবু সেই রূঢ় সত্যটি বুঝে উঠতে পারেননি।
আবার অবিনাশবাবুর সংসারে থাকাকালীন তাঁর বিদায় হওয়ার কারণটি আরও বেশি গভীর ও দার্শনিক। তিনি অবিনাশবাবুর শিশুপুত্র এবং একটি দেশি কুকুরের ছানাকে একইভাবে আদর করছিলেন, দুজনের মুখেই বারবার চুমু খাচ্ছিলেন। একজন মা বা একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে এটি ছিল অস্বাস্থ্যকর এবং রুচিহীন। কিন্তু আলোবাবুর চোখে তখন কোনো ভেদাভেদ ছিল না; শিশু এবং পশুর ছানা—উভয়ই তাঁর কাছে ছিল ঈশ্বরের পবিত্র সৃষ্টি এবং অসহায়ত্বের প্রতীক। তাঁর এই ‘অখণ্ড ভালোবাসা’ বা সর্বজনীন মমত্ববোধ সমাজকে আতঙ্কিত করেছিল। সমাজ আসলে ভালোবাসাকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেঁধে রাখতে চায়, কিন্তু আলোবাবু সেই গণ্ডি ভেঙে ফেলেছিলেন বলেই তাঁকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘বিচিত্র’ তকমা দিয়ে বারবার ছুড়ে ফেলা হয়েছে।
কথকের আশ্রয়ে এসে আলোবাবুর জীবনের এক গোপন ও নিভৃত অধ্যায় সামনে আসে। তাঁর একটি পুরনো ভাঙা ঘড়ি ছিল, যাকে তিনি প্রাণহীন ধাতু বলে মনে করতেন না। দিনের পর দিন পরম যত্নে ঘড়িটিকে একাধিক কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা এবং ঠিক রাত দশটায় চোখ বুজে ভক্তিভরে দম দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল এক অপার্থিব পূজার মতো। আসলে যে মানুষটি সারা জীবন মানুষের কাছে অবহেলিত হয়েছেন, যার স্নেহের আবেদন বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তিনি তাঁর সমস্ত সঞ্চিত ভালোবাসা ওই ছোট্ট ঘড়িটির ওপর নিবেদন করেছিলেন। ঘড়িটি ছিল তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র অবলম্বন, তাঁর একমাত্র আপনজন। তিনি কল্পনা করতেন ঘড়িটি যেন একটি জীবন্ত শিশু, যাকে সময়মতো ‘খাওয়ানো’ বা দম দেওয়া তাঁর প্রধান কর্তব্য।
গল্পের শেষ পর্যায়ে যখন সেই ঘড়িটি চুরি হয়ে যায়, তখন আলোবাবুর পৃথিবীর শেষ আলোটুকুও নিভে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর ভালোবাসা এবং যত্নের যে জগত তিনি গড়েছিলেন, তা এই নিষ্ঠুর চোরের হাত থেকে বা সমাজের আঘাত থেকে সুরক্ষিত নয়। তাঁর সেই আর্তনাদ— “আমায় ওরা সইলো না কেউ/ আমার কাছে রইলো না কেউ”—আসলে এক বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। তিনি উচ্চস্বরে গেয়ে উঠেছিলেন তাঁর জীবনের ব্যর্থতার গান। তাঁর এই বিলাপ কেবল ঘড়ি হারানোর শোক ছিল না, বরং তা ছিল সারা জীবনের পুঞ্জীভূত একাকীত্ব এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক করুণ স্বীকারোক্তি।
বনফুল এই গল্পের শেষে আমাদের এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আলোবাবু পাগল নন, বরং তাঁর ভালোবাসা ছিল ‘অতি-স্বাভাবিক’। কিন্তু যে পৃথিবী কেবল স্বার্থ, নিয়ম আর যান্ত্রিকতায় চলে, সেখানে এমন নিষ্কাম ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষ সত্যিই অচল। সমাজ তাঁকে ধারণ করতে পারেনি বলেই তাঁকে শেষ পর্যন্ত পাগলা গারদে ঠাঁই নিতে হলো। আলোবাবু আসলে আমাদের সমাজের সেই দর্পণ, যেখানে তাকালে আমাদের হৃদয়ের রুক্ষতা এবং সহমর্মিতার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। আলোবাবুর পরিণতি আমাদের মনে এই প্রশ্ন রেখে যায় যে, সত্যিকারের ‘পাগল’ কে—যিনি ঘৃণা করেন, নাকি যিনি সবকিছুকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসতে চেয়েছিলেন? এই গল্পের বিষয়বস্তু তাই কেবল একজন মানুষের জীবনকাহিনি নয়, বরং তা মানবীয় অনুভূতির এক চিরন্তন হাহাকার।
আলোবাবু গল্পের নামকরনের সার্থকতা
বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ‘আলোবাবু’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করতে গেলে আমাদের প্রথমেই চরিত্রটির নাম এবং তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক সুগভীর বৈপরীত্যকে অনুধাবন করতে হয়। সাহিত্যের নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়—কখনো তা হয় বিষয়বস্তু প্রধান, কখনো চরিত্রপ্রধান, আবার কখনো বা তা ব্যঞ্জনাধর্মী। ‘আলোবাবু’ গল্পটির ক্ষেত্রে এই তিনটি দিকের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম ‘আলো’, কিন্তু তাঁর বাহ্যিক রূপ এবং জীবনের ঘটনাক্রম সেই নামের সঙ্গে এক তীব্র কৌতুকপূর্ণ ও বিষাদময় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। লেখক শুরুতেই বর্ণনা করেছেন যে, আলোবাবুর গায়ের রং কুচকুচে কালো এবং তাঁর অবয়বও যথেষ্ট শ্রীহীন। অথচ এই অন্ধকারাচ্ছন্ন রূপের আড়ালে ছিল এক প্রদীপ্ত হৃদয়ের জ্যোতি, যা দয়া, মায়া এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল। এই চারিত্রিক মাধুর্যই মূলত ‘আলোবাবু’ নামটিকে সার্থকতা দান করেছে।
গল্পের নামকরণের সার্থকতা লুকিয়ে আছে চরিত্রটির অন্তরের ঔজ্জ্বল্যে। আলোবাবু ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর হৃদয়ে ছিল অসহায় প্রাণের প্রতি অসীম মমতা। জগতের যাবতীয় তুচ্ছ ও অবহেলিত প্রাণীর জন্য তাঁর বুকের ভেতর যে দয়া সঞ্চিত ছিল, তা অন্ধকার সমাজে আলোর মতোই দুর্লভ। একটি আহত পাখির ছানাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তাঁর আকুলতা কিংবা একটি তুচ্ছ দেশি কুকুরের বাচ্চার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম যত্ন প্রমাণ করে যে, তাঁর ভেতরে এক দিব্য মানবিক চেতনার আলো বর্তমান ছিল। আমরা দেখি, সমাজ তাঁকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে, তাঁকে তাঁর রূপ বা দারিদ্র্যের কারণে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর সহজাত মমত্ববোধ থেকে বিচ্যুত হননি। এই যে অন্ধকারের মতো কালো মানুষটির ভেতর থেকে বিচ্ছুরিত হওয়া দয়া ও সেবার জ্যোতি, এটিই গল্পের নামকরণের প্রথম সার্থকতা।
তবে এই নামকরণের সার্থকতা কেবল তাঁর চারিত্রিক গুণাবলীতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের অন্ধকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের একটি রূপক হিসেবেও কাজ করেছে। গল্পের নাম যখন ‘আলো’, তখন প্রত্যাশা থাকে যে তিনি চারপাশকে আলোকিত করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আলোবাবু যেখানেই তাঁর ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, সমাজ সেখানেই অন্ধকার দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়েছে। তাঁর সেই ‘আলো’ বা ভালোবাসা সমাজের মানুষের কাছে কখনো ‘পাগলামি’, কখনো ‘অশোভন’ আবার কখনো ‘অযোগ্যতা’ বলে মনে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যখন তিনি অবিনাশবাবুর বাড়িতে শিশু এবং কুকুরকে একইভাবে স্নেহ করছিলেন, তখন সমাজের চোখে সেই কাজ ছিল কদর্য। কিন্তু আধ্যাত্মিক বা মানবিক দৃষ্টিতে দেখলে, সেই আচরণের মূলে ছিল এক অখণ্ড ও নির্মল ভালোবাসা, যা কোনো বিভেদ মানে না। এই নির্মলতা আলোরই ধর্ম। সমাজ সেই আলো সহ্য করতে পারেনি বলেই তাঁকে বারবার আশ্রয়চ্যুত হতে হয়েছে। তাই ‘আলোবাবু’ নামটি এখানে কেবল একটি ব্যক্তির পরিচয় নয়, বরং তা এক অবহেলিত এবং ভুল বোঝা মানবিক আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গল্পের শেষ পর্যায়ে তাঁর ঘড়িটির প্রতি ভালোবাসা এবং পরবর্তীতে সেই ঘড়ি চুরি হওয়ার পর তাঁর উন্মাদ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নামকরণের সার্থকতাকে এক বিষাদময় পূর্ণতা দান করে। আলোবাবু যখন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক নিঃসঙ্গ মানুষ, তখন তাঁর সেই ছোট্ট ঘড়িটিই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা বা আলোর উৎস। ঘড়িটির প্রতি তাঁর যে ভক্তি ও যত্ন, তা ছিল প্রকৃতপক্ষে তাঁর জীবনের শেষ সলতেটিকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। ঘড়িটি যখন হারিয়ে গেল, তখন তাঁর জীবনের সেই ক্ষুদ্র আলোকবর্তিকাটিও নিভে গেল। তাঁর সেই গান— “আমায় ওরা সইলো না কেউ”—আসলে এক নির্বাপিত আলোর আর্তনাদ। গল্পের শেষে আলোবাবুকে যখন পাগলা গারদে পাঠানো হয়, তখন সমাজ যেন পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয় যে, এই অন্ধকারের রাজত্বে আলোবাবুদের মতো ‘আলো’ বহনকারী মানুষদের কোনো স্থান নেই।
পরিশেষে বলা যায়, বনফুলের এই গল্পের নামকরণটি অত্যন্ত ব্যঞ্জনাধর্মী এবং সার্থক। নামের মাধ্যমে লেখক একদিকে যেমন চরিত্রটির শারীরিক রূপ ও মানসিক সৌন্দর্যের দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, অন্যদিকে তেমনই সমাজের নিষ্ঠুরতার সামনে এক সংবেদনশীল হৃদয়ের পরাজয়কেও চিহ্নিত করেছেন। আলোবাবু নামে যতটা প্রদীপ্ত ছিলেন, জীবনে ততটাই অন্ধকার সহ্য করেছেন। তবুও তাঁর চারিত্রিক শুদ্ধতা এবং মমত্বের যে জ্যোতি গল্পের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে, তা পাঠকের মনে এক স্থায়ী রেখাপাত করে। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিকতার ‘আলো’ সমাজ বুঝতে ব্যর্থ হলেও সাহিত্যের আঙিনায় তা চিরকাল অমলিন হয়ে থাকে। তাই গল্পের সামগ্রিক ভাববস্তু, চরিত্রের অন্তলীন গুণাবলি এবং ট্র্যাজিক পরিণতির প্রেক্ষাপটে ‘আলোবাবু’ নামকরণটি কেবল সার্থক নয়, বরং অনবদ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ।
আলোবাবু গল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
১. ‘সবাই তাঁকে আলুবাবু বলত, কিন্তু তাঁর আসল নাম আলো’— আলোবাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তাঁর নামের বৈপরীত্য গল্পের শুরুতে কীভাবে ফুটে উঠেছে?
২. ‘চেহারা অবশ্য নামের উপযুক্ত নয়’— আলোবাবুর শারীরিক অবয়বের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তা নিজের ভাষায় লেখো।
৩. আলোবাবুর সঙ্গে লেখকের প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটি সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
৪. ‘অনুগ্রহ করে একটু সাহায্য করবেন আমাকে?’— আলোবাবু লেখকের কাছে কেন সাহায্য চেয়েছিলেন? সেই ঘটনায় তাঁর চরিত্রের কোন দিকটি প্রকাশিত হয়?
৫. ‘জীবন্ত কোনো জিনিস পোষবার সামর্থ্য নেই আমার’— আলোবাবুর এই উক্তির মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের কোন রূঢ় বাস্তব ও দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়?
৬. ‘সেই জন্যে বিয়েও করিনি’— আলোবাবুর অবিবাহিত থাকার পেছনে তাঁর যে মানসিকতা কাজ করেছিল তা বিশ্লেষণ করো।
৭. আলোবাবু সম্পর্কে অবিনাশবাবুর ধারণা কী ছিল? তিনি আলোবাবুকে কেন আশ্রয় দিয়েছিলেন?
৮. ‘সেবা করতে বড়ো ভালোবাসে’— আলোবাবুর সেবা করার মানসিকতা গল্পের বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে কীভাবে প্রমাণিত হয়েছে?
৯. হাসপাতালে আলোবাবুর চাকরির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কোন পরিস্থিতিতে তাঁর চাকরিটি চলে যায়?
১০. ‘কার হুকুমে তুমি ঘায়ে কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছ!’— আলোবাবু কেন এই ভুলটি করেছিলেন? এর পেছনে তাঁর যুক্তি কী ছিল?
১১. অবিনাশবাবুর বাড়ি থেকে আলোবাবুর বিদায় নেওয়ার কারণটি আলোচনা করো। একজন মায়ের দৃষ্টিতে তাঁর আচরণটি কেন অসহনীয় ছিল?
১২. ‘আলোবাবু যা করেছিলেন তা কোনো মা সহ্য করতে পারেন না’— আলোবাবুর সেই বিশেষ আচরণটি বর্ণনা করে সামাজিক প্রেক্ষাপটে তার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
১৩. ‘স্নেহের কাঙাল বেচারা’— আলোবাবুর চরিত্রের এই বিশেষ দিকটি গল্পের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করো।
১৪. লেখক শেষ পর্যন্ত আলোবাবুকে কেন এবং কীভাবে আশ্রয় দিলেন?
১৫. আলোবাবুর বাদ্যযন্ত্র বাজানোর শখ ও তাঁর ‘সোলার হ্যাট’ বাজানোর বিচিত্র নেশা সম্পর্কে কী জানা যায়?
১৬. ‘এককালে ডুগি-তবলা বাজাতে পারতাম। দৈন্যের দায়ে সব বেচে দিতে হয়েছে’— এই উক্তির মাধ্যমে আলোবাবুর অতীত ও বর্তমানের বৈষম্য ফুটে তোলো।
১৭. আলোবাবুর ঘড়িটির বর্ণনা দাও। তিনি ঘড়িটিকে কীভাবে আগলে রাখতেন?
১৮. ঘড়িতে দম দেওয়ার পদ্ধতিটিকে লেখক কেন ‘পুজো করার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন?
১৯. ‘আমাদের যেমন খাবার, ঘড়ির তেমনি দম’— ঘড়িটির প্রতি আলোবাবুর এই অতি-মানবিক অনুভূতির কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
২০. ‘সব স্নেহ তাই উজাড় করে দিয়েছে বোধহয় ঘড়িটির উপর’— গল্পের প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্যটির সার্থকতা বিচার করো।
২১. আলোবাবু যে গানটি গাইতেন— ‘আমায় ওরা সইলো না কেউ/ আমার কাছে রইলো না কেউ’— এই গানের পঙ্ক্তি দুটির মধ্যে তাঁর জীবনের কোন হাহাকার লুকিয়ে আছে?
২২. ‘আমার ঘড়িটা চুরি হয়ে গেছে’— ঘড়িটি চুরি হওয়ার পর আলোবাবুর মানসিক অবস্থার কী পরিবর্তন ঘটেছিল?
২৩. ‘ঠিক সময় হয়তো ভালো করে দম দিতে পারবে না’— চুরির পরেও ঘড়িটির প্রতি আলোবাবুর এই উদ্বেগ তাঁর কোন মানসিকতার পরিচয় দেয়?
২৪. গল্পের শেষে আলোবাবুর পরিণতির জন্য সমাজ কতটা দায়ী বলে তুমি মনে করো?
২৫. ‘সমাজের সঙ্গে নিজেকে তিনি খাপ খাওয়াতে পারলেন না কিছুতে’— এই উক্তিটির আলোকে গল্পের মূল দ্বন্দ্বটি আলোচনা করো।
২৬. ‘আলোবাবু’ গল্পে পশুপাখির প্রতি নায়কের যে মমতা ফুটে উঠেছে তা উদাহরণসহ আলোচনা করো।
২৭. আলোবাবু কি সত্যিই পাগল ছিলেন? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
২৮. বনফুলের ছোটগল্প হিসেবে ‘আলোবাবু’র শিল্পগুণ বা সার্থকতা আলোচনা করো।
২৯. ‘আলোবাবু’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
৩০. এই গল্পের মাধ্যমে লেখক মানব চরিত্রের কোন গূঢ় রহস্য বা একাকীত্বের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন তা নিজের ভাষায় লেখো।
আলোবাবু (মূল গল্প): বনফুল
আলোবাবুঃ বনফুল
সবাই তাঁকে আলুবাবু বলত, কিন্তু তাঁর আসল নাম আলো। চেহারা অবশ্য নামের উপযুক্ত নয়। গায়ের রং কুচকুচে কালো, মুখটি বেগুন-পোড়ার মতো, তাঁর উপর কালো গোঁফ-দাড়ি, যুগ্ম-ভ্রু, মাথায় ঘাড় পর্যন্ত লম্বা বাবরি চুল। গলায় তুলসীর মালা, সেটিও কালো হয়ে গেছে। পরনের থানখানি অবশ্য ধপধপে সাদা। গায়ের চাদরখানিও সাদা। আলুথালু জামা গায়ে দিতেন না, জুতোও পরতেন না।
একদিন সকালে আমার বৈঠকখানায় ঢুকে নমস্কার করে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই দিনই প্রথম দেখলাম তাঁকে।
কী চাই আপনার?
অনুগ্রহ করে একটু সাহায্য করবেন আমাকে?
সাহায্যপ্রার্থী অনেক আসে, অধিকাংশ লোকই টাকা চায়, ভাবলাম ইনিও বোধ হয় সেই দলের, মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম, কিন্তু মুখ ফুটে বিরক্তি প্রকাশ করতে পারলাম না। বরং বললাম, অসম্ভব না হলে নিশ্চয়ই করব। বলুন, কী করতে হবে।
তাঁর বাঁ হাতে একটি ছোটো থলি ছিল। তার ভিতর হাত ঢুকিয়ে তিনি একটি ছোটো পাখির ছানা বার করলেন।
একটা ছোঁড়া এই পাখির ছানাটার পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। আমি দু আনা পয়সা দিয়ে বাচ্চাটা নিয়ে নিয়েছি তার কাছ থেকে। মনে হচ্ছে এর পায়ে লেগেছে, পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছিল কিনা, একটু দেখবেন দয়া করে? শুনেছি আপনি বড়ো ডাক্তার।
দেখলাম পাখির ছানাটিকে। পায়ে সত্যিই লেগেছিল। টিংচার আয়োডিন লাগিয়ে বেঁধে দিলাম।
কী করবেন এটাকে নিয়ে, পুষবেন?
না। ভালো হলে ছেড়ে দেবো। জীবন্ত কোনো জিনিস পোষবার সামর্থ্য নেই আমার। ইচ্ছে করে খুব, কিন্তু পয়সা নেই। সেই জন্যে বিয়েও করিনি।
কুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলে একটু হেসে চাইলেন আমার দিকে।
ও। এর আগে তো দেখিনি আপনাকে, কোথায় থাকেন?
অবিনাশবাবুর বাড়িতে। দিন সাতেক হলো এসেছি।
আর একবার কুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলে চাইলেন। অবিনাশবাবু এখানকার নামজাদা উকিল একজন। অবিনাশবাবুদের সঙ্গে আত্মীয়তা আছে বুঝি?
না, তেমন কিছু নয়। আমার এক দূর-সম্পর্কের ভাগনীর বন্ধুর শ্বশুর উনি। আসলে লোক খুব ভালো। তাই দয়া করে থাকতে দিয়েছেন। আলোবাবু পাখির ছানাটি নিয়ে চলে গেলেন।
দিন কয়েক পরে অবিনাশবাবুর
বাড়ি যেতে হয়েছিল। সেখানে আলোবাবুর সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল। দেখলাম তিনি একটি
দিশি কুকুরের বাচ্চার পরিচর্যায় নিযুক্ত হয়ে আছেন। আমাকে দেখেই এক মুখ হেসে বললেন, বিনুবাবুর
কুকুর এটি। কুকুর পোষার শখ আছে কিন্তু সেবা করতে জানেন না, দুটো
চোখে এতক্ষণ পিচুটি ভরতি ছিল, তুলো ভিজিয়ে পরিষ্কার করলুম।
আর কুকুরকে সারাক্ষণ বেঁধে রাখলে কি চলে? ওদের সঙ্গে খেলা
করতে হয়-
কুকুরটার দিকে চেয়ে তার মুখের সামনে টুসকি দিতে লাগলেন। ল্যাজ নেড়ে নেড়ে খেলা করতে লাগল কুকুরটা। বিনু অবিনাশের ছেলে, বয়স দশ বছর।
অবিনাশবাবুর সঙ্গে দেখা হলো একটু পরে।
বললাম, আপনার এই আলোবাবু লোকটি তো অদ্ভুত ধরনের মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, অদ্ভুতই। স্নেহের কাঙাল বেচারা। গরিবও খুব। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে নাকি?
হ্যাঁ, এক পাখি-পেশেন্ট নিয়ে গিয়েছিলেন আমার কাছে।
দেখবেন তো, যদি ওর চাকরি-বাকরি জুটিয়ে দিতে পারেন কোথাও। সেবা করতে বড়ো ভালোবাসে, বিশেষত সেবার পাত্র বা পাত্রী যদি অসহায় হয়---
দিন কতক পরে সিভিল সার্জনের সঙ্গে দেখা হলো। একসঙ্গে কলেজে পড়েছিলুম। কথায় কথায় আলোবাবুর কথা উঠে পড়ল। সিভিল সার্জন বললে, এখানকার হাসপাতালে ওকে প্রবেশনার ড্রেসার করে ঢুকিয়ে নিতে পারি। তবে দশ টাকার বেশি এখন পাবে না। পরীক্ষায় পাশ করলে তখন মাইনে বাড়বে আলোবাবু হাসপাতালের আউট-ডোরে রোগীদের ঘা ধোয়াতে লাগলেন। মাসখানেক পরেই কিন্তু চাকরিটি গেল তাঁর। একদিন আমার ল্যাবরেটরিতে এসে শুল্ক মুখে বসে আছেন।
কী খবর -
আমাকে দূর করে দিলে।
কেন?
একটা লোকের পায়ের ঘা কিছুতেই সারছিল না। সে-ই আমাকে একটা ওষুধ দেখিয়ে দিয়ে বললে, ওই ওষুধটা দাও তাহলে সেরে যাবে। ওটা লাগিয়ে অনেকের নাকি সেরে গেছে। দিলুম ওষুধটা লাগিয়ে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে লোকটা চিৎকার শুরু করে দিলে, সে এক হৈ-হৈ ব্যাপার। ডাক্তারবাবু এলেন, তিনি তো চটেই লাল, বললেন, কার হুকুমে তুমি ঘায়ে কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছ! আমি আর কী বলব, চুপ করে রইলাম। ডাক্তারবাবু আমাকে দূর করে দিলেন। আমি ওর ভালোর জন্যেই ওষুধটা দিয়েছিলাম আর ওর কথাতেই দিয়েছিলাম-
আমি চুপ করে রইলাম, কী আর বলব। সত্যিই অন্যায় কাজ করেছেন।
কিছুক্ষণ বসে থেকে আলোবাবু চলে গেলেন।
কষ্ট হতে লাগল ভদ্রলোকের জন্য, কিন্তু কী করব ভেবে পেলাম না।
দিন কয়েক পরে অবিনাশবাবুর বাড়ি থেকেও বিদায় নিতে হলো আলোবাবুকে। শুনলাম অবিনাশবাবুর স্ত্রী দূর করে দিয়েছেন তাঁকে। আলোবাবু যা করেছিলেন তা কোনও মা সহ্য করতে পারেন না। তিনি এক বগলে কুকুরের বাচ্চাটা এবং আর এক বগলে অবিনাশবাবুর শিশু-পুত্র তিনুকে নিয়ে একবার কুকুরটার মুখে আর সঙ্গে সঙ্গে তিনুর মুখে চুমু খাচ্ছিলেন।
অবশেষে আমিই আশ্রয় দিলাম আলোবাবুকে।
একদিন সন্ধের পর এসে দেখলাম তিনি একটা সোলার হ্যাট বাজিয়ে গুন গুন করে গান গাইছেন।
আপনি গান-বাজনা জানেন নাকি কুণ্ঠিতমুখে
উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
এককালে ডুগি-তবলা বাজাতে পারতাম। দৈন্যের দায়ে সব বেচে দিতে হয়েছে। এখন হ্যাট বাজাই বলা বাহুল্য, খুব কৌতুক অনুভব করলাম।
হ্যাট পেলেন কোথেকে -
অনেক আগে স্যুটও পরতাম। সব গেছে, ওই হ্যাটটি আছে কেবল।
আলোবাবুর আরও পরিচয় পেলাম দিন কয়েক পর। একদিন দেখি তিনি ছুটতে ছুটতে আসছেন।
কী হলো, ছুটছেন কেন---
দশটা বেজে গেছে আমার ঘড়িতে দম দেওয়া হয়নি এখনও। রামবাবুর গাইটার বাচ্চা হয়েছে শুনে দেখতে গিয়েছিলাম, হঠাৎ শুনতে পেলাম তাঁর বৈঠকখানার ঘড়িতে টং টং করে দশটা বেজে গেল। তখুনি ছুটলাম, আমার ঘড়িতে ঠিক দশটার সময় দম দিই। আমাদের যেমন খাবার, ঘড়ির তেমনি দম, বেচারির খেতে দেরি হয়ে গেল আজকে।
তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লেন নিজের ঘরে। আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম। আলোবাবুর যে ঘড়ি আছে তা জানতাম না। তাঁর পিছু পিছু এসে একটু আড়াল থেকে দেখতে লাগলাম। দেখলাম ঘরে ঢুকেই তিনি নিজের ভাঙা তোরঙ্গটা খুললেন। তার ভেতর থেকে বার করলেন একটি ছোটো টিনের বাক্স। বাক্সের ভিতর থেকে একটা ন্যাকড়ার ছোটো পুঁটুলির মতন কী বার করলেন। ন্যাকড়াটি খুলতেই লালরঙের শালুর পুটুলি বেরিয়ে পড়ল। সেটি খুললেন। বেরুল রেশমি ন্যাকড়ার পুঁটুলি, সেটি খুলতেই বের হলো খানিকটা তুলো, তারপর ছোট্ট ঘড়িটি। তিন পুরু কাপড়-ঢাকা ঘড়িটিকে আঙুলের মতো রাখতেন তিনি সযত্নে। ঘড়িটি বার করে চাপটালি খেয়ে বসলেন, তারপর চোখ বুজে ধীরে ধীরে দম দিতে লাগলেন। মনে হলো যেন পুজো করছেন।
অবিনাশবাবুর কথাটা মনে পড়ল। স্নেহের কাঙাল বেচারা! জীবনে কিন্তু ভালোবাসার সুযোগ পাচ্ছে না কোথাও। সব স্নেহ তাই উজাড় করে দিয়েছে বোধহয় ঘড়িটির উপর।
একদিন ল্যাবরেটরি থেকে ফিরে দেখি, আলোবাবু হ্যাট বাজিয়ে তারস্বরে গান গাইছেন। দুটো লাইনই বার বার গাইছেন আমায় ওরা সইলো না কেউ/আমার কাছে রইলো না কেউ-
আমি খনিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম অবাক হয়ে। এমন গলা ছেড়ে গান গাইতে শুনিনি কখনও তাঁকে। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থেমে গেলেন তিনি।
আজ এত জোরে গান গাইছেন যে!
এমনি।
তারপর আমার দিকে চেয়ে কুণ্ঠিত হাসি হেসে বললেন, আমার ঘড়িটা চুরি হয়ে গেছে। ঠিক সময় হয়তো ভালো করে দম দিতে পারবে না-
টপ-টপ করে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা।
আলোবাবু এখন পাগলা গারদে আছেন।
সমাজের সঙ্গে নিজেকে তিনি খাপ খাওয়াতে পারলেন না কিছুতে।
বহুরূপী : সংক্ষিপ্ত আলোচনা
বহুরূপী গল্পের মূল বিষয়:
সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পটি হরিদা নামক এক অতি দরিদ্র কিন্তু বিচিত্র স্বভাবের মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনী। হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী; অভাব যাঁর নিত্যসঙ্গী, কিন্তু একঘেয়ে কোনো ধরাবাঁধা কাজ বা চাকুরির শৃঙ্খলা তাঁর নাপসন্দ। তিনি স্বাধীনতার স্বাদ পেতে ভালোবাসেন এবং সেই স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে অনেক সময় তাঁকে অনাহারেও দিন কাটাতে হয়। শহরের এক সংকীর্ণ গলির ছোট ঘরে তাঁর বসবাস, যেখানে লেখক ও তাঁর বন্ধুরা নিয়মিত আড্ডায় সমবেত হন। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি জগদীশবাবু নামক এক ধনী ও কৃপণ ব্যক্তির বাড়িতে এক হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীর আগমনের কথা শোনে হরিদা। সেই সন্ন্যাসী ছিলেন অতি উচ্চ দরের এবং তাঁর পায়ের ধুলো পাওয়া ছিল অসম্ভব। জগদীশবাবু কৌশলে সন্ন্যাসীকে সোনার বোল লাগানো খড়ম পরিয়ে পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন এবং বিদায়কালে তাঁর ঝোলায় জোর করে একশো টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়েছিলেন। এই সন্ন্যাসীর গল্প শোনার পর হরিদার মধ্যে এক পেশাদারী জেদ কাজ করে। তিনি বন্ধুদের জানান যে এবার তিনি এমন এক কাণ্ড করবেন যাতে তাঁর সারা বছরের অন্নের সংস্থান হয়ে যাবে এবং তিনি সেই খেলা দেখানোর জন্য বন্ধুদের সন্ধ্যাবেলা জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত থাকতে বলেন।
সন্ধ্যাবেলা জগদীশবাবুর উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত বারান্দায় এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানে হঠাৎ আবির্ভূত হন এক 'বিরাগী'। তাঁর শান্ত, সৌম্য এবং উজ্জ্বল দৃষ্টির সামনে জগদীশবাবু স্তম্ভিত হয়ে যান। হরিদার সেই বিরাগী রূপ ছিল নিখুঁত এবং ঐশ্বরিক। জটাজুট বা গৈরিক বসনহীন সেই বিরাগী ছিলেন শ্বেত বসনধারী এবং হাতে ছিল কেবল একটি গীতা। তিনি জগদীশবাবুকে তাঁর ধনের অহংকারের জন্য মৃদু তিরস্কার করেন এবং নিজেকে এই ব্রহ্মাণ্ডের ধূলিকণা হিসেবে পরিচয় দেন। জগদীশবাবু বিরাগীর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে এতটাই বিমোহিত হন যে তিনি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার উপক্রম করেন এবং বার বার তাঁকে বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানান। এমনকি বিরাগী যখন প্রস্থানের কথা বলেন, তখন জগদীশবাবু তাঁর তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান। আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা হরিদার বন্ধুরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী হরিদা সেই প্রণামীর টাকার থলিটি অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ধুলোর মতো সোনাকেও মাড়িয়ে দিয়ে শান্ত পায়ে সেখান থেকে চলে যান।
গল্পের শেষে দেখা যায় হরিদা তাঁর নিজের ঘরে উনানের সামনে বসে আছেন। বন্ধুরা যখন তাঁকে তাঁর এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করেন যে কেন তিনি অতগুলো টাকা নিলেন না, তখন হরিদার উত্তর ছিল শিল্পীর এক চরম সত্যোপলব্ধি। তিনি জানান যে বিরাগীর সাজ পোশাক পরে যদি তিনি টাকার প্রতি লোভ দেখাতেন, তবে তাঁর 'ঢং' অর্থাৎ বহুরূপীর শিল্পের অমর্যাদা হতো। একজন খাঁটি বিরাগী কখনও টাকা স্পর্শ করতে পারেন না, আর হরিদা শিল্পী হিসেবে সেই চরিত্রের প্রতি সৎ থাকতে চেয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে তাঁর দারিদ্র্য ঘুচল না, উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফোটার যে ট্র্যাজেডি তা অব্যাহতই রয়ে গেল। গল্পটি আমাদের শেখায় যে শিল্পীর কাছে নিজের শিল্পের মর্যাদা ও আদর্শ জাগতিক অভাব-অনটনের চেয়েও অনেক বড়। হরিদা হয়তো পেশাদারী জীবনে ব্যর্থ হলেন কিন্তু একজন খাঁটি শিল্পী হিসেবে তিনি জয়ী হলেন। গল্পের শেষে তাঁর সেই লজ্জিত হাসি এবং মাত্র আট আনা বকশিশের আশা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের শিল্পীরা দারিদ্র্যকে মেনে নিলেও নিজের শিল্পের সততাকে বিসর্জন দেন না। এভাবেই সুবোধ ঘোষ হরিদার চরিত্রের মধ্য দিয়ে শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং দারিদ্র্যের এক করুণ কিন্তু মহৎ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
বহুরূপী গল্পের নামকরণের সার্থকতা:
সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পটির নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী। একটি সার্থক নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু, কেন্দ্রীয় চরিত্র অথবা গল্পের অন্তর্নিহিত মূল সুরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই গল্পটির ক্ষেত্রেও আমরা দেখি যে 'বহুরূপী' শব্দটি কেবল হরিদার পেশাকেই ইঙ্গিত করে না, বরং এটি শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন লড়াইয়ের এক প্রতীকী প্রকাশ হয়ে উঠেছে। গল্পের নামকরণটি কেন সার্থক, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
গল্পের শুরুতেই আমরা পরিচিত হই হরিদা নামক এক বিচিত্র চরিত্রের মানুষের সঙ্গে। হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী। তাঁর জীবন অতি সাধারণ এবং অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে কাটে। শহরের একটি সংকীর্ণ গলির ছোট ঘরে তিনি বাস করেন। তাঁর উনানে প্রতিদিন চাল ফোটে না, অনেক সময় কেবল জল ফুটিয়েই তাঁকে খিদের জ্বালা মেটাতে হয়। তবুও হরিদার চরিত্রে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়—তিনি একঘেয়ে বাঁধাধরা কাজ পছন্দ করেন না। জীবনের একঘেয়েমিকে দূর করার জন্যই তিনি বহুরূপী পেশাকে বেছে নিয়েছেন। তিনি মাঝে মাঝেই বিচিত্র সাজে সজ্জিত হয়ে রাস্তায় বের হন। কখনও তিনি পাগল সাজেন, কখনও বাইজি, কখনও বা বাউল, কাপালিক কিংবা ফিরিঙ্গি সাহেব। তাঁর এই বহুরূপ ধারণ কেবল জীবিকার প্রয়োজনে নয়, বরং এক সৃজনশীল নেশার মতো। এই প্রেক্ষাপটে গল্পের নামকরণটি প্রথমেই হরিদার পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়।
গল্পের কেন্দ্রীয় ঘটনাটি আবর্তিত হয়েছে হরিদার এক অভাবনীয় ছদ্মবেশকে কেন্দ্র করে। জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত এক উঁচু দরের সন্ন্যাসীর গল্প শোনার পর হরিদার শিল্পীমন যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। তিনি তাঁর বন্ধুদের বলেছিলেন যে এবার তিনি এমন এক কাণ্ড করবেন যাতে তাঁর সারাজীবনের অন্নের সংস্থান হয়ে যাবে। বন্ধুরা ভেবেছিলেন হরিদা হয়তো সাধারণ কোনো ছদ্মবেশে জগদীশবাবুকে তুষ্ট করবেন। কিন্তু গল্পের মূল মোচড় আসে যখন হরিদা 'বিরাগী' সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হন। তাঁর সেই সাজ এবং আচরণ এতটাই নিখুঁত ছিল যে স্বয়ং জগদীশবাবু এবং হরিদার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও তাঁকে চিনতে ব্যর্থ হন। জটাজুটধারী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ সন্ন্যাসী না সেজে তিনি একজন শান্ত, সৌম্য এবং মোহমুক্ত বিরাগী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। এই বিরাগী রূপটিই গল্পের নামকরণের সার্থকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বিরাগী হিসেবে হরিদা যখন জগদীশবাবুর বাড়িতে যান, তখন তাঁর ব্যক্তিত্বে এক অতীন্দ্রিয় জ্যোতি ফুটে ওঠে। জগদীশবাবু ছিলেন ধনবান কিন্তু কিছুটা অহংকারী ব্যক্তি। বিরাগী হরিদা তাঁর সেই দর্প চূর্ণ করেন অত্যন্ত সহজ ভাষায়। বিরাগীর মুখে "পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া!"—এই ধরনের দার্শনিক বাণী শুনে জগদীশবাবু অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি বিরাগীকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান। একজন অতি দরিদ্র মানুষের কাছে সেই সময়ে একশো এক টাকা ছিল এক বিপুল সম্পত্তি, যা দিয়ে তাঁর জীবনের অভাব চিরতরে মুছে যেতে পারত। কিন্তু এখানেই হরিদা তাঁর বহুরূপী সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তিনি অবলীলায় সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ধুলোর মতো সোনাকেও তুচ্ছ করে বিদায় নেন।
গল্পের শেষে যখন বন্ধুরা হরিদাকে তাঁর এই ত্যাগের কারণ জিজ্ঞাসা করেন, তখন হরিদার উত্তর ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি বলেন, "শত হোক, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা-ফাকা কী করে স্পর্শ করি বল? তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়।" এই একটি বাক্যের মধ্যেই 'বহুরূপী' নামকরণের সার্থকতা নিহিত। হরিদার কাছে 'বহুরূপী' কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি একটি শিল্প। একজন শিল্পী যখন কোনো চরিত্র ধারণ করেন, তখন সেই চরিত্রের সত্যতা রক্ষা করাই তাঁর প্রধান ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। হরিদা জানতেন যে টাকাটা নিলে তাঁর দারিদ্র্য ঘুচত ঠিকই, কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা পরাজিত হতো। বিরাগী চরিত্রের পবিত্রতা ও মোহহীনতা রক্ষা করার জন্যই তিনি টাকার মায়া ত্যাগ করেন। অর্থাৎ, তিনি কেবল বাইরে থেকে রূপ পাল্টান না, অন্তরেও সেই চরিত্রের আদর্শকে ধারণ করেন।
গল্পের নামকরণটি 'হরিদা' না হয়ে 'বহুরূপী' হওয়ার পেছনে আরও একটি কারণ থাকতে পারে। হরিদা আসলে আমাদের সমাজের সেইসব শিল্পীদের প্রতিনিধি, যাঁরা অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও নিজেদের শিল্পের আদর্শে অটল থাকেন। গল্পের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, হরিদা আবার তাঁর সাধারণ জীবনে ফিরে এসেছেন এবং জগদীশবাবুর কাছে গিয়ে সামান্য বকশিশ চাওয়ার কথা ভাবছেন। এই বৈপরীত্যই গল্পের ট্র্যাজেডি। একাধারে তিনি বিরাগী সেজে লক্ষাধিক টাকার সম্পত্তি তুচ্ছ করছেন, আবার পরক্ষণেই অভাবের তাড়নায় আট আনা বা দশ আনা বকশিশের আশা করছেন। এই যে বহুরূপী জীবনের নাটকীয়তা এবং বৈচিত্র্য, তাই এই গল্পের মূল উপজীব্য।
উপসংহারে বলা যায়, সুবোধ ঘোষ 'বহুরূপী' শব্দটির মাধ্যমে কেবল একজনের পরিচয় দেননি, বরং মানুষের অন্তরের ঐশ্বর্য এবং শিল্পের নৈতিক জয়ের কথা বলেছেন। হরিদা নামের সাধারণ মানুষটি তাঁর অসাধারণ বহুরূপী সত্তার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে পেটের খিদের চেয়েও শিল্পের মর্যাদা অনেক বড়। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হরিদার বিভিন্ন রূপ এবং তাঁর বিরাগী চরিত্রের চরম উৎকর্ষতা গল্পের ঘটনাপ্রবাহকে সার্থকভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে। নামকরণের মাধ্যমে লেখক সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, একজন বহুরূপী কেবল ছদ্মবেশ ধারণ করেন না, তিনি সেই চরিত্রের জীবনকেও মুহূর্তের জন্য যাপন করেন। তাই বিষয়বস্তু, চরিত্রচিত্রণ এবং শিল্পের নৈতিকতার বিচারে 'বহুরূপী' নামকরণটি সর্বাংশে সার্থক ও সার্থকতা লাভ করেছে।
পরীক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি:
১. "হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে"— হরিদার জীবনের এই নাটকীয় বৈচিত্র্যটি গল্পের আলোকে আলোচনা করো।
২. "খুবই গরিব মানুষ হরিদা"— হরিদার দারিদ্র্যের বর্ণনা দাও। এই দারিদ্র্য সত্ত্বেও তাঁর চরিত্রের কোন বিশেষ দিকটি তোমাকে আকর্ষণ করে?
৩. হরিদার জীবনযাপনের ধরণ কেমন ছিল? কেন তিনি ধরাবাঁধা চাকুরির কাজ পছন্দ করতেন না?
৪. "হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না"— এই অভাবের মধ্যেও হরিদার শিল্পীসত্তা কীভাবে বেঁচে ছিল?
৫. বহুরূপী কাকে বলে? পেশাদার বহুরূপী হিসেবে হরিদার দক্ষতার পরিচয় দাও।
৬. চকের বাস স্ট্যান্ডে পাগল সেজে হরিদা যে কাণ্ড করেছিলেন, তার বর্ণনা দাও।
৭. বাইজি সেজে হরিদার উপার্জনের কাহিনীটি সংক্ষেপে লেখো। ওইদিন তাঁর রোজগার কেমন হয়েছিল?
৮. দয়ালবাবুর লিচু বাগানে হরিদা কীভাবে পুলিশ সেজেছিলেন? মাস্টারমশাই কেন হরিদাকে প্রশংসা করেছিলেন?
৯. বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে হরিদা যখন জগদীশবাবুর বাড়িতে যান, তখন তাঁর রূপ ও পোশাকের বর্ণনা দাও।
১০. "আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়?"— বক্তা কে? তিনি কেন জগদীশবাবুকে এই কথা বলেছিলেন?
১১. বিরাগী হরিদার মুখে পরম সুখের যে সংজ্ঞা শোনা গিয়েছিল, তা সংক্ষেপে লেখো।
১২. "সাতদিন হলো এক সন্ন্যাসী এসে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন"— সেই সন্ন্যাসীর পরিচয় দাও। তাঁর বিদায়কালীন ঘটনাটি কী ছিল?
১৩. "অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না"— হরিদার 'ভুল' কোনটি ছিল? কেন একে ভুল বলা হয়েছে?
১৪. "তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়"— এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে হরিদার চরিত্রের কোন সত্যটি ফুটে উঠেছে?
১৫. "মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার"— হরিদার এই সংকল্পের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?
১৬. জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা হরিদা কেন অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করলেন?
১৭. "খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?"— এই আক্ষেপের মধ্য দিয়ে শিল্পীর জীবনের কোন ট্র্যাজেডি ধরা পড়েছে?
১৮. 'বহুরূপী' গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
১৯. "গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা"— কোন গল্পের কথা বলা হয়েছে? গম্ভীর হয়ে হরিদা কী পরিকল্পনা করেছিলেন?
২০. জগদীশবাবুর চরিত্রটি গল্পে কীভাবে ফুটে উঠেছে? বিরাগী হরিদার সামনে তাঁর আচরণ কেমন ছিল?
২১. "বড় চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা"— সন্ধ্যার স্নিগ্ধতার সঙ্গে বিরাগী হরিদার আগমনের সম্পর্কটি ব্যাখ্যা করো।
২২. "আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনি অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি"— উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
২৩. হরিদার ঘরের আড্ডায় যে চারজন বন্ধু আসতেন, তাঁদের সঙ্গে হরিদার সম্পর্কের পরিচয় দাও।
২৪. বিরাগী সেজে হরিদা জগদীশবাবুকে কী কী উপদেশ দিয়েছিলেন?
২৫. গল্পের শেষ দৃশ্যে হরিদার যে লজ্জিত হাসির কথা আছে, তা কেন পাঠকের মনকে স্পর্শ করে?
২৬. সমাজের অবহেলিত শিল্পীদের প্রতিনিধি হিসেবে 'হরিদা' চরিত্রটির গুরুত্ব আলোচনা করো।
২৭. ছোটগল্প হিসেবে 'বহুরূপী' কতখানি সার্থক তা বুঝিয়ে দাও।
২৮. "সে কি সত্যিই হরিদা?"— বন্ধুদের এই বিস্ময়ের কারণ কী ছিল?
২৯. হরিদার বিভিন্ন রূপের মধ্যে 'বিরাগী' রূপটি কেন শ্রেষ্ঠ? তোমার মতামত দাও।
৩০. "বাঃ, এ তো বেশ মজার ব্যাপার!"— কোন বিষয়টিকে হরিদা 'মজার ব্যাপার' বলেছিলেন এবং কেন?
Popular Posts
-
[ বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ebanglaschools এর সমস্ত আলোচনা কোনো পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নয়। সাধারণ এবং অতি সাধারণ পিছিয়ে পড়া ছাত্র ছাত্রীদের জন্যই ...
-
অভিষেক মাইকেল মধুসূদন দত্ত কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী ইন্দ্রজিৎ, প্রণমিয়া ধাত্রীর চরণে, কহিলা,— “কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজ...
-
[ বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ebanglaschools এর সমস্ত আলোচনা কোনো পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নয়। সাধারণ এবং অতি সাধারণ পিছিয়ে পড়া ছাত্র ছাত্রীদের ...
-
আকাশে সাতটি তারা জীবনানন্দ দাশ আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে। বসে থাকি; কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতাে ...
-
তিন পাহাড়ের কোলে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্ধকারে তিনপাহাড়ে ট্রেনের থেকে নেমে , হাওয়া বিলাসী তিন ...
-
নীলধ্বজের প্রতি জনা মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাজিছে রাজ-তোরনে রণবাদ্য আজি; হ্রেষে অশ্ব; গর্জ্জে গজ; উড়িছে আকাশে রাজকেতু; মুহুর্মুহুঃ হ...
-
নিমগাছ বনফুল কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ। কেউ বা ভাজছে গরম তেলে। খোস দাদ হাজা চুলকুনিতে...
Labels
Blog Archive
-
▼
26
(10)
-
▼
May
(10)
- পোস্টমাস্টার গল্পের বহুনির্বাচনী প্রশ্নোত্তর (MCQ)
- পোস্টমাস্টার (মূল গল্প): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- অদল বদল গল্পের সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- অদল বদল (মূল গল্প): পান্নালাল প্যাটেল
- আলোবাবু গল্পের সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- আলোবাবু (মূল গল্প): বনফুল
- বহুরূপী : সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- বহুরূপী (মূল গল্প): সুবোধ ঘোষ
- জ্ঞানচক্ষু গল্পের সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- জ্ঞানচক্ষু: আশাপূর্ণা দেবী
-
▼
May
(10)