আলোবাবুঃ বনফুল
সবাই তাঁকে আলুবাবু বলত, কিন্তু তাঁর আসল নাম আলো। চেহারা অবশ্য নামের
উপযুক্ত নয়। গায়ের রং কুচকুচে কালো, মুখটি
বেগুন-পোড়ার মতো, তাঁর উপর কালো
গোঁফ-দাড়ি, যুগ্ম-ভ্রু, মাথায় ঘাড় পর্যন্ত লম্বা বাবরি চুল। গলায়
তুলসীর মালা, সেটিও কালো হয়ে
গেছে। পরনের থানখানি অবশ্য ধপধপে সাদা। গায়ের চাদরখানিও সাদা। আলুথালু জামা গায়ে
দিতেন না, জুতোও পরতেন না।
একদিন সকালে আমার বৈঠকখানায় ঢুকে নমস্কার করে কাঁচুমাচু হয়ে
দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই দিনই প্রথম দেখলাম তাঁকে।
কী চাই আপনার?
অনুগ্রহ করে একটু সাহায্য করবেন আমাকে?
সাহায্যপ্রার্থী অনেক আসে, অধিকাংশ লোকই টাকা চায়, ভাবলাম ইনিও বোধ হয় সেই দলের, মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম, কিন্তু মুখ ফুটে বিরক্তি প্রকাশ করতে পারলাম
না। বরং বললাম, অসম্ভব না হলে
নিশ্চয়ই করব। বলুন, কী করতে হবে।
তাঁর বাঁ হাতে একটি ছোটো থলি ছিল। তার ভিতর হাত ঢুকিয়ে তিনি
একটি ছোটো পাখির ছানা বার করলেন।
একটা ছোঁড়া এই পাখির ছানাটার পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে টেনে নিয়ে
বেড়াচ্ছিল। আমি দু আনা পয়সা দিয়ে বাচ্চাটা নিয়ে নিয়েছি তার কাছ থেকে। মনে হচ্ছে এর
পায়ে লেগেছে, পায়ে দড়ি বেঁধে
টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছিল কিনা, একটু দেখবেন দয়া
করে? শুনেছি আপনি বড়ো
ডাক্তার।
দেখলাম পাখির ছানাটিকে। পায়ে সত্যিই লেগেছিল। টিংচার আয়োডিন
লাগিয়ে বেঁধে দিলাম।
কী করবেন এটাকে নিয়ে, পুষবেন?
না। ভালো হলে ছেড়ে দেবো। জীবন্ত কোনো জিনিস পোষবার সামর্থ্য
নেই আমার। ইচ্ছে করে খুব, কিন্তু পয়সা নেই।
সেই জন্যে বিয়েও করিনি।
কুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলে একটু হেসে চাইলেন আমার দিকে।
ও। এর আগে তো দেখিনি আপনাকে, কোথায় থাকেন?
অবিনাশবাবুর বাড়িতে। দিন সাতেক হলো এসেছি।
আর একবার কুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলে চাইলেন। অবিনাশবাবু এখানকার
নামজাদা উকিল একজন। অবিনাশবাবুদের সঙ্গে আত্মীয়তা আছে বুঝি?
না, তেমন কিছু নয়।
আমার এক দূর-সম্পর্কের ভাগনীর বন্ধুর শ্বশুর উনি। আসলে লোক খুব ভালো। তাই দয়া করে
থাকতে দিয়েছেন। আলোবাবু পাখির ছানাটি নিয়ে চলে গেলেন।
দিন কয়েক পরে অবিনাশবাবুর বাড়ি যেতে হয়েছিল। সেখানে আলোবাবুর
সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল। দেখলাম তিনি একটি দিশি কুকুরের বাচ্চার পরিচর্যায়
নিযুক্ত হয়ে আছেন। আমাকে দেখেই এক মুখ হেসে বললেন, বিনুবাবুর কুকুর এটি। কুকুর পোষার শখ আছে
কিন্তু সেবা করতে জানেন না, দুটো চোখে এতক্ষণ
পিচুটি ভরতি ছিল, তুলো ভিজিয়ে
পরিষ্কার করলুম। আর কুকুরকে সারাক্ষণ বেঁধে রাখলে কি চলে? ওদের সঙ্গে খেলা করতে হয়-
কুকুরটার দিকে চেয়ে তার মুখের সামনে টুসকি দিতে লাগলেন।
ল্যাজ নেড়ে নেড়ে খেলা করতে লাগল কুকুরটা। বিনু অবিনাশের ছেলে, বয়স দশ বছর।
অবিনাশবাবুর সঙ্গে দেখা হলো একটু পরে।
বললাম, আপনার এই
আলোবাবু লোকটি তো অদ্ভুত ধরনের মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, অদ্ভুতই।
স্নেহের কাঙাল বেচারা। গরিবও খুব। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে নাকি?
হ্যাঁ, এক
পাখি-পেশেন্ট নিয়ে গিয়েছিলেন আমার কাছে।
দেখবেন তো, যদি ওর
চাকরি-বাকরি জুটিয়ে দিতে পারেন কোথাও। সেবা করতে বড়ো ভালোবাসে, বিশেষত সেবার পাত্র বা পাত্রী যদি অসহায় হয়---
দিন কতক পরে সিভিল সার্জনের সঙ্গে দেখা হলো। একসঙ্গে কলেজে
পড়েছিলুম। কথায় কথায় আলোবাবুর কথা উঠে পড়ল। সিভিল সার্জন বললে, এখানকার হাসপাতালে ওকে প্রবেশনার ড্রেসার করে
ঢুকিয়ে নিতে পারি। তবে দশ টাকার বেশি এখন পাবে না। পরীক্ষায় পাশ করলে তখন মাইনে
বাড়বে আলোবাবু হাসপাতালের আউট-ডোরে রোগীদের ঘা ধোয়াতে লাগলেন। মাসখানেক পরেই
কিন্তু চাকরিটি গেল তাঁর। একদিন আমার ল্যাবরেটরিতে এসে শুল্ক মুখে বসে আছেন।
কী খবর -
আমাকে দূর করে দিলে।
কেন?
একটা লোকের পায়ের ঘা কিছুতেই সারছিল না। সে-ই আমাকে একটা
ওষুধ দেখিয়ে দিয়ে বললে, ওই ওষুধটা দাও
তাহলে সেরে যাবে। ওটা লাগিয়ে অনেকের নাকি সেরে গেছে। দিলুম ওষুধটা লাগিয়ে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে লোকটা চিৎকার শুরু করে দিলে, সে এক হৈ-হৈ ব্যাপার। ডাক্তারবাবু এলেন, তিনি তো চটেই লাল, বললেন, কার
হুকুমে তুমি ঘায়ে কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছ! আমি আর কী বলব, চুপ করে রইলাম। ডাক্তারবাবু আমাকে দূর করে
দিলেন। আমি ওর ভালোর জন্যেই ওষুধটা দিয়েছিলাম আর ওর কথাতেই দিয়েছিলাম-
আমি চুপ করে রইলাম, কী আর
বলব। সত্যিই অন্যায় কাজ করেছেন।
কিছুক্ষণ বসে থেকে আলোবাবু চলে গেলেন।
কষ্ট হতে লাগল ভদ্রলোকের জন্য, কিন্তু কী করব ভেবে পেলাম না।
দিন কয়েক পরে অবিনাশবাবুর বাড়ি থেকেও বিদায় নিতে হলো
আলোবাবুকে। শুনলাম অবিনাশবাবুর স্ত্রী দূর করে দিয়েছেন তাঁকে। আলোবাবু যা করেছিলেন
তা কোনও মা সহ্য করতে পারেন না। তিনি এক বগলে কুকুরের বাচ্চাটা এবং আর এক বগলে
অবিনাশবাবুর শিশু-পুত্র তিনুকে নিয়ে একবার কুকুরটার মুখে আর সঙ্গে সঙ্গে তিনুর
মুখে চুমু খাচ্ছিলেন।
অবশেষে আমিই আশ্রয় দিলাম আলোবাবুকে।
একদিন সন্ধের পর এসে দেখলাম তিনি একটা সোলার হ্যাট বাজিয়ে
গুন গুন করে গান গাইছেন।
আপনি গান-বাজনা জানেন নাকি কুণ্ঠিতমুখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
এককালে ডুগি-তবলা বাজাতে পারতাম। দৈন্যের দায়ে সব বেচে দিতে
হয়েছে। এখন হ্যাট বাজাই বলা বাহুল্য, খুব
কৌতুক অনুভব করলাম।
হ্যাট পেলেন কোথেকে -
অনেক আগে স্যুটও পরতাম। সব গেছে, ওই হ্যাটটি আছে কেবল।
আলোবাবুর আরও পরিচয় পেলাম দিন কয়েক পর। একদিন দেখি তিনি
ছুটতে ছুটতে আসছেন।
কী হলো, ছুটছেন
কেন---
দশটা বেজে গেছে আমার ঘড়িতে দম দেওয়া হয়নি এখনও। রামবাবুর
গাইটার বাচ্চা হয়েছে শুনে দেখতে গিয়েছিলাম, হঠাৎ
শুনতে পেলাম তাঁর বৈঠকখানার ঘড়িতে টং টং করে দশটা বেজে গেল। তখুনি ছুটলাম, আমার ঘড়িতে ঠিক দশটার সময় দম দিই। আমাদের যেমন
খাবার, ঘড়ির তেমনি দম, বেচারির খেতে দেরি হয়ে গেল আজকে।
তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লেন নিজের ঘরে। আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম।
আলোবাবুর যে ঘড়ি আছে তা জানতাম না। তাঁর পিছু পিছু এসে একটু আড়াল থেকে দেখতে
লাগলাম। দেখলাম ঘরে ঢুকেই তিনি নিজের ভাঙা তোরঙ্গটা খুললেন। তার ভেতর থেকে বার
করলেন একটি ছোটো টিনের বাক্স। বাক্সের ভিতর থেকে একটা ন্যাকড়ার ছোটো পুঁটুলির মতন
কী বার করলেন। ন্যাকড়াটি খুলতেই লালরঙের শালুর পুটুলি বেরিয়ে পড়ল। সেটি খুললেন।
বেরুল রেশমি ন্যাকড়ার পুঁটুলি, সেটি
খুলতেই বের হলো খানিকটা তুলো, তারপর
ছোট্ট ঘড়িটি। তিন পুরু কাপড়-ঢাকা ঘড়িটিকে আঙুলের মতো রাখতেন তিনি সযত্নে। ঘড়িটি
বার করে চাপটালি খেয়ে বসলেন, তারপর চোখ বুজে
ধীরে ধীরে দম দিতে লাগলেন। মনে হলো যেন পুজো করছেন।
অবিনাশবাবুর কথাটা মনে পড়ল। স্নেহের কাঙাল বেচারা! জীবনে
কিন্তু ভালোবাসার সুযোগ পাচ্ছে না কোথাও। সব স্নেহ তাই উজাড় করে দিয়েছে বোধহয়
ঘড়িটির উপর।
একদিন ল্যাবরেটরি থেকে ফিরে দেখি, আলোবাবু হ্যাট বাজিয়ে তারস্বরে গান গাইছেন।
দুটো লাইনই বার বার গাইছেন আমায় ওরা সইলো না কেউ/আমার কাছে রইলো না কেউ-
আমি খনিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম অবাক হয়ে। এমন গলা ছেড়ে গান
গাইতে শুনিনি কখনও তাঁকে। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থেমে গেলেন তিনি।
আজ এত জোরে গান গাইছেন যে!
এমনি।
তারপর আমার দিকে চেয়ে কুণ্ঠিত হাসি হেসে বললেন, আমার ঘড়িটা চুরি হয়ে গেছে। ঠিক সময় হয়তো ভালো
করে দম দিতে পারবে না-
টপ-টপ করে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা।
আলোবাবু এখন পাগলা গারদে আছেন।
সমাজের সঙ্গে নিজেকে তিনি খাপ খাওয়াতে পারলেন না কিছুতে।
0 comments:
Post a Comment