জ্ঞানচক্ষু গল্পের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর


১. "তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল।" — কার চোখ কেন মার্বেল হয়ে গিয়েছিল? এর মাধ্যমে তার কোন উপলব্ধির কথা বলা হয়েছে? (১+২+২)

উঃ আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিশোর তপনের চোখ বিস্ময়ে মার্বেল বা গোল গোল হয়ে গিয়েছিল।

তপন আগে জানত না যে লেখকরা সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ হতে পারেন। তার ধারণা ছিল লেখকরা হয়তো ভিনগ্রহের কোনো জীব বা অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা। কিন্তু তার নতুন মেসোমশাইকে দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। মেসোমশাই একজন লেখক, তাঁর বই ছাপা হয়, অথচ তিনি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খাবার বেশি হলে তুলে রাখতে বলেন, স্নান করেন এবং ঘুমোন। এমনকি তিনি ছোটোমামা বা মেজোকাকুদের মতো খবরের কাগজ নিয়ে তর্ক করেন এবং অবসর সময়ে সিনেমা দেখতে বা বেড়াতে যান। এই সাধারণত্বই তপনকে অবাক করেছিল।

এর মাধ্যমে তপনের প্রথম ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচনের কথা বলা হয়েছে। তপন উপলব্ধি করতে পারে যে, লেখক হতে গেলে অতিপ্রাকৃত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার মেসোমশাই যদি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে লেখক হতে পারেন, তবে তপনের লেখক হতে কোনো বাধা নেই। এই নতুন ধারণাটি তার চিরাচরিত সংস্কারকে ভেঙে দেয় এবং তার মধ্যে সৃজনশীলতার এক নতুন জগত খুলে দেয়। সে বুঝতে পারে, তার চারপাশের সাধারণ জগৎ ও মানুষের অভিজ্ঞতা থেকেই সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব।

২. "রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই।" — কথাটির প্রেক্ষাপট আলোচনা করো। এখানে ‘রত্ন’ ও ‘জহুরি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? (৩+২)

উঃ বিয়ের ছুটিতে মামার বাড়িতে থাকাকালীন তপন একাসনে বসে আস্ত একটি গল্প লিখে ফেলেছিল। সেই গল্পটি সে তার প্রিয় ছোটোমাসিকে দেখালে মাসি সেটি নতুন মেসোমশাইয়ের হাতে তুলে দেয়। তপন মুখে আপত্তি জানালেও মনে মনে চেয়েছিল যে তার মেসোমশাই যেন গল্পটি পড়েন। কারণ মেসোমশাই একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং কলেজের অধ্যাপক। তপন মনে করেছিল, সাধারণ মানুষ গল্পের মর্ম না বুঝলেও একজন প্রকৃত লেখক ঠিকই তার লেখার মান বুঝতে পারবেন। এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই আলোচ্য উক্তিটির অবতারণা করা হয়েছে।

এখানে ‘রত্ন’ বলতে কিশোর তপনের কাঁচা হাতের লেখা কিন্তু মৌলিক একটি গল্পকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘জহুরি’ বলতে তার নতুন মেসোমশাইকে বোঝানো হয়েছে। জহুরি যেমন হিরে বা রত্ন চিনতে ভুল করে না, তপনও আশা করেছিল যে তার লেখক মেসোমশাই তার গল্পের আসল মূল্যটি খুঁজে পাবেন। তপনের চোখে মেসোমশাই ছিলেন সাহিত্যের বিচারক, যিনি তার প্রতিভার প্রকৃত মর্যাদা দিতে সক্ষম। এই ধারণা থেকেই মেসোকে জহুরির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

​৩. "তপন আহ্লাদে কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়।" — তপনের আহ্লাদের কারণ কী? মেসোমশাই তার গল্পটি নিয়ে কী বলেছিলেন? (২+৩)

উঃ তপনের আহ্লাদে কাঁদো কাঁদো হওয়ার মূল কারণ ছিল তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের স্বীকৃতি পাওয়া। তার লেখা প্রথম গল্পটি যখন একজন ‘সত্যিকার লেখক’ অর্থাৎ মেসোমশাইয়ের হাতে পৌঁছায় এবং তিনি সেটি পড়ে প্রশংসা করেন, তখন তপনের আনন্দ আর ধরে না। একজন নবীন প্রতিভার কাছে যখন তার আদর্শস্থানীয় কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে স্বীকৃতির আশ্বাস আসে, তখন তার আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেই মুহূর্তের গর্ব ও কৃতজ্ঞতাতেই তপন আপ্লুত হয়ে পড়েছিল।

​মেসোমশাই তপনের গল্পের প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তার লেখাটি বেশ ভালো হয়েছে। তবে তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন—গল্পটি কিছুটা ‘কারেকশন’ বা সংশোধন করতে হবে। মেসোমশাই বলেছিলেন, "তপন, তোমার গল্প তো দিব্যি হয়েছে। একটু ‘কারেকশান’ করে ইয়ে করে দিলে ছাপতে দেওয়া চলে।" তিনি আরও আশ্বাস দিয়েছিলেন যে সন্ধ্যাতারা পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকায় তিনি বললে সম্পাদক গল্পটি ফিরিয়ে দেবেন না। মেসোর এই অভিভাবকসুলভ উৎসাহ এবং গল্পটি ছাপানোর প্রতিশ্রুতিই তপনকে চরমভাবে আলোড়িত করেছিল।

​৪. "ওর হবে।" — কার সম্পর্কে কেন এই মন্তব্য? মেসোমশাই তপনের গল্পের কোন বিশেষত্বের কথা বলেছিলেন? (১+২+২)

উঃ নতুন মেসোমশাই কিশোর তপনের সাহিত্য প্রতিভা সম্পর্কে এই ইতিবাচক মন্তব্যটি করেছিলেন।

সাধারণত কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েরা যখন গল্প লিখতে যায়, তখন তারা কাল্পনিক বা অতি নাটকীয় বিষয়বস্তু বেছে নেয়। তারা হয় রূপকথার মতো রাজা-রানির গল্প লেখে, নতুবা খুন, জখম, দুর্ঘটনা কিংবা নিদারুণ দারিদ্র্যের মতো বিষয় নিয়ে লেখে যা তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে। কিন্তু তপন এই প্রথাগত পথে না গিয়ে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করেছিল। সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিনের অভিজ্ঞতা এবং তার সেই সময়ের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা গল্পে লিখেছিল। মেসোমশাই তপনের এই মৌলিকতা দেখেই মন্তব্যটি করেছিলেন।

​মেসোমশাই তপনের গল্পের বিশেষত্ব হিসেবে বলেছিলেন যে তার মধ্যে সাহিত্যিকের ‘চোখ’ এবং ‘হাত’ দুইই আছে। তার মতে, গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনে তপন যে পরিপক্বতা দেখিয়েছে তা প্রশংসাযোগ্য। কাল্পনিক জগতের বদলে নিজের বাস্তব অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা তপনের আছে, যা একজন প্রকৃত লেখকের লক্ষণ। এই বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই তপনের গল্পকে অন্য দশজন কিশোরের লেখা থেকে আলাদা করেছিল।

​৫. "পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে?" — ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কেন এটি তপনের কাছে অলৌকিক মনে হয়েছে? (২+৩)

উঃ ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে অলৌকিক ঘটনা বলতে তপনের নিজের লেখা গল্পটি একটি নামী পত্রিকা ‘সন্ধ্যাতারা’-র পাতায় ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের কাছে তার নাম ও তার গল্প পৌঁছে যাবে, এই অভাবনীয় ঘটনাই ছিল তার কাছে ‘অলৌকিক’। নিজের সৃজনশীলতা যে একদিন বাস্তব রূপ নিয়ে মানুষের হাতে হাতে ঘুরবে, এটি একজন সাধারণ কিশোরের কাছে বিস্ময়কর প্রাপ্তি ছিল।

​তপনের কাছে এটি অলৌকিক মনে হওয়ার কারণ হলো তার আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট। সে নিজেকে একজন নগণ্য এবং সাধারণ কিশোর বলে মনে করত। তার মতো একজন ছেলের লেখা গল্প যে কোনো বড় পত্রিকার সম্পাদক গুরুত্ব দিয়ে ছাপাবেন, এটা তার কল্পনার অতীত ছিল। সূচিপত্রে যখন সে নিজের নাম দেখল— "প্রথম দিন (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়"—তখন তার মনে হলো যেন কোনো অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের আকস্মিকতা এবং তার লেখক সত্তার এই নাটকীয় স্বীকৃতিই তার কাছে মিরাকল বা অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল।

​৬. "তপন যেন কোথায় হারিয়ে যায় এইসব কথার মধ্যে।" — ‘এইসব কথা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কেন তপন হারিয়ে যায়? (৩+২)

উঃ তপনের বাড়িতে তার গল্প ছাপা হওয়ার পর এক উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে সেই আলোচনায় তপনের প্রতিভার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল মেসোমশাইয়ের ‘দয়া’ ও ‘মহত্ত্ব’। মেসোমশাই যে তপনের গল্পটি সংশোধন করে দিয়েছেন এবং নিজে গিয়ে সম্পাদকের হাতে দিয়ে এসেছেন, সেই কথাই বারবার বাড়ির বড়দের মুখে ঘুরছিল। "মেসো না থাকলে তপনের গল্প কেউ ছুঁয়েও দেখত না"—এই ধরনের তাচ্ছিল্যপূর্ণ প্রশংসাসূচক আলোচনাকেই এখানে ‘এইসব কথা’ বলা হয়েছে।

​তপন এই ভিড়ের মধ্যে নিজেকে একা ও অবহেলিত অনুভব করে হারিয়ে যায়। সে চেয়েছিল তার মৌলিক সৃজনশীলতা নিয়ে আলোচনা হোক, সবাই তার লেখনীর প্রশংসা করুক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কৃতিত্বের সিংহভাগ চলে গেছে মেসোমশাইয়ের ঝুলিতে। বাড়ির লোকের কাছে সে মেসোর দয়ার পাত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়ে। নিজের সৃষ্টির অপমান এবং নিজের পরিচিতি হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায় তপন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তাই সে নিজেকে এই কলরবের মধ্যে খুঁজে পায় না।

​৭. "মেসোমশাইয়ের উপযুক্ত কাজ হবে সেটা।" — মেসোমশাইয়ের উপযুক্ত কাজ কোনটি? কেন মাসি এমন কথা বলেছিল? (২+৩)

উঃ ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পে তপনের ছোটোমাসি মনে করেছিল, তপনের লেখা গল্পটি মেসোমশাই যদি নিজের উদ্যোগে কোনো নামী পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, তবে সেটিই হবে তাঁর মতো একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের ‘উপযুক্ত কাজ’। মেসো একজন লেখক এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, তাই একজন নতুন প্রতিভাকে উৎসাহিত করা তাঁর সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে—এটাই ছিল মাসির ভাবনা।

​মাসি এই কথাটি বলেছিল প্রধানত তপনের ওপর তার মেসোর প্রভাব এবং মেসোর ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস থেকে। মাসি জানত মেসো বড় বড় সম্পাদকদের চেনেন। সে চেয়েছিল মেসো যেন নতুন বিয়ের আত্মীয় হিসেবে তপনকে একটু সাহায্য করেন। মাসির কাছে এটা ছিল একাধারে তপনের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বামীর লেখক পরিচয়ের গৌরব প্রচারের একটি সুযোগ। সে ভেবেছিল মেসো যদি গল্পটি ছাপিয়ে দেন, তবে তা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মেসোর প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করবে এবং তপনেরও অনেক বড় উপকার হবে।

​৮. "সূচিপত্রেও নাম রয়েছে।" — সূচিপত্রে কী লেখা ছিল? এটি দেখে তপনের মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল? (২+৩)

উঃ সন্ধ্যাতারা পত্রিকার সূচিপত্রে লেখা ছিল: ‘প্রথম দিন (গল্প) শ্রীতপন কুমার রায়’। সূচিপত্রে নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখা যে কোনো লেখকের কাছে এক স্মরণীয় মুহূর্ত। তপনের ক্ষেত্রেও তার পূর্ণ নাম এবং গল্পের নাম সুনির্দিষ্টভাবে ছাপা হয়েছিল।

​এটি দেখে তপনের মধ্যে এক তীব্র উত্তেজনা ও আবেগের সংঘাত শুরু হয়েছিল। প্রথমে তার বুকের রক্ত ছলকে ওঠে, অর্থাৎ সে প্রচণ্ড আনন্দ ও বিস্ময় অনুভব করে। তার মনে হয় আজ তার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন। কিন্তু পরক্ষণেই যখন বাড়ির লোকেদের আলোচনা এবং মেসোর ‘কারেকশন’-এর কথা বারবার সামনে আসতে থাকে, তখন সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। নিজের নামের পাশে অন্যের কলমের কারুকার্য মিশে থাকার গ্লানি তাকে ভেতর থেকে বিদ্ধ করতে থাকে। গর্বের মুহূর্তেও এক গভীর হীনম্মন্যতা ও অপমানবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।

​৯. "তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে।" — তপনের পড়তে না পারার কারণ কী? এই অবস্থায় তার মানসিক যন্ত্রণা বর্ণনা করো। (৩+২)

উঃ তপন যখন তার নিজের লেখা গল্পটি সবার সামনে জোরে পড়তে শুরু করে, তখন সে এক মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি হয়। সে দেখে গল্পের প্রতিটি লাইন বদলে গেছে। মেসোমশাই গল্পটি সংশোধন করার নামে নিজের পাকা হাতের কলমে এমনভাবে নতুন করে লিখেছেন যে, সেখানে তপনের নিজস্ব শব্দ বা ভাবনার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। অন্যের লেখা শব্দগুলো নিজের নামে পড়তে গিয়ে তপন কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে যায় এবং সে আর এগিয়ে যেতে পারে না।

​তপনের এই মানসিক যন্ত্রণা ছিল গভীর অপমানের। সে অনুভব করেছিল তার সৃষ্টিকে খুন করা হয়েছে। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির যে ‘রত্ন’ সে মেসোকে দিয়েছিল, মেসো তা পাল্টে দিয়েছেন। নিজের নামে প্রকাশিত গল্পে নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার যে হাহাকার, তা তাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। সে এক চরম আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে। বাড়ির লোকেদের কাছে সে লজ্জিত হয় কারণ সে জানে যে সে যা পড়ছে তা তার নিজের নয়। এই প্রতারণা ও মেসোর তথাকথিত ‘দয়া’ তাকে বোবা করে দিয়েছিল।

​১০. "আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন।" — কোন দিনটি এবং কেন তপনের কাছে দুঃখের দিন ছিল? (১+৪)

উঃ যে দিন তপনের লেখা গল্প ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে তার হাতে এসেছিল, সেই দিনটির কথাই এখানে বলা হয়েছে। সাধারণ বিচারে এই দিনটি তার সাফল্যের দিন হওয়ার কথা থাকলেও তপনের কাছে তা ছিল চরমতম কষ্টের দিন।

​এর প্রধান কারণ হলো মেসোমশাইয়ের গল্পের আমূল পরিবর্তন। তপন নিজের লেখা পড়তে গিয়ে দেখে সেটি সম্পূর্ণ নতুনের মতো হয়ে গেছে। প্রতিটি লাইন তার কাছে অপরিচিত ঠেকে। তার সৃজনশীলতার কোনো ছাপ সেখানে ছিল না। দ্বিতীয়ত, বাড়িতে তার গল্পের গুণের চেয়ে মেসোর করুণা নিয়ে বেশি চর্চা হচ্ছিল। বাবা ও মেজোকাকু বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন যে মেসো না থাকলে তপনের কপালে ছাপা হওয়া জুটত না। নিজের সৃষ্টির মৌলিকতা হারিয়ে ফেলা এবং অন্যের দাক্ষিণ্যের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়া—এই দ্বিবিধ অপমান তপনকে গভীরভাবে বিদ্ধ করেছিল। সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিঃস্ব ও পরজীবী মনে হওয়ায় দিনটি তার কাছে সবচেয়ে দুঃখের দিন হয়ে ওঠে।

​১১. "তপন কুমার রায়ের লেখা গল্প, হাজার-হাজার ছেলের হাতে হাতে ঘুরবে?" — এই ভাবনার মধ্য দিয়ে তপনের কোন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়? শেষ পর্যন্ত তার এই আশা পূর্ণ হয়েছিল কি? (৩+২)

উঃ এই ভাবনার মধ্য দিয়ে একজন কিশোর লেখকের যশোপ্রার্থনা এবং নিজের সৃষ্টির স্বীকৃতির জন্য তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়। তপন চেয়েছিল তার নাম ও ভাবনা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। মুদ্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে নিজের কল্পনাকে স্থায়ী রূপ দান করা এবং সমাজের কাছ থেকে ‘লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যে সহজাত বাসনা থাকে, তপনের এই ভাবনায় সেই স্বপ্নই প্রতিফলিত হয়েছে। সে চেয়েছিল তার লেখা পড়ে অন্য কিশোররা অনুপ্রাণিত হোক এবং সে এক বিশিষ্ট সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক।

​শেষ পর্যন্ত তপনের এই আশা আংশিকভাবে পূর্ণ হলেও মানসিকভাবে তা ব্যর্থ হয়েছিল। গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল এবং মানুষের হাতে হাতেও পৌঁছেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই লেখার মধ্যে তপনের আসল পরিচয় ছিল না। মেসোমশাইয়ের ‘কারেকশন’-এর ফলে গল্পটি আর তপনের থাকেনি। তার নাম ছাপার অক্ষরে থাকলেও, মনের দিক থেকে সে নিজেকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। নিজের সৃষ্টির মৌলিকতা হারিয়ে যাওয়ার ফলে এই প্রাপ্তি তার কাছে অর্থহীন ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল।

​১২. "এ দেশের কিছু হবে না।" — উক্তিটি কার? কেন তিনি এমন কথা বলেছেন? উক্তিটির মাধ্যমে মেসোমশাইয়ের চরিত্রের কোন দিক ফুটে ওঠে? (১+২+২)

উঃ আলোচ্য উক্তিটি তপনের নতুন মেসোমশাইয়ের।

তিনি খবরের কাগজের বিভিন্ন খবর পড়েন এবং সেইসব খবরের ওপর ভিত্তি করে তর্কে মেতে ওঠেন। দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির সমালোচনায় সরব হয়ে তিনি এক ধরনের নিস্পৃহ ও হতাশাগ্রস্ত সিদ্ধান্ত নেন যে এই দেশের উন্নতি হওয়া সম্ভব নয়। এই ধরনের মন্তব্য সাধারণত তথাকথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির লোকেরা করে থাকেন যারা সমস্যার গভীরে না গিয়ে কেবল উপরিস্তরের সমালোচনাতেই আনন্দ পান। দেশের প্রতি এক ধরনের উন্নাসিক অবজ্ঞা থেকেই তিনি এমন কথা বলেছেন।

​এই উক্তির মাধ্যমে মেসোমশাইয়ের চরিত্রের ‘ছদ্ম-বুদ্ধিজীবী’ ও অবাস্তববাদী দিকটি ফুটে ওঠে। তিনি নিজেকে অনেক বড় সমাজ সচেতন হিসেবে জাহির করতে চান, কিন্তু বাস্তবে তিনি সমস্যার সমাধান না খুঁজে সিনেমার বিনোদন বা ভ্রমণে মত্ত থাকতে ভালোবাসেন। তাঁর এই মন্তব্য গভীর দেশপ্রেম থেকে নয়, বরং এক ধরনের আভিজাত্যবোধ ও অলস মানসিকতা থেকে উৎসারিত। তিনি সব কিছুর মধ্যেই খুঁত খুঁজে বের করেন, যা পরবর্তীতে তপনের গল্পের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।

​১৩. "গল্প ছাপা হলে যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না।" — তপন কেন আহ্লাদ খুঁজে পায় না? বাড়ির বড়দের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? (৩+২)

উঃ তপনের আহ্লাদ হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল তার প্রকাশিত গল্পের ‘পরকীয়া’ রূপ। সে চেয়েছিল নিজের কাঁচা কিন্তু অকৃত্রিম লেখাটি ছাপার অক্ষরে দেখতে। কিন্তু মেসোমশাই গল্পটির প্রতিটি বাক্য বদলে দিয়েছেন। অন্যের লেখা লাইনগুলো নিজের নামে পড়তে গিয়ে তপন লজ্জিত হয়। নিজের সৃষ্টির ওপর অন্যের কর্তৃত্ব তার মনকে বিষিয়ে দেয়। এছাড়া সবাই যখন মেসোর দয়ার কথা বারবার বলে, তখন তপনের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব ধুলোয় মিশে যায়। এই মানসিক গ্লানিই তার আহ্লাদ কেড়ে নিয়েছিল।

​বাড়ির বড়দের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত নিরুৎসাহব্যঞ্জক ও ব্যঙ্গাত্মক। বাবা টিপ্পনি কেটেছিলেন যে মেসো যখন ছাপিয়ে দিয়েছে তখন আর কথা নেই। মেজোকাকু আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন যে অমন মেসো থাকলে তিনিও লেখক হওয়ার চেষ্টা করতেন। কেউ তপনের লেখার প্রশংসা করার চেয়ে মেসোমশাইয়ের ‘মহত্ত্ব’ ও ‘সংশোধন’-এর ওপর বেশি জোর দিচ্ছিলেন। বড়দের এই অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ তপনের শিশুমনকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।

​১৪. "তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে।" — তপনের পড়তে না পারার কারণ কী? এই অবস্থায় তার মানসিক যন্ত্রণা বর্ণনা করো। (৩+২)

উঃ তপন যখন তার নিজের লেখা গল্পটি সবার সামনে পড়তে শুরু করে, সে আবিষ্কার করে যে প্রতিটি শব্দ ও বাক্য তার অচেনা। মেসোমশাই গল্পের কাঠামো ঠিক রেখে ভাষা ও শৈলী এমনভাবে পাল্টে দিয়েছেন যে তা আর তপনের নিজস্ব সৃষ্টি নেই। নিজের কৃতিত্বের জায়গায় অন্যের দখলদারি দেখে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। নিজের নামে অন্যের কলমের জয়গান গাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই সে মাঝপথে পড়া থামিয়ে দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে।

​এই অবস্থায় তপনের মানসিক যন্ত্রণা ছিল অসহনীয় অপমানের। সে অনুভব করেছিল যেন তাকে সবার সামনে নগ্ন করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির সবাই যখন হাসাহাসি করছে এবং মেসোর মেধার গুণগান গাইছে, তপন তখন নিজের ব্যর্থতায় গুমরে মরছে। সে বুঝতে পারে, এই সাফল্যের পেছনে কোনো সততা নেই। নিজের সৃষ্টিকে রক্ষা করতে না পারার আক্ষেপ এবং পরজীবিতার গ্লানি তাকে কুঁকড়ে দিয়েছিল। এই নীরবতা ছিল তার প্রতিবাদের ভাষা এবং গভীর অন্তর্দহন।

​১৫. "জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।" — তপনের প্রথম ও দ্বিতীয়বার জ্ঞানচক্ষু খোলার ঘটনাটি সংক্ষেপে লেখো। (২.৫+২.৫)

উঃ গল্পের শুরুতে তপন দেখে তার নতুন মেসোমশাই একজন বিখ্যাত লেখক হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেন। আগে তপনের ধারণা ছিল লেখকরা অলৌকিক শক্তির অধিকারী। কিন্তু মেসোকে দেখে সে বুঝল লেখকরাও দাড়ি কামান, সিগারেট খান এবং সাধারণ মানুষের মতোই আবেগপ্রবণ। এই উপলব্ধির ফলে তপনের সাহিত্যের প্রতি মোহভঙ্গ হয় এবং সে নিজে লেখক হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। এটি ছিল তার জীবনের প্রথমবার ‘জ্ঞানচক্ষু’ খোলার ঘটনা।

​গল্পের শেষে তপনের প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু খোলে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। নিজের নামে ছাপা গল্প পড়তে গিয়ে সে দেখে মেসো সেটিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছেন। বাড়ির লোকেদের ব্যঙ্গ ও মেসোর দয়ার আধিক্যে সে বুঝতে পারে যে, নিজের মৌলিকতা হারিয়ে অন্যের দাক্ষিণ্যে পাওয়া সাফল্য আসলে চরম অমর্যাদার। সে সংকল্প করে, এরপর থেকে নিজের কাঁচা লেখাই নিজে গিয়ে জমা দিয়ে আসবে। সাফল্যের চেয়ে আত্মসম্মান যে বড়—এই বোধোদয়ই ছিল তার দ্বিতীয় তথা প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু লাভ।

​১৬. "নতুন মেসোমশাই একজন লেখক। সত্যিকার লেখক।" — মেসোমশাইয়ের লেখক জীবনের পরিচয় দাও। তপনের কাছে তা কেন বিস্ময়কর ছিল? (৩+২)

উঃ নতুন মেসোমশাই পেশায় কলেজের অধ্যাপক হলেও নেশায় একজন সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক। তাঁর লেখা অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে এবং সাহিত্য মহলে তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি রয়েছে। তিনি ‘সন্ধ্যাতারা’-র মতো নামী পত্রিকার সম্পাদককে চেনেন এবং তাঁর সুপারিশে নতুনদের লেখা ছাপা হওয়া সম্ভব। তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং সমাজ ও রাজনীতির ওপর তাঁর তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। তাঁর জীবনযাত্রা আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক।

​তপনের কাছে মেসোর এই লেখক পরিচয় ছিল বিস্ময়কর কারণ তপন মনে করত লেখকরা বিশেষ কোনো জগতের মানুষ। সে ভেবেছিল লেখকদের চেহারা ও স্বভাব হয়তো সাধারণ মানুষের চেয়ে একদম আলাদা হবে। কিন্তু মেসোকে এত কাছ থেকে দেখে তপন বুঝতে পারে যে তার বাবা বা কাকার মতোই মেসো একজন অতি সাধারণ মানুষ। এই বাস্তবমুখী পরিচয় তপনকে অবাক করে দেয় এবং তার মধ্যে থাকা লেখক হওয়ার ভয় দূর করে দেয়।

​১৭. "মেসো তেমনি করুণার মূর্তিতে বলেন।" — মেসোর এই ‘করুণার মূর্তি’ ধারণ করার কারণ কী? তিনি কী আশ্বাস দিয়েছিলেন? (২+৩)

উঃ মেসোমশাই শ্বশুরবাড়িতে এসে নিজের পাণ্ডিত্য এবং প্রভাব জাহির করার সুযোগ খুঁজছিলেন। তপনের কাঁচা হাতের গল্পটি সংশোধন করার দায়িত্ব নিয়ে তিনি নিজেকে একজন ‘ত্রাতা’ বা ‘পরোপকারী’ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তিনি এমন এক ভাব দেখাচ্ছিলেন যেন তিনি তপনের ওপর অনেক বড় দয়া করছেন। এই আত্মশ্লাঘা এবং নিজের দাপট বোঝানোর জন্যই তিনি করুণার মূর্তি ধারণ করেছিলেন।

​তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তপনের গল্পটি তিনি সংশোধন করে দেবেন এবং সন্ধ্যাতারা পত্রিকার সম্পাদককে নিজে গিয়ে দেবেন। মেসো বলেছিলেন, "আমি বললে সন্ধ্যাতারা-র সম্পাদক না করতে পারবে না।" তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে তপনের গল্পের মান ভালো হলেও সামান্য কারেকশন প্রয়োজন। এই আশ্বাসের আড়ালে তিনি আসলে তপনের সৃষ্টিশীলতাকে ছোট করে নিজের দক্ষতাকেই বড় করে তুলে ধরেছিলেন।

​১৮. "বুকের রক্ত ছলকে ওঠে তপনের।" — তপনের এমন উত্তেজনার কারণ কী? এর পরবর্তী ঘটনাটি কী ছিল? (২+৩)

উঃ সন্ধ্যাতারা পত্রিকা হাতে নিয়ে মেসো ও মাসিকে তাদের বাড়িতে আসতে দেখে তপনের মধ্যে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সে বুঝতে পারে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে এবং তার গল্পটি হয়তো ছাপা হয়েছে। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখার যে অদম্য আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে ছিল, সেই স্বপ্নের সফল পরিণতির কথা ভেবেই তার বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল। এটি ছিল এক নবীন লেখকের প্রথম স্বীকৃতির শিহরণ।

​পরবর্তী ঘটনা ছিল আনন্দ ও বিষাদের এক জটিল মিশ্রণ। সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায় যে তপনের গল্প ছাপা হয়েছে। মেসো গল্পটি সংশোধনের কৃতিত্ব নিজের নামে নেন। পত্রিকা সবার হাতে হাতে ঘোরে কিন্তু তপন যখন একা বইটি পড়তে শুরু করে, তখন সে দেখে গল্পটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে লেখা হয়েছে। বাড়ির বড়দের বিদ্রূপ এবং গল্পের এই অপরিচিত রূপ তপনের যাবতীয় উত্তেজনাকে এক মুহূর্তেই ম্লান করে দেয়। আনন্দের মুহূর্তটি তার কাছে অপমানের দহনে পরিণত হয়।

​১৯. "তোর হবে। হাঁ বাবা তোর হবে।" — কারা কেন এ কথা বলত? তপনের ওপর এর প্রভাব কী হয়েছিল? (২+৩)

উঃ বাড়ির বয়স্করা এবং পাড়ার ঠাট্টাবাজ আত্মীয়রা তপনের লেখক হওয়ার প্রচেষ্টাকে বিদ্রূপ করে এই মন্তব্যটি করত। তপন যখন মেসোর আশ্রয়ে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, তখন বাড়ির লোকজন তার প্রতিভাকে সম্মান না দিয়ে ব্যঙ্গার্থে উৎসাহিত করত। তাদের কাছে তপনের সাহিত্যচর্চা ছিল এক ধরনের ছেলেখেলার মতো। তাই তারা উঠতে বসতে তাকে ‘কবি’, ‘সাহিত্যিক’ বলে খ্যাপাতো।

​এই নিরন্তর বিদ্রূপ ও ঠাট্টা তপনের ওপর এক নেতিবাচক ও রোখালো প্রভাব ফেলেছিল। সে লোকের কথা উপেক্ষা করে আরও নিবিড়ভাবে লিখতে শুরু করে। তার মধ্যে এক জেদ তৈরি হয় নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। অপমানিত বোধ করলেও সে লেখা ছাড়েনি, বরং নেশার মতো একের পর এক গল্প লিখে গেছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে তার এই নিরলস সাধনা ছিল আসলে তার সৃজনশীল সত্তার এক নীরব প্রতিবাদ। তবে শেষ পর্যন্ত মেসোর সংশোধনের ঘটনায় তার এই জেদ অপমানে পর্যবসিত হয়।

​২০. ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (৫)

উঃ আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের নামকরণটি আক্ষরিক ও ব্যঞ্জনধর্মী উভয় দিক থেকেই সার্থক। গল্পের নায়ক কিশোর তপন সাহিত্য সম্পর্কে এক কাল্পনিক ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছিল। গল্পের শুরুতেই আমরা দেখি মেসোমশাইকে লেখক হিসেবে চিনতে পেরে তপনের প্রথম ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচিত হয়। সে বুঝতে পারে লেখক হওয়ার জন্য দেবত্ব প্রয়োজন নেই, সাধারণ মানুষই সাহিত্যিক হন। এটি ছিল তার বাহ্যিক জগতের জ্ঞানলাভ।

​কিন্তু গল্পের প্রকৃত পরিণতিতে তপনের অন্তরের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হয়। নিজের নামে ছাপা গল্প পড়তে গিয়ে যখন সে অন্যের লেখা লাইন খুঁজে পায় এবং সবার কাছে দয়ার পাত্র হিসেবে উপহাসিত হয়, তখন সে প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করে। সে বুঝতে পারে, অন্যের হাত ধরে পাওয়া সাফল্য আসলে মিথ্যে এবং অসম্মানের। নিজের কৃতিত্ব যদি নিজের না হয়, তবে সেই যশের কোনো মূল্য নেই। সাফল্যের মোহে অন্ধ না থেকে নিজের মর্যাদা রক্ষা করাই যে বড় কথা—এই বোধোদয়ই হলো তার সত্যিকারের জ্ঞানচক্ষু লাভ। গল্পের প্রতিটি মোড়ে তপনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শেষে আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণ নামকরণের সার্থকতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

 

0 comments:

Post a Comment