বহুরূপী : সংক্ষিপ্ত আলোচনা

বহুরূপী গল্পের মূল বিষয়:

 

সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পটি হরিদা নামক এক অতি দরিদ্র কিন্তু বিচিত্র স্বভাবের মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনী। হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী; অভাব যাঁর নিত্যসঙ্গী, কিন্তু একঘেয়ে কোনো ধরাবাঁধা কাজ বা চাকুরির শৃঙ্খলা তাঁর নাপসন্দ। তিনি স্বাধীনতার স্বাদ পেতে ভালোবাসেন এবং সেই স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে অনেক সময় তাঁকে অনাহারেও দিন কাটাতে হয়। শহরের এক সংকীর্ণ গলির ছোট ঘরে তাঁর বসবাস, যেখানে লেখক ও তাঁর বন্ধুরা নিয়মিত আড্ডায় সমবেত হন। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি জগদীশবাবু নামক এক ধনী ও কৃপণ ব্যক্তির বাড়িতে এক হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীর আগমনের কথা শোনে হরিদা। সেই সন্ন্যাসী ছিলেন অতি উচ্চ দরের এবং তাঁর পায়ের ধুলো পাওয়া ছিল অসম্ভব। জগদীশবাবু কৌশলে সন্ন্যাসীকে সোনার বোল লাগানো খড়ম পরিয়ে পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন এবং বিদায়কালে তাঁর ঝোলায় জোর করে একশো টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়েছিলেন। এই সন্ন্যাসীর গল্প শোনার পর হরিদার মধ্যে এক পেশাদারী জেদ কাজ করে। তিনি বন্ধুদের জানান যে এবার তিনি এমন এক কাণ্ড করবেন যাতে তাঁর সারা বছরের অন্নের সংস্থান হয়ে যাবে এবং তিনি সেই খেলা দেখানোর জন্য বন্ধুদের সন্ধ্যাবেলা জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত থাকতে বলেন।

সন্ধ্যাবেলা জগদীশবাবুর উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত বারান্দায় এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানে হঠাৎ আবির্ভূত হন এক 'বিরাগী'। তাঁর শান্ত, সৌম্য এবং উজ্জ্বল দৃষ্টির সামনে জগদীশবাবু স্তম্ভিত হয়ে যান। হরিদার সেই বিরাগী রূপ ছিল নিখুঁত এবং ঐশ্বরিক। জটাজুট বা গৈরিক বসনহীন সেই বিরাগী ছিলেন শ্বেত বসনধারী এবং হাতে ছিল কেবল একটি গীতা। তিনি জগদীশবাবুকে তাঁর ধনের অহংকারের জন্য মৃদু তিরস্কার করেন এবং নিজেকে এই ব্রহ্মাণ্ডের ধূলিকণা হিসেবে পরিচয় দেন। জগদীশবাবু বিরাগীর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে এতটাই বিমোহিত হন যে তিনি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার উপক্রম করেন এবং বার বার তাঁকে বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানান। এমনকি বিরাগী যখন প্রস্থানের কথা বলেন, তখন জগদীশবাবু তাঁর তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান। আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা হরিদার বন্ধুরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী হরিদা সেই প্রণামীর টাকার থলিটি অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ধুলোর মতো সোনাকেও মাড়িয়ে দিয়ে শান্ত পায়ে সেখান থেকে চলে যান।

গল্পের শেষে দেখা যায় হরিদা তাঁর নিজের ঘরে উনানের সামনে বসে আছেন। বন্ধুরা যখন তাঁকে তাঁর এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করেন যে কেন তিনি অতগুলো টাকা নিলেন না, তখন হরিদার উত্তর ছিল শিল্পীর এক চরম সত্যোপলব্ধি। তিনি জানান যে বিরাগীর সাজ পোশাক পরে যদি তিনি টাকার প্রতি লোভ দেখাতেন, তবে তাঁর 'ঢং' অর্থাৎ বহুরূপীর শিল্পের অমর্যাদা হতো। একজন খাঁটি বিরাগী কখনও টাকা স্পর্শ করতে পারেন না, আর হরিদা শিল্পী হিসেবে সেই চরিত্রের প্রতি সৎ থাকতে চেয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে তাঁর দারিদ্র্য ঘুচল না, উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফোটার যে ট্র্যাজেডি তা অব্যাহতই রয়ে গেল। গল্পটি আমাদের শেখায় যে শিল্পীর কাছে নিজের শিল্পের মর্যাদা ও আদর্শ জাগতিক অভাব-অনটনের চেয়েও অনেক বড়। হরিদা হয়তো পেশাদারী জীবনে ব্যর্থ হলেন কিন্তু একজন খাঁটি শিল্পী হিসেবে তিনি জয়ী হলেন। গল্পের শেষে তাঁর সেই লজ্জিত হাসি এবং মাত্র আট আনা বকশিশের আশা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের শিল্পীরা দারিদ্র্যকে মেনে নিলেও নিজের শিল্পের সততাকে বিসর্জন দেন না। এভাবেই সুবোধ ঘোষ হরিদার চরিত্রের মধ্য দিয়ে শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং দারিদ্র্যের এক করুণ কিন্তু মহৎ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।

 

 

বহুরূপী গল্পের নামকরণের সার্থকতা:

 

সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পটির নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী। একটি সার্থক নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু, কেন্দ্রীয় চরিত্র অথবা গল্পের অন্তর্নিহিত মূল সুরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই গল্পটির ক্ষেত্রেও আমরা দেখি যে 'বহুরূপী' শব্দটি কেবল হরিদার পেশাকেই ইঙ্গিত করে না, বরং এটি শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন লড়াইয়ের এক প্রতীকী প্রকাশ হয়ে উঠেছে। গল্পের নামকরণটি কেন সার্থক, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

গল্পের শুরুতেই আমরা পরিচিত হই হরিদা নামক এক বিচিত্র চরিত্রের মানুষের সঙ্গে। হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী। তাঁর জীবন অতি সাধারণ এবং অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে কাটে। শহরের একটি সংকীর্ণ গলির ছোট ঘরে তিনি বাস করেন। তাঁর উনানে প্রতিদিন চাল ফোটে না, অনেক সময় কেবল জল ফুটিয়েই তাঁকে খিদের জ্বালা মেটাতে হয়। তবুও হরিদার চরিত্রে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়তিনি একঘেয়ে বাঁধাধরা কাজ পছন্দ করেন না। জীবনের একঘেয়েমিকে দূর করার জন্যই তিনি বহুরূপী পেশাকে বেছে নিয়েছেন। তিনি মাঝে মাঝেই বিচিত্র সাজে সজ্জিত হয়ে রাস্তায় বের হন। কখনও তিনি পাগল সাজেন, কখনও বাইজি, কখনও বা বাউল, কাপালিক কিংবা ফিরিঙ্গি সাহেব। তাঁর এই বহুরূপ ধারণ কেবল জীবিকার প্রয়োজনে নয়, বরং এক সৃজনশীল নেশার মতো। এই প্রেক্ষাপটে গল্পের নামকরণটি প্রথমেই হরিদার পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়।

গল্পের কেন্দ্রীয় ঘটনাটি আবর্তিত হয়েছে হরিদার এক অভাবনীয় ছদ্মবেশকে কেন্দ্র করে। জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত এক উঁচু দরের সন্ন্যাসীর গল্প শোনার পর হরিদার শিল্পীমন যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। তিনি তাঁর বন্ধুদের বলেছিলেন যে এবার তিনি এমন এক কাণ্ড করবেন যাতে তাঁর সারাজীবনের অন্নের সংস্থান হয়ে যাবে। বন্ধুরা ভেবেছিলেন হরিদা হয়তো সাধারণ কোনো ছদ্মবেশে জগদীশবাবুকে তুষ্ট করবেন। কিন্তু গল্পের মূল মোচড় আসে যখন হরিদা 'বিরাগী' সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হন। তাঁর সেই সাজ এবং আচরণ এতটাই নিখুঁত ছিল যে স্বয়ং জগদীশবাবু এবং হরিদার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও তাঁকে চিনতে ব্যর্থ হন। জটাজুটধারী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ সন্ন্যাসী না সেজে তিনি একজন শান্ত, সৌম্য এবং মোহমুক্ত বিরাগী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। এই বিরাগী রূপটিই গল্পের নামকরণের সার্থকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

বিরাগী হিসেবে হরিদা যখন জগদীশবাবুর বাড়িতে যান, তখন তাঁর ব্যক্তিত্বে এক অতীন্দ্রিয় জ্যোতি ফুটে ওঠে। জগদীশবাবু ছিলেন ধনবান কিন্তু কিছুটা অহংকারী ব্যক্তি। বিরাগী হরিদা তাঁর সেই দর্প চূর্ণ করেন অত্যন্ত সহজ ভাষায়। বিরাগীর মুখে "পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া!"এই ধরনের দার্শনিক বাণী শুনে জগদীশবাবু অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি বিরাগীকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান। একজন অতি দরিদ্র মানুষের কাছে সেই সময়ে একশো এক টাকা ছিল এক বিপুল সম্পত্তি, যা দিয়ে তাঁর জীবনের অভাব চিরতরে মুছে যেতে পারত। কিন্তু এখানেই হরিদা তাঁর বহুরূপী সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তিনি অবলীলায় সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ধুলোর মতো সোনাকেও তুচ্ছ করে বিদায় নেন।

গল্পের শেষে যখন বন্ধুরা হরিদাকে তাঁর এই ত্যাগের কারণ জিজ্ঞাসা করেন, তখন হরিদার উত্তর ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি বলেন, "শত হোক, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা-ফাকা কী করে স্পর্শ করি বল? তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়।" এই একটি বাক্যের মধ্যেই 'বহুরূপী' নামকরণের সার্থকতা নিহিত। হরিদার কাছে 'বহুরূপী' কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি একটি শিল্প। একজন শিল্পী যখন কোনো চরিত্র ধারণ করেন, তখন সেই চরিত্রের সত্যতা রক্ষা করাই তাঁর প্রধান ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। হরিদা জানতেন যে টাকাটা নিলে তাঁর দারিদ্র্য ঘুচত ঠিকই, কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা পরাজিত হতো। বিরাগী চরিত্রের পবিত্রতা ও মোহহীনতা রক্ষা করার জন্যই তিনি টাকার মায়া ত্যাগ করেন। অর্থাৎ, তিনি কেবল বাইরে থেকে রূপ পাল্টান না, অন্তরেও সেই চরিত্রের আদর্শকে ধারণ করেন।

গল্পের নামকরণটি 'হরিদা' না হয়ে 'বহুরূপী' হওয়ার পেছনে আরও একটি কারণ থাকতে পারে। হরিদা আসলে আমাদের সমাজের সেইসব শিল্পীদের প্রতিনিধি, যাঁরা অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও নিজেদের শিল্পের আদর্শে অটল থাকেন। গল্পের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, হরিদা আবার তাঁর সাধারণ জীবনে ফিরে এসেছেন এবং জগদীশবাবুর কাছে গিয়ে সামান্য বকশিশ চাওয়ার কথা ভাবছেন। এই বৈপরীত্যই গল্পের ট্র্যাজেডি। একাধারে তিনি বিরাগী সেজে লক্ষাধিক টাকার সম্পত্তি তুচ্ছ করছেন, আবার পরক্ষণেই অভাবের তাড়নায় আট আনা বা দশ আনা বকশিশের আশা করছেন। এই যে বহুরূপী জীবনের নাটকীয়তা এবং বৈচিত্র্য, তাই এই গল্পের মূল উপজীব্য।

উপসংহারে বলা যায়, সুবোধ ঘোষ 'বহুরূপী' শব্দটির মাধ্যমে কেবল একজনের পরিচয় দেননি, বরং মানুষের অন্তরের ঐশ্বর্য এবং শিল্পের নৈতিক জয়ের কথা বলেছেন। হরিদা নামের সাধারণ মানুষটি তাঁর অসাধারণ বহুরূপী সত্তার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে পেটের খিদের চেয়েও শিল্পের মর্যাদা অনেক বড়। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হরিদার বিভিন্ন রূপ এবং তাঁর বিরাগী চরিত্রের চরম উৎকর্ষতা গল্পের ঘটনাপ্রবাহকে সার্থকভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে। নামকরণের মাধ্যমে লেখক সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, একজন বহুরূপী কেবল ছদ্মবেশ ধারণ করেন না, তিনি সেই চরিত্রের জীবনকেও মুহূর্তের জন্য যাপন করেন। তাই বিষয়বস্তু, চরিত্রচিত্রণ এবং শিল্পের নৈতিকতার বিচারে 'বহুরূপী' নামকরণটি সর্বাংশে সার্থক ও সার্থকতা লাভ করেছে।

 

পরীক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি:

১. "হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে" হরিদার জীবনের এই নাটকীয় বৈচিত্র্যটি গল্পের আলোকে আলোচনা করো।

২. "খুবই গরিব মানুষ হরিদা" হরিদার দারিদ্র্যের বর্ণনা দাও। এই দারিদ্র্য সত্ত্বেও তাঁর চরিত্রের কোন বিশেষ দিকটি তোমাকে আকর্ষণ করে?

৩. হরিদার জীবনযাপনের ধরণ কেমন ছিল? কেন তিনি ধরাবাঁধা চাকুরির কাজ পছন্দ করতেন না?

৪. "হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না" এই অভাবের মধ্যেও হরিদার শিল্পীসত্তা কীভাবে বেঁচে ছিল?

৫. বহুরূপী কাকে বলে? পেশাদার বহুরূপী হিসেবে হরিদার দক্ষতার পরিচয় দাও।

৬. চকের বাস স্ট্যান্ডে পাগল সেজে হরিদা যে কাণ্ড করেছিলেন, তার বর্ণনা দাও।

৭. বাইজি সেজে হরিদার উপার্জনের কাহিনীটি সংক্ষেপে লেখো। ওইদিন তাঁর রোজগার কেমন হয়েছিল?

৮. দয়ালবাবুর লিচু বাগানে হরিদা কীভাবে পুলিশ সেজেছিলেন? মাস্টারমশাই কেন হরিদাকে প্রশংসা করেছিলেন?

৯. বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে হরিদা যখন জগদীশবাবুর বাড়িতে যান, তখন তাঁর রূপ ও পোশাকের বর্ণনা দাও।

১০. "আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়?"— বক্তা কে? তিনি কেন জগদীশবাবুকে এই কথা বলেছিলেন?

১১. বিরাগী হরিদার মুখে পরম সুখের যে সংজ্ঞা শোনা গিয়েছিল, তা সংক্ষেপে লেখো।

১২. "সাতদিন হলো এক সন্ন্যাসী এসে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন" সেই সন্ন্যাসীর পরিচয় দাও। তাঁর বিদায়কালীন ঘটনাটি কী ছিল?

১৩. "অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না" হরিদার 'ভুল' কোনটি ছিল? কেন একে ভুল বলা হয়েছে?

১৪. "তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়" এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে হরিদার চরিত্রের কোন সত্যটি ফুটে উঠেছে?

১৫. "মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার" হরিদার এই সংকল্পের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?

১৬. জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা হরিদা কেন অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করলেন?

১৭. "খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?"— এই আক্ষেপের মধ্য দিয়ে শিল্পীর জীবনের কোন ট্র্যাজেডি ধরা পড়েছে?

১৮. 'বহুরূপী' গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

১৯. "গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা" কোন গল্পের কথা বলা হয়েছে? গম্ভীর হয়ে হরিদা কী পরিকল্পনা করেছিলেন?

২০. জগদীশবাবুর চরিত্রটি গল্পে কীভাবে ফুটে উঠেছে? বিরাগী হরিদার সামনে তাঁর আচরণ কেমন ছিল?

২১. "বড় চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা" সন্ধ্যার স্নিগ্ধতার সঙ্গে বিরাগী হরিদার আগমনের সম্পর্কটি ব্যাখ্যা করো।

২২. "আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনি অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি" উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

২৩. হরিদার ঘরের আড্ডায় যে চারজন বন্ধু আসতেন, তাঁদের সঙ্গে হরিদার সম্পর্কের পরিচয় দাও।

২৪. বিরাগী সেজে হরিদা জগদীশবাবুকে কী কী উপদেশ দিয়েছিলেন?

২৫. গল্পের শেষ দৃশ্যে হরিদার যে লজ্জিত হাসির কথা আছে, তা কেন পাঠকের মনকে স্পর্শ করে?

২৬. সমাজের অবহেলিত শিল্পীদের প্রতিনিধি হিসেবে 'হরিদা' চরিত্রটির গুরুত্ব আলোচনা করো।

২৭. ছোটগল্প হিসেবে 'বহুরূপী' কতখানি সার্থক তা বুঝিয়ে দাও।

২৮. "সে কি সত্যিই হরিদা?"— বন্ধুদের এই বিস্ময়ের কারণ কী ছিল?

২৯. হরিদার বিভিন্ন রূপের মধ্যে 'বিরাগী' রূপটি কেন শ্রেষ্ঠ? তোমার মতামত দাও।

৩০. "বাঃ, এ তো বেশ মজার ব্যাপার!" কোন বিষয়টিকে হরিদা 'মজার ব্যাপার' বলেছিলেন এবং কেন?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বহুরূপী (মূল গল্প): সুবোধ ঘোষ


বহুরূপী: সুবোধ ঘোষ

হরিদার কাছে আমরাই গল্প করে বললাম, শুনেছেন, হরিদা, কী কাণ্ড হয়েছে?

উনানের মুখে ফুঁ দিয়ে আর অনেক ধোঁয়া উড়িয়ে নিয়ে হরিদা এইবার আমাদের কথার জবাব দিলেন না, কিছুই শুনিনি।

- জগদীশবাবু যে কী কান্ড করেছেন, শোনেননি হরিদা?

হরিদা না রে ভাই, বড়ো মানুষের কান্ডের খবর আমি কেমন করে শুনব? আমাকে বলবেই বা কে?

- সাতদিন হলো এক সন্ন্যাসী এসে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন। খুব উঁচু দরের সন্ন্যাসী। হিমালয়ের গুহাতে থাকেন। সারা বছরে শুধু একটি হরীতকী খান; এ ছাড়া আর কিছুই খান না। সন্ন্যাসীর বয়সও হাজার বছরের বেশি বলে অনেকেই মনে করেন।

হরিদা সন্ন্যাসী কি এখনও আছেন?

না, চলে গিয়েছেন।

আক্ষেপ করেন হরিদা থাকলে একবার গিয়ে পায়ের ধুলো নিতাম।

-তা পেতেন না হরিদা। সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস। শুধু ওই একা জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকে পায়ের ধূলো নিতে দেননি সন্ন্যাসী।

হরিদা - কেন?

- জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলেন। তখন বাধ্য হয়ে সন্ন্যাসী পা এগিয়ে দিলেন, নতুন খড়ম পরলেন আর সেই ফাঁকে জগদীশবাবু পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন।

হরিদা বাঃ, এ তো বেশ মজার ব্যাপার!

হ্যাঁ, তা ছাড়া সন্ন্যাসীকে বিদায় দেবার সময় জগদীশবাবু একশো টাকার একটা নোট জোর করে সন্ন্যাসীর ঝোলার ভেতরে ফেলে দিলেন। সন্ন্যাসী হাসলেন আর চলে গেলেন।

গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমরা কী বলছি বা না বলছি, সেদিকে হরিদার যেন কান নেই।

হরিদার উনানের আগুন তখন বেশ গনগনে হয়ে জ্বলছে। আমাদের চায়ের জন্য এক হাঁড়ি ফুটন্ত জল নামিয়ে দিয়েই হরিদা তাঁর ভাতের হাঁড়িটাকে উনানে চড়ালেন।

শহরের সবচেয়ে সরু এই গলিটার ভিতরে এই ছোট্ট ঘরটাই হরিদার জীবনের ঘর; আর আমাদের চারজনের সকাল-সন্ধ্যার আড্ডার ঘর। চা চিনি আর দুধ আমরাই নিয়ে আসি। হরিদা শুধু তাঁর উনানের আগুনের আঁচে জল ফুটিয়ে দেন।

খুবই গরিব মানুষ হরিদা। কিন্তু কাজ করতে হরিদার প্রাণের মধ্যেই যেন একটা বাধা আছে। ইচ্ছে করলে কোনো অফিসের কাজ, কিংবা কোনো দোকানের বিক্রিওয়ালার কাজ পেয়ে যেতে পারেন হরিদা; কিন্তু ওই ধরনের কাজ হরিদার জীবনের পছন্দই নয়। একেবারে ঘড়ির কাঁটার সামনে সময় বেঁধে দিয়ে আর নিয়ম করে নিয়ে রোজই একটা চাকরির কাজ করে যাওয়া হরিদার পক্ষে সম্ভব নয়। হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না। এই একাঘেয়ে অভাবটাকে সহ্য করতে হরিদার আপত্তি নেই, কিন্তু একঘেয়ে কাজ করতে ভয়ানক আপত্তি।

হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে। আর, সেটাই যে হরিদার জীবনের পেশা। হরিদা মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে যেটুকু রোজগার করেন, তাতেই তাঁর ভাতের হাঁড়ির দাবি মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। মাঝে মাঝে সত্যিই উপোস করেন হরিদা। তারপর একদিন হঠাৎ আবার এক সকালে কিংবা সন্ধ্যায় বিচিত্র ছদ্মবেশে অপরূপ হয়ে পথে বের হয়ে পড়েন। কেউ চিনতে পারে না। যারা চিনতে পারে এক-আনা দু-আনা বকশিশ দেয়। যারা চিনতে পারে না, তারা হয় কিছুই দেয় না, কিংবা বিরক্ত হয়ে দুটো-একটা পয়সা দিয়ে দেয়।

একদিন চকের বাস স্ট্যান্ডের কাছে ঠিক দুপুরবেলাতে একটা আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল। একটা উন্মাদ পাগল; তার মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছে, চোখ দুটো কটকটে লাল। তার কোমরে একটা ছেঁড়া কম্বল জড়ানো, গলায় টিনের কৌটার একটা মালা। পাগলটা একটা থান ইট হাতে তুলে নিয়ে বাসের উপরে বসা যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। চেঁচিয়ে উঠছে যাত্রীরা, দুটো একটা পয়সা ফেলেও দিচ্ছে।

একটু পরেই বাসের ড্রাইভার কাশীনাথ ধমক দেয়। খুব হয়েছে হরি, এই বার সরে পড়ো। অন্যদিকে যাও। অ্যাঁ? ওটা কি একটা বহুরূপী? বাসের যাত্রীরা কেউ হাসে, কেউ বা বেশ বিরক্ত হয়, কেউ আবার বেশ বিস্মিত। সত্যিই, খুব চমৎকার পাগল সাজতে পেরেছে তো লোকটা।

হরিদার জীবন এইরকম বহু রূপের খেলা দেখিয়েই একরকম চলে যাচ্ছে। এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা। সন্ধ্যার আলো সবেমাত্র জ্বলেছে, দোকানে দোকানে লোকজনের ব্যস্ততা আর মুখরতাও জমে উঠেছে। হঠাৎ পথের উপর দিয়ে ঘুঙুরের মিষ্টি শব্দ রুমঝুম করে বেজে-বেজে চলে যেতে থাকে। এক রূপসি বাইজি প্রায় নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। শহরে যারা নতুন এসেছে, তারা দুই চোখ বড়ো করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু দোকানদার হেসে ফেলে- হরির কান্ড।

অ্যাঁ? এটা একটা বহুরুপী নাকি? কারও কারও মুগ্ধ চোখের মোহভঙ্গ হয়, আর যেন বেশ একটু হতাশস্বরে প্রশ্ন করে ওঠে।

বাইজির ছদ্মবেশে সেদিন হরিদার রোজগার মন্দ হয়নি। মোট আট টাকা দশ আনা পেয়েছিলেন। আমরাও দেখেছিলাম, এক-একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে সেই রূপসি বাইজি, মুচকি হেসে আর চোখ টিপে একটা ফুলসাজি এগিয়ে দিচ্ছে। দোকানদারও হেসে ফেলে আর একটা সিকি তুলে নিয়ে বাইজির হাতের ফুলজাসির উপর ফেলে দেয়।

কোনদিন বাউল, কোনদিন কাপালিক। কখনও বোঁচকা কাঁধে বুড়ো কাবুলিওয়ালা, কখনও হ্যাট-কোট-পেন্টলুন-পরা ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব। একবার পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভিতরে দাঁড়িয়েছিলেন হরিদা; স্কুলের চারটে ছেলেকে ধরেছিলেন। ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল ছেলেগুলো; আর স্কুলের মাস্টার এসে সেই নকল পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন-এবারের মতো মাপ করে দিন ওদের। কিন্তু আটআনা ঘুষ নিয়ে তারপর মাস্টারের অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন সেই নকল-পুলিশ হরিদা।

পরদিন অবশ্য স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের জানতে বাকি থাকেনি, কাকে তিনি আটআনা ঘুষ দিয়েছেন। কিন্তু মাস্টারমশাই একটুও রাগ করেননি। বরং একটু তারিফই করলেন-বা, সত্যি, খুব চমৎকার পুলিশ সেজেছিল হরি!

আজ এখন কিন্তু আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না, হরিদা এত গম্ভীর হয়ে কী ভাবছেন। সন্ন্যাসীর গল্পটা শুনে কি হরিদার মাথার মধ্যে নতুন কোনো মতলব ছটফট করে উঠেছে?

ঠিকই, আমাদের সন্দেহ মিথ্যে নয়। হরিদা বললেন-আজ তোমাদের একটা জবর খেলা দেখাব।

-আমাদের দেখিয়ে আপনার লাভ কি হরিদা? আমাদের কাছ থেকে একটা সিগারেটের চেয়ে বেশি কিছু তো পাবেন না।

হরিদা-না, ঠিক তোমাদের দেখাব না। আমি বলছি তোমরা সেখানে থেকো। তাহলে দেখতে পাবে...।

-কোথায়?

হরিদা-আজ সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে।

-হঠাৎ জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখাবার জন্যে আপনার এত উৎসাহ জেগে উঠল কেন?

হরিদা হাসেন-মোটা মতন কিছু আদায় করে নেব। বুঝতেই তো পারছ, পুরো দিনটা রূপ ধরে ঘুরে বেড়িয়েও দু-তিন টাকার বেশি হয় না। একবার বাইজি সেজে অবিশ্যি কিছু বেশি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ওতেই বা কি হবে? ঠিকই বলেছেন হরিদা। সপ্তাহে বড়োজোর একটা দিন বহুরুপী সেজে পথে বের হন হরিদা। কিন্তু তাতে সাতদিনের পেট চলবার মতো রোজগার হয় না।

হরিদা বলেন-নাঃ, এবার আর কাঙালের মতো হাত পেতে বকশিস নেওয়া নয়। এবার মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার। একবারেই যা ঝেলে নেব তাতে আমার সারা বছর চলে যাবে।

কিন্তু সে কী করে সম্ভব? জগদীশবাবু ধনী মানুষ বটেন, কিন্তু বেশ কৃপণ মানুষ। হরিদাকে একটা যোগী সন্ন্যাসী কিংবা বৈরাগী সাজতে দেখে কত আর খুশি হবেন জগদীশবাবু? আর খুশি হলেই বা কত আনা বকশিশ দেবেন। পাঁচ আনার বেশি তো নয়।

হরিদা বলেন-তোমরা যদি দেখতে চাও, তবে আজ ঠিক সন্ধ্যাতে জগদীশবাবুর বাড়িতে থেকো।

আমরা বললাম-থাকব; আমাদের স্পোর্টের চাঁদা নেবার জন্যে আজ ঠিক সন্ধ্যাতেই জগদীশবাবুর কাছে যাব!


বড়ো চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা। আমাদের শহরের গায়ে কতদিন তো চাঁদের আলো পড়েছে, কিন্তু কোনোদিন তো আজকের মতো এমন একটা স্নিগ্ধ ও শান্ত উজ্জ্বলতা কখনও চারদিকে এমন সুন্দর হয়ে ফুটে ওটেনি।

ফুরফুর করে বাতাস বইছে। জগদীশবাবুর বাড়ির বাগানের সব গাছের পাতাও ঝিরিঝিরি শব্দ করে কী যেন বলতে চাইছে। জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দাতে মস্ত বড়ো একটা আলো জ্বলছে। সেই আলোর কাছে একটা চেয়ারের উপর বসে আছেন জগদীশবাবু। সাদা মাথা, সাদা দাড়ি, সৌম্য শান্ত ও জ্ঞানী মানুষ জগদীশবাবু। আমরা আমাদের স্পোর্টের চাঁদার খাতাটিকে জগদীশবাবুর হাতে তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

চমকে উঠলেন জগদীশবাবু। বারান্দার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে জগদীশবাবুর দুই বিস্মিত চোখ অপলক হয়ে গেল।

আমরাও চমকে উঠেছি বইকি। আশ্চর্য হয়েছি, একটু ভয়ও পেয়েছি। কারণ, সত্যিই যে বিশ্বাস করতে পারছি না, সিঁড়ির কাছে এসে যে দাঁড়িয়েছে, সে কি সত্যিই হরিদা? ও চেহারা কি সত্যিই কোনো বহুরূপীর হতে পারে?

জটাজুটধারী কোনো সন্ন্যাসী নয়। হাতে কমণ্ডলু নেই, চিমটে নেই। মৃগচর্মের আসনও সঙ্গে নেই। গৈরিক সাজও নেই।

আদুড় গা, তার উপর একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয়। পরনে ছোটো বহরের একটি সাদা থান।

মাথায় ফুরফুর করে উড়ছে শুকনো সাদা চুল। ধুলো মাখা পা, হাতে একটা ঝোলা, সে ঝোলার ভিতরে শুধু একটা বই, গীতা। গীতা বের করে কী-যেন দেখলেন এই আগন্তুক। তারপর নিজের মনেই হাসলেন।

আগন্তুক এই মানুষটি যেন এই জগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছেন। শীর্ণ শরীরটাকে প্রায় অশরীরী একটা চেহারা বলে মনে হয়। কী অদ্ভুত উদাত্ত শান্ত ও উজ্জ্বল একটা দৃষ্টি এই আগন্তুকের চোখ থেকে ঝরে পড়ছে!

উঠে দাঁড়ালেন জগদীশবাবু-আসুন।

আগন্তুক হাসেন-আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?

জগদীশবাবু কিছু ভেবে বলেন-কেন? কেন আপনি একথা কেন বলছেন মহারাজ?

আমি মহারাজ নই, আমি এই সৃষ্টির মধ্যে এককণা ধূলি। কিন্তু আপনি বোধহয় এগারো লক্ষ টাকার সম্পত্তির অহংকারে নিজেকে ভগবানের চেয়েও বড়ো বলে মনে করেন। তাই ওখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, নেমে আসতে পারছেন না।

সেই মূহূর্তে সিঁড়ি ধরে নেমে যান জগদীশবাবু। -আমার অপরাধ হয়েছে। আপনি রাগ করবেন না।

আগন্তুক আবার হাসেন-আমি বিরাগী, রাগ নামে কোনো রিপু আমার নেই। ছিল একদিন, সেটা পূর্বজন্মের কথা।

জগদীশবাবু-বলুন, এখন আপনাকে কীভাবে সেবা করব?

বিরাগী বলেন-ঠান্ডা জল চাই, আর কিছু চাই না।

ঠান্ডা জল খেয়ে নিয়ে হাঁপ ছাড়েন বিরাগী। এদিকে ভবতোষ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে। -না না, হরিদা নয়। হতেই পারে না। অসম্ভব। হরিদার গলার স্বর এরকমেরই নয়।

বিরাগী বলেন-পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া!

ভবতোষের কানের কাছে মুখ এগিয়ে দিয়ে অনাদি বলে-শুনছো তো? এসব ভাষা কি হরিদার মুখের ভাষা হতে পারে?

জগদীশবাবু ততক্ষণে সিঁড়ির উপরে বসে পড়েছেন। বোধহয় বিরাগীর পা স্পর্শ করবার জন্যে তাঁর হাত দুটো ছটফট করতে শুরু করেছে। জগদীশবাবু বলেন-আমার এখানে কয়েকটা দিন থাকুন বিরাগীজি। আপনার কাছে এটা আমার প্রাণের অনুরোধ। দুই হাত জোড় করে বিরাগীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন জগদীশবাবু।

বিরাগী হাসেন-বাইরে খোলা আকাশ থাকতে আর ধরিত্রীর মাটিতে স্থান থাকতে, আমি এক বিষয়ীর দালান বাড়ির ঘরে থাকব কেন, বলতে পারেন?

-বিরাগীজি! জগদীশবাবুর গলার স্বরের আবেদন করুণ হয়ে ছলছল করে।

বিরাগী বলেন-না, আপনার এখানে জল খেয়েছি, এই যথেষ্ট। পরমাত্মা আপনার কল্যাণ করুন। কিন্তু আপনার এখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

জগদীশবাবু-তবে অন্তত একটু কিছু আজ্ঞা করুন, যদি আপনাকে কোনো...।

বিরাগী-না না, আমি যার কাছে পড়ে আছি, তিনি আপনার চেয়ে কিছু কম নয়। কাজেই আপনার কাছে আমার তো কিছু চাইবার দরকার হয় না।

জগদীশবাবু-তবে কিছু উপদেশ শুনিয়ে যান বিরাগীজি, নইলে আমি শান্তি পাব না।

বিরাগী-ধন জন যৌবন কিছুই নয় জগদীশবাবু। ওসব হলো সুন্দর সুন্দর এক-একটি বঞ্চনা। মন-প্রাণের সব আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুধু সেই একজনের আপন হতে চেষ্টা করুন, যাঁকে পেলে এই সৃষ্টির সব ঐশ্বর্য পাওয়া হয়ে যায়। ...আচ্ছা আমি চলি।

জগদীশবাবু বলেন-আপনি একটা মিনিট থাকুন বিরাগীজি।

সিঁড়ির উপরে অচঞ্চল হয়ে একটা মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন বিরাগী। আজকের চাঁদের আলোর চেয়েও স্নিগ্ধ হয়ে এক জ্যোৎস্না যেন বিরাগীর চোখ থেকে ঝরে পড়ছে। ভবতোষ ফিসফিস করে-না না, ওই চোখ কি হরিদার চোখ হতে পারে? অসম্ভব।

জগদীশবাবুর হাতে একটা থলি। থলির ভিতরে নোটের তাড়া। বিরাগীর পায়ের কাছে থলিটাকে রেখে দিয়ে ব্যাকুল স্বরে প্রার্থনা করেন জগদীশবাবু-এই প্রণামী, এই সামান্য একশো এক টাকা গ্রহণ করে আমাকে শাস্তি দান করুন বিরাগীজি। আপনার তীর্থ ভ্রমণের জন্য এই টাকা আমি দিলাম।

বিরাগী হাসেন-আমার বুকের ভিতরেই যে সব তীর্থ। ভ্রমণ করে দেখবার তো কোনো দরকার হয় না।

জগদীশবাবু-আমার অনুরোধ বিরাগীজি...।

বিরাগী বলেন-আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।

বলতে বলতে সিঁড়ি থেকে নেমে গেলেন বিরাগী। একশো এক টাকার থলিটা সিঁড়ির উপরেই পড়ে রইল।

সেদিকে ভুলেও একবার তাকালেন না বিরাগী।


 

-কী করছেন হরিদা কী হলো? কই? আজ যে বলেছিলেন জবর খেলা দেখাবেন, সে-কথা কি ভুলেই গেলেন। আজকের সন্ধ্যাটা ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলেন কেন?

বলতে বলতে আমরা সবাই হরিদার ঘরের ভিতরে ঢুকলাম।

হরিদার উনানের আগুন তখন বেশ গনগনে হয়ে জ্বলছে। উনানের উপর হাঁড়িতে চাল ফুটছে। আর, একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে হরিদা চুপ করে বসে আছেন। আমাদের দেখতে পেয়েই লজ্জিতভাবে হাসলেন।

-কী আশ্চর্য। চমকে ওঠে ভবতোষ।-হরিদা, আপনি তাহলে সত্যিই বের হয়েছিলেন! আপনিই বিরাগী?

হরিদা হাসেন-হ্যাঁ রে ভাই।

ওই তো সেই সাদা উত্তরীয়টা পড়ে রয়েছে মাদুরের উপর, আর সেই ঝোলাটা আর সেই গীতা।

অনাদি বলে-এটা কী কান্ড করলেন, হরিদা? জগদীশবাবু তো অত টাকা সাধলেন, অথচ আপনি একেবারে খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো সব তুচ্ছ করে সরে পড়লেন?

হরিদা-কী করব বল? ইচ্ছেই হলো না। শত হোক...।

ভবতোষ-কী?

হরিদা-শত হোক, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা-ফাকা কী করে স্পর্শ করি বল? তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়।

কী অদ্ভুত কথা বললেন হরিদা। হরিদার একথার সঙ্গে তর্ক চলে না। আর, বুঝতে অসুবিধে নেই, হরিদার জীবনের ভাতের হাঁড়ি মাঝে মাঝে শুধু জল ফুটিয়েই সারা হবে। অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।

অনাদি বলে-কিন্তু আপনি কি জগদীশবাবুর কাছে গিয়ে আর কখনও...।

চেঁচিয়ে হেসে ওঠেন হরিদা-যাবই তো। না গিয়ে উপায় কী? গিয়ে অন্তত বকশিশটা তো দাবি করতে হবে?

-বকশিশ? চেঁচিয়ে ওঠে ভবতোষ। সেটা তো বড়োজোর আট আনা কিংবা দশ আনা।

হরিদা বিড়ি মুখে দিয়ে লজ্জিতভাবে হাসেন-কী আর করা যাবে বল? খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?

 

 

 

 

 

আরও পড়ুনঃ সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি